প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সেলফ সেন্সরশিপের ডিজিটাল যুগে স্বাগতম

শেখ মিরাজুল ইসলাম: অবশেষে ‘ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন’ কণ্ঠ ভোটে পাস হয়েছে জাতীয় সংসদে। আরও দুটো গুরুত্বপূর্ণ বিল পাস হয়েছে একই সাথে। একটি হচ্ছে বহুল আলোচিত ‘সড়ক পরিবহন বিল ২০১৮’ এবং ‘কওমি মাদ্রাসা সমূহের দাওরায়ে হাদিসের সনদকে মাস্টার্স ডিগ্রি সমমনা প্রদান বিল, ২০১৮’। সংসদে সীমিত পরিসরে এই বিলগুলোর ব্যাপারে বিরোধী দল জাতীয় পার্টির পক্ষ থেকে জনমত যাচাইয়ের প্রস্তাব আসলেও স্বাভাবিকভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতার আড়ালে বিল তিনটি পাস হয়ে যায়। আলোচিত তিন আইনের মধ্যে সবার আলাদা দৃষ্টি ছিল ডিজিটাল আইনের ব্যাপারে। ৫৭ ধারার সমার্থক নাকি সেই কালো আইনের পুনরাবৃত্তির ভিন্নরূপ তা সময়ে বোঝা যাবে।

ডিজিটাল আইনের চৌদ্দটি ধারাকে অ-জামিন যোগ্য রাখা হয়েছে। অনুসন্ধানী ও স্বাধীন সাংবাদিকতার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হয়ে দেখা দিতে পারে এই আইনে ব্রিটিশ আমলের সমালোচিত ‘অফিশিয়াল সিক্রেটস অ্যাক্ট’ সংযোজন। অর্থাৎ ডিজিটাল মাধ্যমে কেউ অফিশিয়াল বা রাষ্ট্রীয় গোপনীয়তা ভঙ্গ করলে সর্বোচ্চ সাজা হতে পারে ১৪ বছর কারাদ-। এর বাইরে আমজনতার জন্য নতুন ডিজিটাল আইনে পুরানো ৫৭ ধারার অনুরূপ বিধি-নিষেধ বহাল থাকছে। যেমন ডিজিটাল মাধ্যমে আক্রমণ, মিথ্যা বা ভীতি- প্রদর্শনের তথ্য প্রকাশ, মানহানিকর তথ্য প্রকাশ, ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত, আইনশৃঙ্খলার অবনতি ঘটানো, অনুমতি ছাড়া ব্যক্তিগত তথ্য সংগ্রহ ইত্যাদি বিষয়ে নানা মেয়াদী শাস্তির সুব্যবস্থা আছে নতুন ডিজিটাল আইনে। এ ছাড়া পুলিশকে কোনো গ্রেপ্তারি পরোয়ানা ও কারও অনুমোদন ছাড়াই তল্লাশি, জব্দ ও গ্রেপ্তারের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।

এই আইন বাতিল চেয়ে কারও উৎসাহী ‘হ্যাশট্যাগ’ বা এর প্রতিবাদে দেওয়া বক্তব্য যদি কারও দৃষ্টিতে উদ্দেশ্যমূলক মনে হয়, তবে তার বিপক্ষেও ব্যবস্থা নেওয়া যেতে পারে। কারণ এই আইন অস্বীকার করা বা বাতিল চাওয়ার পরোক্ষ অর্থের ব্যাখ্যা হতে পারে রাষ্ট্রের নিরাপত্তাকে উপেক্ষা করতে চাওয়া। আর রাষ্ট্র তথা সরকারকে বিপন্ন করবার গূঢ় অর্থ হতে পারে, যারা এই আইনের বিরোধী তারা দেশ ও জাতির মঙ্গল চায় না। সুতরাং ক্ষমতাসীনদের সব কিছুর সাথে সহমত প্রকাশের কোনো বিকল্প নেই। সেই আলোকে জনমত গঠনের ‘ঐতিহাসিক’ দলিল হিসেবে আইনটির বিশেষ গুরুত্ব ও ভূমিকা আগামীতে উপেক্ষা করা জটিল হবে। তবে এটাও মনে রাখা দরকার, চীন ও উত্তর কোরিয়ার কায়দায় জনমত ও মিডিয়া নিয়ন্ত্রণের এই পদ্ধতি আমাদের সাধারণ জনগণ আত্মীকরণ করবেন না। মতপ্রকাশের স্বাধীনতা আদায়ে বাঙালি জাতির জোরাল ইতিহাস আছে।

নতুন ডিজিটাল আইনের হাত ধরে ‘সেলফ সেন্সরশিপের’ নব্য যুগে প্রবেশের প্রতিক্রিয়া নিউটনের তৃতীয় সূত্র মেনে চলবে নাকি অচিরেই সকল সোশ্যাল-প্রিন্ট-ইলেকট্রনিক মিডিয়া ভরে উঠবে স্তুতিমূলক ফুল-লতা-পাতা আর পোষা পাখির কলতানে তা দেখার অপেক্ষায় আছি।

লেখক : চিকিৎসক ও লেখক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত