প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বাংলাদেশে বছরে চার হাজার কোটি টাকার গোমূত্র যাচ্ছে গোবরে, অথচ ভারতে?

মতিনুজ্জামান মিটু : ভারতের রাজস্থানে গরুর দুধের চেয়ে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে গোমুত্র । এদিকে আলাদা কোনো ভাবনা না থাকায় বাংলাদেশে বছরে অন্তত চার হাজার কোটি টাকার গোমূত্র গোবরের সঙ্গে মিশিয়ে দেয়া হচ্ছে। অথচ গোমুত্র বা গোচোনা হতে পারে দেশের মূল্যবান সম্পদ। তাই গোমূত্র নিয়ে ভাবনার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে এখানেও।

বাংলাদেশ প্রাণিসম্পদ গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক কৃষিবিদ ড. নাথু রাম সরকার বলেন, ভারতসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে থাকলেও বাংলাদেশে আলাদাভাবে গোমুত্র নিয়ে কোনো গবেষণা বা ভাবনা নেই। তবে এখানে গোবর নিয়ে গবেষণা আছে। যারা বায়োগ্যাস করে থাকে তাদেরকে গোবরের সঙ্গে গোমুত্র মিশিয়ে দিতে বলি।

বাংলাদেশে বলদ, গাভি এবং বাছুর মিলিয়ে মোট আড়াই কোটি গরু রয়েছে। এরা প্রত্যেকে দিনে সাড়ে চার থেকে পাঁচ লিটার করে মূত্র বা চোনা ত্যাগ করে থাকে। গরুর সাইজ এবং তাদের পানি পানের ওপর মূত্র বা চোনা কম বেশি হয়। ভারতসহ বিশ্বের অন্যান্যদের মতো বাংলাদেশেও গোমূত্র নিয়ে ভাবনার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। জৈবসার এবং ঔষধি হিসেবে গোমূত্র ব্যবহার হতে পারে।

এক হিসাবে দেখা যায়, বাংলাদেশের দুই কোটি পঞ্চাশ লাখ গরুর প্রত্যেকে গড়ে প্রতিদিন সাড়ে চার লিটার হারে বছরে এগার কোটি পঞ্চাশ লাখ লিটার মূত্র ত্যাগ করে। ভারতীয় বাজারের দর অনুযায়ি লিটার প্রতি ২০ টাকা হারে বর্তমানে যার দাম কমপক্ষে ৩৯৬০ কোটি টাকা।

বিভিন্ন সুত্রে জানা গেছে, ভারতের রাজস্থান রাজ্যের গরুচাষীরা গরুর দুধের চেয়ে গরুর মূত্র বা চোনা বিক্রি বেশি লাভজনক মনে করেন। সেখানকার কৃষকরা লিটার প্রতি গরুর দুধ ২০ থেকে ২২ টাকা বিক্রি করলেও গোমূত্র বিক্রি করেন ১৫ থেকে ৫০ টাকায়। দুধের চেয়ে কষ্টসাধ্য হলেও সেখানকার কৃষকরা সারা রাত জেগে গোমুত্র সংগ্রহ করে বিক্রি করেন। সেখানে স্থানীয় বা দেশী জাতের গরুর মুতের চাহিদা বেশি। সেখানকার কৃষি বিজ্ঞানীদের মতে, জৈব সার তৈরীর জন্য দরকারী গোমুত্রে রয়েছে উপকারী অনেক রাসায়নিক। যা ঔষধি এবং প্রসাধনী তৈরীতেও ব্যবহৃত হচ্ছে। গোমুত্র থেকে সেখানকার অনেক গোপালক বাড়তি রোজগার করতে শুরু করেছেন। এজন্য বেশ কিছু স্বনির্ভর গোষ্ঠিও তৈরী হয়েছে। সেখানকার এক বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় জানা গেছে, জৈব চাষের ক্ষেতে প্রতিমাসে বেশ কয়েকশ গোমুত্র দেয়ার প্রয়োজন হয়।

গরুর গোবর জ্বালানী হিসেবে এবং গোমূত্র জৈব সার ও ঔষধ তৈরিতে ব্যবহার করা হয়। সেখানকার আঞ্চলিক গবেষণা পরিচালক শান্তি কুমার শর্মা সংবাদ মাধ্যমে জানান, গোমূত্রের মধ্যে শতকরা ৯৫ ভাগ জল থাকলেও বাকী অংশের মধ্যে আড়াই শতাংশ ইউরিয়া আর অন্য আড়াই শতাংসের মধ্যে হরমোন, এনজাইম, অ্যাস্ট্রোজেন, ল্যাক্টোজসহ প্রায় ১৪-১৫ রকমের রাসায়নিক থাকে। গোমূত্রের মধ্যে গোবর আর গুড় মিশিয়ে গাঁজানো তৈরী করে তা কৃষিকাজে ব্যবহার করা যায়।

প্রাচীন আমলে ছিলো না কোনো রাসায়নিক সার ও কীটনাশক। তখন গরুর গোবর এবং গোমুত্রই ছিলো প্রাকৃতিক সার ও কীটনাশক। তখন গো চোনার সঙ্গে নিমের রস মিশিয়ে কীটনাশক বানিয়ে কৃষিতে প্রচুর পরিমাণে ব্যবহার করা হত।

গুজরাটের জুনাগড় কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় এর জৈবপ্রযুক্তির বিজ্ঞানীরা দাবি মতে, গোমূত্র কাজে লাগিয়ে মুখের, ফুসফুসের, বৃক্কের, চামড়া ও বুকের ক্যান্সার নিরাময় করা সম্ভব। ভারতের একটি আয়ুর্বেদিক কেন্দ্রের প্রধান শতিশ নাম্বুদিরির মতে এটি পাকস্থলীর ঘা বা ক্যান্সার, যকৃৎ প্রদাহ ও শ্বাসকষ্টজনিত রোগ উপশমেও সক্ষম। আয়ুর্বেদে গোমূত্রকে কুষ্ঠ, পেটের ব্যাকটেরিয়া ঘটিত বা কৃমি জনিত ব্যথা ও কর্কট রোগ নিরাময়ের উপকরণ হিসাবে ব্যক্ত করা হয়েছে। গোমূত্র, ত্রিফলা ও গরুর দুধ দ্বারা নির্মিত এক ধরনের মিশ্রণ রক্তাল্পতা রোগের ওষুধ হিসেবে অতীতে ব্যবহৃত হত।

তাছাড়া গোলমরিচ, দই, ঘি ও গো চোনা মিশিয়ে এক ধরণের মিশ্রণ তৈরী করা হত। যা তারা জ্বর ও ছোটোখাটো রোগ নিরাময়ে ব্যবহার করতো। নিম, বাসক ও কুরিলো গাছের ছাল এবং কানের গাছের পাতার সঙ্গে গো চোনা মিশিয়ে প্রলেপ দিয়ে কাটাছেঁড়া এবং ক্ষতস্থানকে অণুজীবের সংক্রমণ থেকে বাঁচানো হতো।

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত