প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সরকারকে আলোচনার আলটিমেটাম

ডেস্ক রিপোর্ট : নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার গঠনে আগামী ৩০ সেপ্টেম্বরের মধ্যে সব দলের সঙ্গে আলোচনায় বসতে সরকারকে আলটিমেটাম দিয়েছে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়া। তফসিলের আগে সংসদ ভেঙে দেওয়া ও নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনেরও দাবি তুলেছে এই জোট।

বিকল্পধারার সভাপতি ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী (বি. চৌধুরী) এবং গণফোরামের সভাপতি ড. কামাল হোসেনের নেতৃত্বাধীন জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার নাগরিক সমাবেশ থেকে এসব দাবি জানানো হয়েছে। গতকাল শনিবার রাজধানীর গুলিস্তানে মহানগর নাট্যমঞ্চে এ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়।

এতে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরসহ দলটির জ্যেষ্ঠ নেতারা যোগ দেন। ছিলেন বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের নেতারাও। জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম, খেলাফত মজলিসসহ কয়েকটি ধর্মভিত্তিক দলের নেতারা যোগ দিলেও আমন্ত্রণ পায়নি জামায়াতে ইসলামী।

‘বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য’ গড়তে গত ১৫ সেপ্টেম্বর পাঁচ দফা দাবি ও নয়টি লক্ষ্য ঘোষণা করেন জাতীয় ঐক্যের সভাপতি ড. কামাল। গতকালের সমাবেশ থেকেও একই দাবি জানানো হয়। তেল-গ্যাস-খনিজ সম্পদ ও বিদ্যুৎ-বন্দর রক্ষা জাতীয় কমিটির আহ্বায়ক প্রকৌশলী শেখ শহীদুল্লাহ সমাবেশের ঘোষণাপত্র পাঠ করেন। এতে শুরুতেই বলা হয়েছে, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বাক্ষরিত সংবিধান আজ উপেক্ষিত।

ঘোষণাপত্রে কারাবন্দি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার আইনগত ও ন্যায়সঙ্গত অধিকার রক্ষার দাবি জানানো হয়। নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার গঠন, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন, তফসিলের আগে সংসদ ভেঙে দেওয়া, ভোটে বিচারিক ক্ষমতাসহ সেনা মোতায়েন ও ইভিএম ব্যবহার না করার দাবি জানানো হয়।

দাবি আদায়ে প্রতিটি জেলা-উপজেলা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে মুক্তিসংগ্রামের চেতনায় বিশ্বাসী সব রাজনৈতিক দল, ব্যক্তি, শ্রেণি-পেশা ও নাগরিক সমাজের সমন্বয়ে ‘বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য’র কমিটি গঠনের আহ্বান জানানো হয়।

সমাবেশে বিএনপি নেতাকর্মীদের উপস্থিতিই ছিল বেশি। বিকল্পধারা, গণফোরাম, জেএসডি ও নাগরিক ঐক্যের খণ্ড খণ্ড মিছিল এলেও তাদের কর্মী ছিল হাতেগোনা। বিকেল ৩টার আগেই কাজী বশিরউদ্দিন মিলনায়তন পূর্ণ হয়ে ভিড় ছাড়ায় নাট্যমঞ্চের আঙিনায়।

প্রধান অতিথির বক্তব্যে যুক্তফ্রন্টের চেয়ারম্যান বি. চৌধুরী বলেন, যুক্তফ্রন্ট স্বাধীনতার পক্ষের শক্তির ঐক্য চায়। যারা স্বাধীনতায় বিশ্বাস করবে না, মানচিত্রে বিশ্বাস করবে না, তাদের কেমন করে বিশ্বাস করব?

বিএনপির মনোনয়নে রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হওয়া বি. চৌধুরী বলেন, তিনি স্বাধীন ও মুক্ত গণতন্ত্র চান। বর্তমান সরকারের পতন চান। তার অভিযোগ, আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকার স্বেচ্ছাচারী ও স্বৈরাচারে পরিণত হয়েছে। ভবিষ্যতে যেন আর এ ধরনের সরকার ক্ষমতায় বসতে না পারে, সে জন্য সাংবিধানিক রক্ষাকবজ চান, ক্ষমতার ভারসাম্য তৈরি করতে চান তিনি।

বিএনপি ছেড়ে বিকল্পধারা গঠন করা বি. চৌধুরী খালেদা জিয়াসহ সব রাজবন্দির মুক্তি দাবি করেন। নিরাপদ সড়ক ও কোটা সংস্কারের দাবিতে আন্দোলন করা শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে থাকা মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানান। ইভিএমকে ভোট চুরির পাঁয়তারা অভিযোগ করে ভোটযন্ত্রের ‘যন্ত্রণা’ বন্ধের দাবি জানান। তিনি বলেন, সারা দুনিয়ায় ইভিএম পরিত্যক্ত। চার হাজার কোটি টাকায় ইভিএম কেনা হচ্ছে দুর্নীতি করতে।

বি. চৌধুরী অভিযোগ করেন, সরকার ক্ষমতা পাকাপোক্ত করতে র‌্যাব-পুলিশকে জনগণের বিপক্ষে লেলিয়ে দিয়েছে। তিনি বলেন, র‌্যাব-পুলিশ এ দেশের সন্তান। তাদের আমাদের বিরুদ্ধে ব্যবহার করা হচ্ছে। সরকারকে হুঁশিয়ার করে বলেন, ‘এর জবাব দিতে হবে। এমন দিন সব সময় যাবে না।’

জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সভাপতি ড. কামাল হোসেন বলেন, জনগণের ভোটাধিকারসহ মৌলিক অধিকার, মানবাধিকার ও সাংবিধানিক অধিকার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে কার্যকর গণতন্ত্র, আইনের শাসন ও আইনের নিরপেক্ষ প্রয়োগ নিশ্চিত করতে বৃহত্তর জাতীয় ঐক্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছেন। জনগণ এতে ব্যাপক সাড়া দিয়েছে। মৌলিক বিষয়ে মানুষ ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। সমমনা রাজনৈতিক দলগুলোকে ঐক্যবদ্ধ করার সময় এসেছে। তিনি আশাবাদী, তাদের প্রচেষ্টা সফল হবে।

প্রধান বক্তা মির্জা ফখরুল বলেন, জাতির চরম দুর্দিনে জনগণকে পথ দেখানোর জন্য ড. কামাল হোসেনের ডাকে আয়োজিত এই সমাবেশ জাতীয় ঐক্যকে এক ধাপ এগিয়ে নিয়েছে। দেশ, জনগণ, স্বাধীনতা ও গণতন্ত্রকে বাঁচাতে জাতীয় ঐক্যের বিকল্প নেই। বর্তমান সরকারে দুঃশাসন স্বাধীনতার স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছে। গণতন্ত্রের মূল্যবোধ ধ্বংস করে তারা একদলীয় শাসন ব্যবস্থার দিকে ধাবিত হচ্ছে। তাই এ সরকারকে যদি সরাতে না পারি, জনগণের সরকার প্রতিষ্ঠা করতে না পারলে স্বাধীনতা থাকবে না। এর জন্য দরকার সবার অংশগ্রহণে একটি অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন; যে নির্বাচনে দেশের জনগণ ভোটাধিকার প্রয়োগ করে তাদের পছন্দের প্রতিনিধি দিয়ে সরকার প্রতিষ্ঠা করতে পারবে।

মির্জা ফখরুল বলেন, সবার অংশগ্রহণে নির্বাচনী পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হলে এই সরকারকে পদত্যাগ করতে হবে, সংসদ ভেঙে দিতে হবে, নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করতে হবে, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন করতে হবে, বিচারিক ক্ষমতা দিয়ে নির্বাচনের দায়িত্বে সেনাবাহিনী মোতায়েন করতে হবে; ইভিএম বাতিল করতে হবে। তিনি বলেন, জনগণের নূ্যনতম এ দাবি আদায়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। এ প্রচেষ্টার মাধ্যমে এই সরকারকে বাধ্য করতে হবে সবার অংশগ্রহণে একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন দিতে।

মির্জা ফখরুল বলেন, বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া গণতন্ত্রের জন্য আজীবন সংগ্রাম করেছেন। তাকে প্রতিহিংসামূলক মামলায় স্যাঁতসেঁতে, পুরনো কারাগারে বন্দি করে রাখা হয়েছে। চিকিৎসা থেকে শুরু করে তার জামিন লাভের আইনি সুবিধা থেকেও বঞ্চিত করা হচ্ছে। কারাগার থেকে তিনি খবর পাঠিয়েছেন, ‘আমার যাই হোক, যে কোনো মূল্যে জাতীয় ঐক্য করে এই দুঃশাসনকে সরাতে হবে। এ সরকারকে হঠাতে হবে।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেন, জাতীয় ঐক্যের দিকে সারাদেশের মানুষ তাকিয়ে আছে, যা এই সমাবেশের মাধ্যমে ইতিমধ্যে সৃষ্টি হয়েছে। তিনি বলেন, নির্বাহী বিভাগ, বিচার বিভাগ ও আইনের শাসনকে এ সরকার ভূলুণ্ঠিত করেছে, ধ্বংস করেছে।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বলেন, সুন্দর দেশ গড়তে জাতীয় ঐক্য একটি নতুন মাইলফলক, নতুন যাত্রা। একে আরও সুসংহত করতে হবে। দেশের সব শ্রেণির মানুষকে ঐক্যবদ্ধ করতে হবে।

স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. আবদুল মঈন খান বলেন, ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য তালিকায় বাংলাদেশ প্রথম। বর্তমান সরকার স্বাধীনতা আর মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে রক্ষা করতে পারেনি।

জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডির সভাপতি আ স ম আবদুর রব বলেন, মানুষ আর ঘরে থাকতে চান না। তিনি নেতাকর্মীদের মাঠে নামার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, দেশ আজ গুম, খুন, অপহরণ, বেওয়ারিশ লাশে পরিণত হয়েছে। ব্যাংকে আজ টাকা নেই, খনিতে কয়লা নেই- সব লুট হয়ে গেছে। কবে যে দেশের মানচিত্র লুট হয়ে যায়, সেই আতঙ্কে রয়েছি।

নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, এ সরকারের অধীনে নির্বাচন হলে আবারও ২০১৪ সালের মতো ৪২০ মার্কা নির্বাচন হবে। পুরো দেশের মানুষ আতঙ্কিত ও শঙ্কিত তারা কি ভোট দিতে পারবে? নাকি পুলিশ দিয়ে ভোট বাক্স ভরে সরকার আবারও ক্ষমতায় আসবে?

গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি ডা. জাফরুল্লাহ্‌ চৌধুরী বলেন, প্রধানমন্ত্রী যা বলেন, তা করেন না। তার মূল পরামর্শদাতা ভারতীয় গোয়েন্দা সংস্থা র ও ইসরায়েলের মোসাদ। প্রধানমন্ত্রীকে উদ্দেশ করে তিনি বলেন, ‘সোজা পথে আসেন। সংসদ ভেঙে নির্বাচন দিন।’

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন বলেন, স্বাধীনতার এত বছর পরেও এ দেশের জনগণকে তাদের ভোটাধিকারের জন্য সংগ্রাম করতে হয়। এটা জাতি হিসেবে তাদের কাছে লজ্জার বিষয়। মুক্তিযুদ্ধ করে জনগণ স্বাধীন করেছে আর এই চেতনার কথা এখন ক্ষমতাসীন সরকারের কাছে শুনতে হয়। সংসদ নির্বাচন হতে হবে সংসদীয় গণতন্ত্রের রীতিতে। ভারতসহ অন্যান্য কোনো গণতান্ত্রিক দেশে সংসদ বহাল রেখে নির্বাচনের কোনো নজির নেই।

জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সদস্য সচিব আ ব ম মোস্তফা আমিনের পরিচালনায় সমাবেশে বক্তৃতা করেন বিকল্পধারার মহাসচিব মেজর (অব.) আবদুল মান্নান, গণসংহতি আন্দোলনের সভাপতি জোনায়েদ সাকী, সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট জয়নাল আবেদীন, গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী, সাধারণ সম্পাদক মোস্তফা মহসিন মন্টু, ডাকসুর সাবেক ভিপি সুলতান মো. মনসুর আহমদ, শিক্ষাবিদ মোমেনা খাতুন প্রমুখ।

উপস্থিত ছিলেন জেএসডির সাধারণ সম্পাদক আবদুল মালেক রতন, বিকল্পধারার মাহী বি চৌধুরী, ওমর ফারুক, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান নিতাই রায় চৌধুরী, সাবেক এমপি মেজর (অব,) আখতারুজ্জামান রঞ্জন, ২০ দলীয় জোটের শরিক জাতীয় পার্টির মোস্তফা জামাল হায়দার, আহসান হাবিব লিংকন, কল্যাণ পার্টির সৈয়দ মুহাম্মদ ইবরাহিম, এনপিপির ফরিদুজ্জামান ফরহাদ, খেলাফত মজলিশের মাওলানা মজিবুর রহমান, আহমেদ আবদুল কাদের, জাগপার খোন্দকার লুৎফর রহমান, জমিয়তের উলামায়ে ইসলামের মাওলানা নুর হোসেইন কাসেমী, আবদুর রব ইউসুফীসহ কয়েক হাজার নেতাকর্মী উপস্থিত ছিলেন।

গতকাল দুপুর আড়াইটায় সমাবেশের কার্যক্রম শুরু হয়। কিন্তু বিদ্যুৎ বিভ্রাটে বেলা পৌনে ৩টা থেকে প্রায় ২০ মিনিট সমাবেশ বন্ধ থাকে। নাগরিক সমাবেশ ঘিরে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর ব্যাপক তৎপরতা ছিল। নাট্যমঞ্চের ভেতরে ও বাইরে ইউনিফরম ও সাদা পোশাকে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর বিপুল সংখ্যক সদস্য মোতায়েন ছিলেন। কর্মসূচিতে বাধা দেওয়া বা অপ্রীতিকর কোনো ঘটনা ঘটেনি। ধরপাকড়ের খবরও পাওয়া যায়নি।

গত বছরের ডিসেম্বরে বিকল্পধারা, জেএসডি, নাগরিক ঐক্য ও বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বাধীন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগ গঠন করে যুক্তফ্রন্ট। পরে কাদের সিদ্দিকী জোট ছাড়েন। যুক্ত হন ড. কামাল। বিএনপি স্বাগত জানিয়ে তাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছে। তবে আওয়ামী লীগ একে ‘ষড়যন্ত্র’ আখ্যা দিয়ে আসছে। সূত্র : সমকাল

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ