প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

adv 468x65

উপলব্ধি এবং প্রমাণের পার্থক্য কি?

এ কে এম ওয়াহিদুজ্জামান : সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার আত্মজীবনী’র সমালোচনা এবং প্রচারের বিরোধিতা আওয়ামী লীগ করছে, সেটা মোটেই আশ্চর্যের কোন বিষয় নয়। কিন্তু অনলাইনে, বিশেষ করে ফেসবুকে কিছু উচ্চ শিক্ষিত স্বঘোষিত আওয়ামী বিরোধী লোক এই বইয়ের বিরোধিতা করছেন এবং সমালোচনা করছেন যা অবশ্যই আশ্চর্যজনক।

এই বিরোধিতার কারণ হিসেবে এরা যে যুক্তি উপস্থাপন করছেন, সেগুলো হচ্ছে :

১. সুরেন্দ্র কুমার সিনহা যা লিখেছেন, তা আগে থেকেই সবাই উপলব্ধি করতো এবং জানতো। খেয়াল করুন, কোন প্রমাণ আছে, এমন কথা কিন্তু তারা বলছেন না। ২. সুরেন্দ্র কুমার সিনহা নিজে দুর্নীতি করেছেন, বিচারের নামে প্রহসনের সাথে জড়িত ছিলেন সুতরাং তার বইকে কেন আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে?

৩. সুরেন্দ্র কুমার সিনহার ইংরেজি খুবই দুর্বল, এই বই পড়লে বা প্রচার করলে উনাদের মান-সম্মান থাকে না। ৪. সুরেন্দ্র কুমার সিনহা যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয় নেবার জন্য তড়িঘড়ি করে এই বই লিখেছেন।

প্রথমে আসুন উপলব্ধি কে কেন প্রমাণ দিয়ে প্রতিষ্ঠিত করা প্রয়োজন সেই পয়েন্টে। শেখ মুজিব হত্যাকা-ের বিচার চলার সময় কর্নেল (অব.) হামিদকে বাদীপক্ষ সাক্ষী হিসেবে আদালতে উপস্থাপন করেছিল। তিনি তার লেখা তিনটি সেনা অভ্যুত্থান ও কিছু না বলা কথা বইতে হত্যাকা-ের বিষয়ে এমন কিছু বর্ণনা দিয়েছিলেন। যা আমরা ১৯৭৫ সালের আগস্ট মাসেই জানতাম। মুখে মুখে এই কথাগুলো ভেসে বেড়াতো, আমাদের উপলব্ধি ছিল ১৫ আগস্ট ভোরে ধানমন্ডি ৩২ নম্বরে কি হয়েছে, কিন্তু তারপরও প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপিত হয়েছিল কর্নেল (অব.) হামিদ এর বইটি।

যারা দাবী করছেন, আওয়ামী লীগ এবং হাসিনা সম্পর্কে সুরেন্দ্র কুমার সিনহার বইয়ে দেয়া তথ্যগুলো আগে থেকেই জানেন বলে এই বইয়ের প্রয়োজন নেই, তাদের ফেসবুক টাইমলাইন ঘুরে একটু পেছনে যান। দেখবেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের বিষয়ে পর্নতারকা স্টর্মি ডানিয়েলস এর সাক্ষাতকার এবং বইয়ের ঘটনা উনারা সাড়ম্বরে শেয়ার করে বসে আছেন। ডোনাল্ড ট্রাম্প যে ব্যক্তিগত জীবনে দুশ্চরিত্র সেটার উপলব্ধি তো আমাদের ছিলোই, তাহলে আবার স্টর্মি ডানিয়েলস এর সাক্ষাতকার বা বই শেয়ার করার প্রয়োজন পড়লো কেন? ইরাকে ব্যাপক বিধ্বংশী অস্ত্র আছে এই অজুহাতে বুশ ও তার মিত্ররা সেখানে হামলা চালিয়ে ১০ লক্ষের বেশি নিরস্ত্র মানুষকে হত্যা করেছিল। সারা বিশ্বের সাধারণ মানুষের উপলব্ধি ছিল ব্যাপক বিধ্বংশী অস্ত্র থাকার অভিযোগটি মিথ্যা। এরপর যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা সংস্থা থেকে যখন স্বীকার করা হলো, অভিযোগ মিথ্যা ছিল, তখন কেন সেটাকে এত প্রচার করা হলো? উপলব্ধি কী যথেষ্ট ছিল না?

ভবিষ্যতে যদি কোনদিন আপনি এইসব অনিয়মের বিচার করতে চান, তাহলে কি আদালতে গিয়ে বলবেন, মাই লর্ড আমরা সবাই জানি, বিচারের নামে প্রহসন হয়েছে। কাজেই যারা এই হত্যাকা-ের সাথে জড়িত, তাদের শাস্তি দিন। আর অমনি আদালত শাস্তি দিয়ে দেবেন? নাকি প্রমাণ হিসেবে আদালতে কিছু একটা উপস্থাপন করতে হবে? এবার আসুনÑসুরেন্দ্র কুমার সিনহা নিজে দুর্নীতি করেছেন, বিচারের নামে প্রহসনের সাথে জড়িত ছিলেন কিন্তু তারপরও তার বইকে কেন আমাদের গুরুত্ব দিতে হবে, সেই পয়েন্টে।

রাজসাক্ষী কিংবা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি কথাগুলোর সাথে আপনার পরিচয় আছে? অনেক সাক্ষ্য প্রমাণবিহীন মামলাতেই অপরাধের সাথে জড়িত কোন ব্যক্তির স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দির ভিত্তিতে অন্য অপরাধীদের অপরাধ অধিকতর তদন্তের মাধ্যমে প্রমাণ করে শাস্তি দেয়া হয়। সুরেন্দ্র কুমার সিনহার বইটাকে যে সেভাবে ব্যবহার করা সম্ভব, তা ভেবে দেখেছেন?

সুরেন্দ্র কুমার সিনহার ইংরেজি খুবই দুর্বল, এই বই পড়লে বা প্রচার করলে উনাদের মান-সম্মান থাকে না। এটা আরো ইন্টারেস্টিং পয়েন্ট। আপনি চাইলে এই পয়েন্ট দিয়েই সমগ্র বিশ্বকে দেখিয়ে দিতে পারেন : দেখ, কেমন অযোগ্য লোককে কেবলমাত্র রাজনৈতিক বিবেচনায় একটি দেশের প্রধান বিচারপতি নিয়োগ করা হয়েছিল। এছাড়াও আরেকটা বিষয় আপনি ভুলে যাচ্ছেন যে, এখানে প্রমাণটাই আসল। কত দুর্বল ভাষায় সেটা লেখা হয়েছে তাতে কিছু আসে যায় না। এটা কোন উপন্যাস কিংবা অভিসন্দর্ভ না, এটা বাংলাদেশের বিচার বিভাগকে কিভাবে ধ্বংস করা হয়েছে তার প্রমাণ।

সিনহার বই বিষয়ে সবচেয়ে হাস্যকর দুইটা যুক্তি দাঁড় করিয়েছেন যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত উচ্চশিক্ষিত একজন প্রবাসী। তার দাবী অনুযায়ী সিনহা এই বই লিখেছেন, যুক্তরাষ্ট্রে রাজনৈতিক আশ্রয় নিশ্চিত করতে এবং যুক্তরাষ্ট্র কর্তৃপক্ষ যেন তার বিরুদ্ধে জুডিশিয়াল কিলিং এর মামলা না চালায়, তা নিশ্চিত করতে। ওয়েল, একটি দেশের সাবেক প্রধান বিচারপতি, যার আত্মীয়রা থাকে অস্ট্রেলিয়া এবং কানাডায়। সে কোন কারণে যুক্তরাষ্ট্রে গিয়ে রাজনৈতিক আশ্রয় নিচ্ছেন, সেটা যদি এই ভদ্রলোক উপলব্ধি না করতে পেরে থাকেন, তাহলে মার্কিন পলিসি সম্পর্কে উপলব্ধি বিষয়ক তার সকল লেখালেখিই বৃথা। আর আইন-কানুন সম্পর্কে যদি উনার সামান্যতম ধারণাও থাকতো, তাহলে উনার জানার কথা ছিলো যে, রাজসাক্ষী কিংবা স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয়া অপরাধীদেরও শাস্তি দেয়া হয়। স্বীকারোক্তি দিলেই শাস্তি মাফ হয়ে যায় না। তাছাড়া, উনি যদি যুক্তরাষ্ট্রের এত প্রভাবশালী ব্যক্তিই হয়ে থাকেন, তাহলে উনার উচিত যুক্তরাষ্ট্রের আদালতে সুরেন্দ্র কুমার সিনহাকে বিচার করে শাস্তি দেবার দৃষ্টান্ত স্থাপন করা।

বাংলাদেশের আদালতগুলোতে ন্যায় বিচার পাওয়া যায় না। বিচাররকরা কেন নিরপরাধ ব্যক্তিকে শাস্তি দিতে বাধ্য হন, সেটা সুরেন্দ্র কুমার সিনহা তার বইতে লিখেছেন। সুরেন্দ্র কুমার সিনহা যত অযোগ্যই হন না কেন, তিনি বাংলাদেশের প্রধান বিচারপতি ছিলেন। বিচার বিভাগের সর্বোচ্চ পদে থাকার সময় তার অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বই লিখে সমগ্র বিশ্বকে জানাচ্ছেনÑকিভাবে বাংলাদেশের সরকার বিচারকদের উপর চাপ সৃষ্টি করে রায় ফরমায়েশি রায় দিতে বাধ্য করে। আপনার-আমার যত যোগ্যতাই থাকুক না কেন, ঐ পদের ভার আর প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার কারণেই সুরেন্দ্র কুমার সিনহার বইটা একটা গুরুত্বপূর্ণ দলিল। এখানে লেখকের ভাষাগত দুর্বলতা বা তার ব্যক্তি চরিত্র গুরুত্বপূর্ণ না।

আপনি এখন বাংলাদেশে শাসন ক্ষমতা দখল করে রাখা সরকারের আমলে ন্যায়বিচার বঞ্চিত মানুষদের একাট্টা করতে পারেন, তাদের সামনে দৃষ্টান্ত রেখে বলতে পারেন। যে দেশে সরকারের ইচ্ছা অনুযায়ী রায় না দেবার কারণে তিনজন বিচারপতিকে (জয়নুল, মোতাহার এবং সিনহা) প্রাণের ভয়ে দেশ ছাড়তে হয়, যে দেশের সাবেক প্রধান বিচারপতি তার আত্মজীবনীতে বর্ণনা করে দেখিয়েছেন, কিভাবে সরকারের ইচ্ছা অনুযায়ী রায় দেবার জন্য বিচারকদের উপর গোয়েন্দা সংস্থা দিয়ে চাপ প্রয়োগ করা হয়। দুর্ব্যবহার করানো হয়, সেই দেশে আখতারুজ্জামানদের মত বিচারকরা নিরপরাধ বেগম খালেদা জিয়াকে সাজা দিয়ে জেলে পাঠাবে, আর উচ্চ আদালত তাকে জামিন দেবে না, এটাই তো স্বাভাবিক।

দেশের বিচার বিভাগ নষ্ট করার প্রত্যক্ষ প্রমাণ আমাদের হাতে এসেছে। এটাকে বিতর্কিত করে স্বৈরাচারী সরকারকে সুবিধা পাইয়ে দিয়ে আবার নিজেকে এই স্বৈরাচারী সরকারের বিরোধী দাবী করবেন? কিভাবে? পরিচিতি : অধ্যাপক, জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়/ সম্পাদনা : রেজাউল আহসান

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত