প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কার স্বপ্ন, কে ভাঙলো?

প্রভাষ আমিন : সুরেন্দ্র কুমার সিনহা যেদিন প্রধান বিচারপতির দায়িত্ব নেন, সেদিন আমি তাকে অভিনন্দন জানিয়েছিলাম। অভিনন্দন জানিয়েছিলাম প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেও। দিনটি আমার জন্য খুব আনন্দের ছিল। পাকিস্তান আমলে এ অঞ্চলের মানুষ বঞ্চিত ছিল, শোষিত ছিল; সংখ্যালঘুদের বঞ্চনা ছিল আরও বেশি। ৪৭ এবং ৬৫-তে দলে দলে সংখ্যালঘু দেশ ছেড়েছিল। একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ হয়েছিল অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশ গড়ার স্বপ্নে। কিন্তু সে স্বপ্ন বাস্তবায়িত হয়নি। স্বাধীনতার পরও সংখ্যালঘুদের উপর অত্যাচার, নির্যাতন, নিপীড়ন কমেনি, বরং বেড়েছে। সংখ্যালঘুদের সংখ্যা অনুপাতে আরও কমেছে। এই যখন অবস্থা, তখন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একজনের প্রধান বিচারপতি হওয়াটা বড় অগ্রগতি ছিল।

কিন্তু অগ্রগতিটা শেষ পর্যন্ত অগ্রগতি থাকেনি। বরং তার পরিণতি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে আরও বিপাকে ফেলেছে। দেশের প্রথম সংথ্যালঘু প্রধান বিচারপতি হিসেবেই সুরেন্দ্র কুমার সিনহার নাম ইতিহাসে লেখা থাকতে পারত। কিন্তু পরে তিনি পরিণত হন দেশের সবচেয়ে আলোচিত ও সমালোচিত প্রধান বিচারপতিতে। আরেকটা দিক দিয়েও তিনি সবার আগে থাকবেন। তার আগে কোনো প্রধান বিচারপতি এত কথা বলেননি। বঙ্গবন্ধু হত্যা মামলার রায়, যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠনসহ তার অনেক গুরুত্বপূর্ণ অবদান আছে। কিন্তু বিচারপতিদের অপসারণেরএরপর পৃষ্ঠা ২, সারি

(প্রথম পৃষ্ঠার পর)  ক্ষমতা সংসদের হাতে থাকবে না সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলের হাতে থাকবে তা নিয়ে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীকে কেন্দ্র করে নির্বাহী বিভাগের সাথে বিচার বিভাগের টানাপড়েন শুরু হয়। এর আগেও বিচার বিভাগের সাথে নির্বাহী বিভাগ ও আইন বিভাগের টানাপড়েন হয়েছে। কিন্তু তা অস্বস্তিকর অবস্থায় যাওয়ার আগে মিটেও গেছে। কিন্তু এস কে সিনহার অতিকথন আর একগুয়েমির কারণে এবার পরিণতি হয় সবার জন্যই বিব্রতকর। বিশেষ করে তিনি যখন কোর্টে পাকিস্তানের প্রসঙ্গ টেনে সরকারকে পরোক্ষ হুমকি দিয়ে নিজের পরিণতিকে অবশ্যম্ভাবী করে  তোলেন। তারপরও যেভাবে তাকে দেশ ছাড়তে হয়, যেভাবে বিদেশ  থেকে পদত্যাগপত্র পাঠাতে হয়; তা শুধু ব্যক্তি এস কে সিনহার জন্য নয়, দেশের বিচার বিভাগের জন্যও অস্বস্তিকর, বিব্রতকর।

দেশের বাইরে যাওয়ার ধরনেই বোঝা গেছে, এস কে সিনহা চ্যাপ্টার ক্লোজ হয়ে যায়নি। বছরখানেক পর তিনি আবার মুখ খুললেন, কলম ধরলেন। নির্বাচনের আগে আগে ইংরেজিতে লেখা তার বই ‘অ্যা ব্রোকেন ড্রিম : রুল অব ল, হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড  ডেমোক্রেসি’ বাংলাদেশের রাজনীতিতে আলোচনার ঝড় তুলেছে। বইটি পেয়েছি, তবে এখনো পড়া হয়নি। তাই বলতে পারব না, কার স্বপ্ন, কে ভেঙেছে? তবে পত্রপত্রিকায় চুম্বক অংশ পড়ে বুঝেছি, তার আনা বেশকিছু অভিযোগ সরকারের জন্য বিব্রতকর। তবে বইটি বিব্রতকর তার জন্যও। তিনি আওয়ামী লীগ সমর্থকদের কাছে তো বিরাগভাজন ছিলেনই, বই প্রকাশের পর ভিলেন হয়েছেন বিএনপি-জামায়াত সমর্থকদের কাছেও। বইয়ে যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনাল গঠনে নিজের ভূমিকার কথা বলেছেন জোর গলায়। এখন বিএনপি-জামায়াত সমর্থকরা তাকে বলছেন ‘জুডিশিয়াল কিলিংয়ের হোতা’। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে বিএনপি-জামায়াত সমর্থকরোও তার বিচার চেয়েছে।

যেভাবে এস কে সিনহাকে বিদায় নিতে হয়েছে, যেভাবে রাষ্ট্রপতি  তার অধস্তনদের হাতে সিনহার নৈতিক স্খলনের অভিযোগ তুলে দিয়েছেন; তা আমার ভালো লাগেনি। প্রথমে তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ আমি বিশ্বাস করিনি। কিন্তু যেভাবে তিনি দেশ ছেড়ে  গেলেন, তাতে আমার সে বিশ্বাস টলে গেছে। তিনি নিজের বিবেকের কাছে পরিষ্কার থাকলে দেশে থেকেই লড়াই করতে পারতেন। সরকার যত খারাপই হোক, একজন সৎ সাবেক প্রধান বিচারপতির বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নিতে পারত? আমার মনে হয়েছে, কোথাও না কোথাও ঘাপলা ছিল বলেই তিনি পালিয়েছেন। এতদিনেও তিনি তার বিরুদ্ধে আনা সুনির্দিষ্ট অভিযোগের কোনো জবাব দেননি। বিশাল বইয়েও কিছু লেখেননি। নিউইয়র্কের টাইম টেলিভিশনের সাক্ষাৎকারে এ বিষয়ে তাকে প্রশ্ন করা হয়েছিল। তিনি খালি বলেছেন, ষোড়শ সংশোধনীর আগে তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ ছিল না। এই জবাব যথেষ্ট নয়। তিনি যে নিউজার্সিতে বিলাসবহুল বাড়িতে থাকছেন, তার উৎস কী? এসব প্রশ্নের সুনির্দিষ্ট জবাব জানা জরুরি।

‘অ্যা ব্রোকেন ড্রিম’ লিখে এস কে সিনহা তার ভেঙে যাওয়া স্বপ্ন আবার জোড়া লাগানোর কোনো স্বপ্ন দেখছেন কিনা; সময়ই সেটা বলে দেবে।

লেখক : হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত