প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

adv 468x65

ঢাবি ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থী প্রসঙ্গ, কিছু স্মৃতি এবং ছাত্রলীগ

প্রীণন ফারুক : কৈশোর থেকেই আমি খুব গোঁয়ার টাইপ ও নিজের সিদ্ধান্ত নিজে নিজেই নিই, পরিবার বাগড়া সৃষ্টি করে নি কিংবা সুযোগ পায় নি। এইচএসসি পাশের পর সিদ্ধান্ত নিলাম আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়েই পড়বো আর সেটা সাহিত্য নিয়ে, বাংলা কিংবা ইংরেজি বিভাগে। অন্য কোথাও  থেকে ফরম না কিনে, এমনকি ঢাবি ঘ ইউনিট থেকেও না কিনে কেবল খ ইউনিটের ফরমই কিনলাম। শৈশব থেকেই আমার আত্মবিশ্বাসের লেভেল দারুণ পর্যায়ের ছিলো, আমি কী পারি আর কী পারি না সেটা বুঝতাম! এ নিয়ে অনেক মজার মজার ঘটনা আছে। যা হোক, আমার আজকের প্রসঙ্গে আসি।

তখন আমি ঢাকায় থাকি না, গ্রামে থাকি। ভর্তি পরীক্ষা দিতে ঢাকায় এলাম বৃহস্পতিবার বিকেলে। বন্ধুর ছোট ভাই থাকতো মালিবাগে। কথা ছিলো ওখানেই থাকবো। কিন্তু গিয়ে দেখি তালা, সে বাড়ি চলে গেছে! অগত্যা কী ভেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে চলে আসলাম। পকেটে মোটামুটি টাকা আছে। একবার ভাবলাম কোন হোটেলে উঠি, আবার ভাবলাম ক্যাম্পাসের কোন বারান্দায় বসে রাত কাটিয়ে সকালে পরীক্ষা দিয়েই বাড়ি চলে যাবো! এসব ভাবতে ভাবতে মল চত্বরে পায়চারি করছি, রাত তখন সম্ভবত ৮টার মতো।

হঠাৎ দেখা হয়ে গেলো আমার গ্রামের শেষ প্রান্তের এক বড় ভাইয়ের সাথে। গ্রামে ওদের সাথে ভালোই সম্পর্ক আমাদের। আমি আমার অসহায়ত্বের কথা বললাম। এটাও জানতে চাইলাম এক রাতের জন্য ওর ওখানে আশ্রয় পেতে পারি কিনা! তিনি অপারগতা প্রকাশ করে আমাকে ত্যাগ করলেন! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফরম কিনতে আসার দিন বাসস্ট্যান্ডে দেখা হয়েছিলো আমার এক শিক্ষকের মেয়ের সাথে, যিনি আমাকে নিজের ছোট ভাইয়ের মতো স্নেহ করতেন। তার ছোট ভাই আমার সহপাঠীও ছিলো হাইস্কুলে। কী ভেবে যেন তিনি সেদিন একজন ঢাবি ছাত্রের হলের নাম ও কক্ষ নম্বর দিয়ে বলেছিলেন, কোন প্রয়োজন হলে আমি যেন তার সাথে দেখা করি। তিনি তার বন্ধু। মল চত্বরে পায়চারি করতে করতে হঠাৎ মনে পড়ে গেলো ‘মিজান(বিদ্যুৎ), ২১২, বঙ্গবন্ধু হল, ঢাবি’ ঠিকানাটা। লোকজনের কাছে জিজ্ঞেস করে পৌঁছে গেলাম বঙ্গবন্ধু হলের ২১২ নম্বর কক্ষে। দরজায় টোকা দিতেই একজন বেরিয়ে এলেন। তাকে মিজান ভাইয়ের কথা জিজ্ঞেস করতেই তিনি হেসে বললেন, তিনিই মিজান। তিনি ছাত্রলীগের রাজনীতির সাথেও যুক্ত ছিলেন। আমি বললাম, আমার কাল ভর্তি পরীক্ষা, আমাকে বীথি আপা আপনার কথা বলেছেন!

আর কোন কথা বলতে হয় নি। সোজা কথায় শুরু হলো জামাই আদর! কক্ষেই রাতের খাবার চলে আসলো। মশারিটা টানিয়ে দিয়ে তিনি উধাও হয়ে গেলেন। একটা বেডে একাই ঘুমালাম। সকালে ঘুম থেকে জেগেই দেখি মাথার পাশে ভুনা খিচুড়ির নাস্তা। তারপর পরীক্ষা দিয়ে বাড়ি চলে গেলাম। আমার গ্রামের বড় ভাই, তিনি আমাকে আশ্রয় দিলেন না! কিন্তু ঢাবি’র একজন ছাত্র, যিনি আমাকে চেনেন না, জানেন না, তিনি আমাকে শুধু আশ্রয়ই দিলেন না, নিজে অন্য কক্ষে উদ্বাস্তু হয়ে আমাকে নিজের বেড ছেড়ে দিলেন, আপ্যায়ন করলেন! কৃতজ্ঞতায় মন ভরে গেলো। তিনি একজন ছাত্রনেতা, এটাও মাথায় ঘুরতে লাগলো। রাতে যখন বিদ্যুৎ চলে গেলো তখন ছাত্রদের হই-হুল্লোড়, গান বাজনাও আমাকে মুগ্ধ করে দেয়। একজন মান্না দে’র ‘পৌষের কাছাকাছি’ গেয়েছিলেন, যা আজো কানে বাজে আমার।

তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হলাম। ভর্তি হওয়ার এক-দেড় বছর পর হলে উঠলাম। প্রতি বছরই ভর্তি পরীক্ষা আসে। এমনিতেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে ব্যাপক আবাসন সংকট, ছাত্ররা যাপন করে মানবেতর জীবন। ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীর সংখ্যাও অনেক বেশি থাকে। এতো সীমাবদ্ধতার মধ্যেও ভর্তিচ্ছু শিক্ষার্থীদের প্রতি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার অনেক দৃষ্টান্ত দেখেছি। ফ্লোরিং করে কিংবা মসজিদে শুয়ে কিংবা না ঘুমিয়েও রাত কাটায় অনেক ছাত্র, ভর্তিচ্ছুদের একটু আশ্রয় দেওয়ার জন্য। আমি নিজেও বেশ কয়েকবার নানাভাবে ম্যানেজ করেছি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের এ বিষয়গুলো আমাকে খুবই আপ্লুত করে।

এবার ক্যাম্পাসে ভর্তিচ্ছু ছাত্রদের নিয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের নানা রকম উদ্যোগ চোখে পড়ছে। আসন খুঁজে দেওয়া, বাইকে করে পৌঁছে দেওয়া, পানীয়ের ব্যবস্থা করাসহ নানা ধরনের কর্মকা- আমাকে গর্বিত করছে। একটা ছবিতে দেখলাম, ছাত্রলীগের সভাপতি সঞ্জিত দাস পানির বোতলের কেস নিজের কাঁধে বহন করছে, আরেকটা ছবিতে দেখলাম, ভর্তিচ্ছুদের জায়গা করে দিতে খোলা মাঠে মশারী টানিয়ে রাত কাটিয়েছে মহসিন হলের এক ছাত্রনেতা! যেহেতু ছাত্রসংসদ নেই, সেহেতু এসব করে কোন ফায়দা হাসিল করতে পারবে না ওরা। ওরা যেটা করছে সেটা ভালোবাসা থেকেই। আগে হতো বিচ্ছিন্নভাবে, এবার হচ্ছে দলগতভাবে, এই যা! ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আমার গর্ব, আমার অহংকারের নাম। আমি আরো গর্ব করি, আমি ছাত্র রাজনীতির একজন কর্মী ছিলাম।

লেখক : ব্যাংকার, কথা সাহিত্যিক ও প্রাক্তন ছাত্রনেতা

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত