প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

adv 468x65

বিচারপতি সিনহার বই ‘অ্যা ব্রোকেন ড্রিম : রুল অব ল, হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি’
অর্থনীতি থেকে আইনের ছাত্র এবং একাত্তরের স্মৃতিপট উদ্ভাসিত

মোহাম্মদ আলী বোখারী, টরন্টো থেকে

 

বাংলাদেশের সাবেক প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহার সদ্য প্রকাশিত ‘অ্যা ব্রোকেন ড্রিম : রুল অব ল, হিউম্যান রাইটস অ্যান্ড ডেমোক্রেসি’, অর্থাৎ ‘স্বপ্নভঙ্গ: আইনের শাসন, মানবাধিকার ও গণতন্ত্র’ বইটির প্রথম অধ্যায় ‘আর্লি লাইফ’ বা প্রথম জীবনে যা বর্ণিত, তারই চুম্বকাংশ এখানে তুলে ধরা হলোÑ

আমার জন্ম বর্তমান বাংলাদেশের উত্তর-পূর্বের মৌলভীবাজার জেলার তিলকপুর গ্রামে। প্রয়াত বাবা ললিত মোহন সিনহা ও মাতা ধনবতী সিনহার শিক্ষা জীবন ভারতের আসামে, কাছাড় জেলায়। রাঘানা স্কুলে বাবা শিক্ষকতাকালীন বিয়ে করেন। আমার প্রয়াত মাসী কোকিলা সিনহার স্বামী ছিলেন সাব-রেজিস্ট্রার। বাবার একমাত্র কনিষ্ঠ ভ্রাতা ছিলেন দীর্ঘকায় প্রয়াত ভূবনেশ্বর সিনহা। বৈশ্বিক জীবনের প্রতি বিমুখ পিতামহ ধনসো সিনহা সংস্কৃত স্কুল থেকে উপনিষদ ও বেদ পাঠের শিক্ষা লাভ শেষে ধর্মীয় দর্শনতত্ত্ব লিখেন। বৃন্দাবন বলে একটি মন্দির প্রতিষ্ঠা করে তিনি গীতা ও মহাভারতের শিক্ষা দিতেন, সেখানে প্রতিমাসে রাখালদের নৃত্য হত, ফল-ফলাদির প্রসাদও থাকতো। আমার মা আমার কাকাকে পড়িয়ে স্কুল শিক্ষকে উপনীত করেন। বাবা বাংলা সাহিত্য ও পাটিগণিত শিক্ষকতায় সুনাম অর্জন করেন। আমাদের খামারের জমি চাষাবাদের দুটি বলদসহ অসংখ্য গাভী ছিল। মা বিশাল সংসারের রান্না জোগাতেন। বাবা পিতামহের মতো শান্ত ও ধর্মীয় গুণাবলি সম্পন্ন ছিলেন। মা তার পাঁচ ছেলে ও এক কন্যার প্রতি শাসন প্রকৃতির ছিলেন। ষষ্ট শ্রেণিতে এক ভাই কলেরায় মারা যায়। সন্তানদের মাঝে আমি ছিলাম দ্বিতীয়। বড় ভাই মেরিন ইঞ্জিনিয়ার; তৃতীয়জন ব্যাংকার ও চতুর্থজন ডেন্টিস্টÑ এরা দুজন যুক্তরাষ্ট্রের নাগরিক। একমাত্র বোন সত্যভামা সিলেটের মহিলা কলেজে পড়েছেন। এক কথায় অভিভাবকের আগ্রহে সবাই শিক্ষিত। প্রত্যুষে বাবার দিন শুরু হতো বাড়িতে ছাত্রদের পড়িয়ে, জ্ঞানের ক্ষুধা মিটিয়ে। তবু মায়ের কারণেই আমরা যথোপযুক্ত হয়েছি। আমি বিকেলে খেলতাম এবং প্রচুর খেতাম ও শখের বশে বন্যার পানিতে নদীতে সাঁতার কাটতাম। বড় হলে পড়াশোনার পাশাপাশি বড় ভাই নরেন্দ্র কুমার সিনহার সঙ্গে খামারের কাজে চাষীদের সাহায্য করতাম। এক সময় আমাদের ইক্ষুচাষের ২৫ বিঘা জমি ধলাই নদীতে তলিয়ে যায়।

১৯৭০ সালে মদন মোহন কলেজের বাণিজ্য বিভাগ থেকে গ্রাজুয়েশন শেষ করে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হই। সেসময় রাজনৈতিক পরিস্থিতি উত্তপ্ত ছিল। এ কারণে বাবা চেয়েছিলেন চট্টগ্রামে না থেকে তার সঙ্গে মুন্সিগঞ্জের কালীপ্রসাদ হাই স্কুলে শিক্ষকতায় যোগ দিই। তিন মাস পর বাবার অনুমতি ছাড়াই সিলেটের আইন কলেজে ভর্তি হই। ১৯৭১ সালের মার্চের দ্বিতীয় সপ্তাহে ভূবনেশ্বর কাকাকে তার কিডনির চিকিৎসায় সিলেট মেডিক্যাল কলেজে নিয়েছিলাম। মাছিমপুরে যেখানে থাকতাম সেখান থেকে তার জন্য খাবার নিয়ে যেতে হতো। কারণ, তিনি হাসপাতালের খাবার খেতে পারতেন না। ২৫ মার্চের পাঁচ-ছয় দিন আগে সার্জারির খ্যাতনামা শিক্ষক প্রফেসর শামসুদ্দিন আহমেদ কাকার কিডনিস্টোন সরান। ২৫ মার্চের সন্ধ্যায় যথারীতি যখন সাইকেলে করে খাবার নিয়ে এসেছি, দেখি কাকার গায়ে ভীষণ জ্বর। দেশের পরিস্থিতি বিবেচনায় তার নিষেধ সত্ত্বেও রাতে তার সঙ্গে থেকে যাই। সকালে আম্বরখানা এলাকার মিছিল থেকে ‘জয় বাংলা, জয় বাংলা’ শ্লোগান শুনি। রোগীসহ অন্যরা বেরিয়ে বলতে লাগলো, দেশ স্বাধীন হয়েছে। আধ-ঘণ্টার মধ্যেই এলোপাতাড়ি গুলির শব্দ পেলাম। এক ঘণ্টা পর রিক্সা ও ভ্যানে করে ৭০/৮০ জন আহতকে হাসপাতালে আনা হলো, জরুরি বিভাগ রক্তাক্ত। আহতদের জন্য অ্যাম্বুলেন্স পাঠিয়ে প্রফেসর শামসুদ্দিনকে নিয়ে আসা হলো। পরিস্থিতির অবনতি দেখে কাকা বললেন, মা নিশ্চয়ই দুশ্চিন্তায় আছে, ফিরে যাও। কিছুটা বিব্রত হয়েই দরিয়াপাড়া হয়ে মাছিমপুরের দিকে এগুচ্ছিলাম। জিন্দাবাজার যেতেই কৌতূহলী মানুষের ভিড় থেকে কেউ আমাকে কারফিউ-এর কথা বলে যেতে নিষেধ করলো, কেউ বললো কারফিউ নেই। এর মাঝে লামাবাজার থেকে জিন্দাবাজারমুখী পুলিশের জিপ এসে স্পিকারে কারফিউ’র ঘোষণা দিলো। কিছুক্ষণ পর আর্মির জিপ থেকে মেশিনগানের এলোপাতাড়ি গুলি। আমি সাইকেলে লাফিয়ে উঠে হাসপাতালের দিকে ছুটলাম। লক্ষ করলাম, যারা আমার সঙ্গে দাঁড়িয়ে ছিল, তারা গুলিতে আহত হয়েছে। হাসপাতালে কাকার কেবিনে ফিরে ফ্লোরে আছড়ে পড়ি। ততক্ষণে তিনি বিছানায় উঠে বসেছেন এবং আমার আঘাত খুঁজতে লাগলেন। কারণ, কাপড় রক্তমাখা ছিল। তিনি আমাকে এক গ্লাস জল দিলেন। আমি শান্ত হয়ে ঘটনা বর্ণনা করলাম। বিশ্রামহীন সেদিন প্রফেসর শামসুদ্দিন আহতদের অস্ত্রোপচার করলেন। আমাদের সঙ্গে যৎসামান্য টাকা ছিল, হাসপাতালেও খাবারের সংকট দেখা দিলো। এতে হাসপাতালের সুপারের কাছে গিয়ে রুটি ও কিছু খাবার চেয়েছিলাম। উত্তরে জানালেন, রেশন সংকটে রোগীদের নিয়মিত খাবার দেয়া যাচ্ছে না। পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতির উত্তরণ না হওয়া পর্যন্ত রোগিদের খিচুড়ি খাওয়ানোর সিদ্ধান্ত নেন।

ই-মেইল :  সম্পাদনা: মোহাম্মদ আবদুল অদুদ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত