প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বিদেশে নারী শ্রমিকদের নির্যাতন ঠেকাতে উদ্যোগ নেই!

নিউজ ডেস্ক : বিদেশে নারী শ্রমিকমধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশ থেকে প্রায় প্রতি সপ্তাহেই নির্যাতনের শিকার হয়ে অনেক নারী শ্রমিক দেশে ফিরে আসছেন। বিশেষ করে যৌন নির্যাতনের শিকার হওয়া নারীদের অবর্ণনীয় কষ্টের কথা গণমাধ্যমে ফলাও করে প্রচার হচ্ছে। তবে এ নিয়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের যেন কোনও রা নেই। বিদেশে নারী কর্মীদের ওপর নির্যাতন ঠেকাতে কার্যকর কোনও উদ্যোগ এখনও দৃশ্যমান হয়নি। যেসব রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে গিয়ে নারীরা নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন, সেসব রিক্রুটিং এজেন্সির বিরুদ্ধে কোনও ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও এখন পর্যন্ত জানা যায়নি। এমনকি নির্যাতনের শিকার হয়ে এ পর্যন্ত কতজন নারী দেশে ফিরে এসেছেন তার কোনও হিসাবও নেই কারো কাছে।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সরকারের উদাসীন আচরণ রীতিমতো বিস্ময়ের উদ্রেক করেছে। নির্যাতন বন্ধে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন।

তবে প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী নূরুল ইসলাম বিএসসির দাবি, ‘আমরা অনেক উদ্যোগ নিয়েছি। নির্যাতন ঠেকাতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। বিষয়গুলো প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।’

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্যমতে, ১৯৯১ সাল থেকে গত আগস্ট পর্যন্ত মোট ৭ লাখ ৩৫ হাজার ৫৭৫ জন নারী শ্রমিক মধ্যপ্রাচ্যসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে গেছেন। আগে বিদেশে নারী শ্রমিক যাওয়ার সংখ্যা কম থাকলেও ২০১৫ সাল থেকে বাড়তে থাকে। নারী শ্রমিকরা মূলত সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে গৃহকর্মীর কাজ করতে যান।

তথ্য বলছে, ২০১৫ সালে মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে ১ লাখ ৩ হাজার ৭১৮ জন নারী শ্রমিক যান। ২০১৬ সালে এই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ১৮ হাজার ৮৮ জনে। ২০১৭ সালে যান ১ লাখ ২১ হাজার ৯২৫ জন। আর এ বছরের আগস্ট পর্যন্ত ৬৭ হাজার ৫২ জন নারী শ্রমিক মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে গেছেন।

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০১৫ সাল থেকে গত আগস্ট পর্যন্ত সৌদি আরবে ২ লাখ ২২ হাজার ২৩২ জন, জর্ডানে ৬৯ হাজার ৫৫৪ জন, আবুধাবিতে ৩৪ হাজার ১৮৬ জন, ওমানে ৪৫ হাজার ৮৪২ জন, কাতারে ১৯ হাজার ৪৯২ জন, লেবাননে ১৩ হাজার ৮৭৭ জন, কুয়েতে ৬৪০ জন এবং বাহরাইনে ৫০৮ জন নারী শ্রমিক গেছেন।

বিদেশে নারী শ্রমিকতবে গত কয়েক বছর ধরে মধ্যপ্রাচ্যের এসব দেশ থেকে নির্যাতনের শিকার হয়ে অনেক নারী শ্রমিক দেশে ফিরে আসছেন। এমনও হয়েছে, নির্যাতনের শিকার হয়ে সাত দিনের মধ্যে দেশে ফিরে আসতে বাধ্য হয়েছেন কোনও কোনও নারী। বিভিন্ন সময়ে ফেরত আসা নারী শ্রমিকরা বলছেন, তারা মূলত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে যাওয়ার পর যৌন নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বেশি। এছাড়া শারীরিক, মানসিক নির্যাতনসহ ঠিকমতো খাবার না দেওয়া, চুক্তি অনুযায়ী বেতন না দেওয়া এবং চুক্তির বাইরে বেশি সময় কাজ করানো হয় তাদের দিয়ে। বেতন চাইলে চালানো হয় নির্যাতন। এমনকি অনেকের ভিসা নবায়ন না করে চুক্তি শেষে নির্যাতন শুরু করা হয়। এতে নারী শ্রমিকরা কর্মস্থল থেকে পালিয়ে গেলে ভিসা নবায়নের দায় এড়িয়ে যান নিয়োগকর্তা।

প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশকি কর্মসংস্থাণ মন্ত্রণালয়, মন্ত্রণালয়ের অধীনে থাকা জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরো, ওয়েজ ওনার্স কল্যাণ বোর্ড এবং রিক্রুটিং এজেন্সিগুলোর সংগঠন বায়রা কার্যালয়ে খোঁজ নিয়ে নির্যাতনের শিকার হয়ে ফেরত আসা নারী শ্রমিকদের কোনও হিসাব পাওয়া যায়নি। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর মহাপরিচালক সেলিম রেজার সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হলেও তার কোনও মন্তব্য পাওয়া যায়নি। তবে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক মোহাম্মদ আতাউর রহমান বলেন, ‘আমরা অনেক উদ্যোগ নিয়েছি। আমাদের মন্ত্রী ও ডিজি মহোদয় সৌদি আরবে গিয়েছিলেন। তারা রাষ্ট্রদূতকে সঙ্গে নিয়ে সৌদি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে নির্যাতন বন্ধে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। আশা করি নারী শ্রমিকদের ওপর নির্যাতন বন্ধ হবে।’

এদিকে ব্র্যাকসহ কয়েকটি এনজিও থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত কয়েক বছরে নির্যাতনের শিকার হয়ে অন্তত সাত হাজার নারী শ্রমিক দেশে ফিরে এসেছেন। নির্যাতনের শিকার নারীদের অনেকেই ট্রমাটাইজড বা মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলেছেন।

জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর একজন দায়িত্বশীল কর্মকর্তা জানিয়েছেন, মধ্যপ্রাচ্যের অনেক দেশে জনশক্তি রফতানি বন্ধ ছিল। সৌদি আরবেও জনশক্তি রফতানি বন্ধ ছিল। তারা শর্তসাপেক্ষে নতুন করে শ্রমবাজার খুলেছে। একজন নারী শ্রমিকের অনুপাতে দুজন পুরুষ শ্রমিক নেওয়ার শর্ত দিয়েছে। এই শর্ত মানতে গিয়ে অনেকটা বাধ্য হয়েই নারী শ্রমিক পাঠাতে হচ্ছে। তা না হলে পুরুষ শ্রমিক যাওয়া বন্ধ হয়ে যাবে।

ব্র্যাকের মাইগ্রেশন বিভাগের প্রধান শরিফুল হাসান বলেন, ‘প্রথমত গৃহকর্মী হিসেবে আমাদের মেয়েদের পাঠাবো নাকি আমরা একটু প্রশিক্ষণ দিয়ে তাদের ‘কেয়ার গিভার’ কিংবা অন্য কোনও বিষয়ে দক্ষ করে পাঠাবো, সেটা ভাবা দরকার। আমরা যদি আমাদের নারীদের ট্রেইনড করতে পারি তাহলে তাদের দেশেই কর্মসংস্থান তৈরি করা সম্ভব। তারপরও যদি আমরা তাদের বিদেশে পাঠাতে চাই, আমি মনে করি, প্রতিটা ঘটনা বিবেচনা করতে হবে। আমি যেখানে পাঠাচ্ছি সেখানে কতটা ঝুঁকি রয়েছে, তা বিবেচনায় আনতে হবে। অর্থাৎ সৌদিদের বলা যে কোনও নির্যাতনের ঘটনা যদি ঘটে তাহলে সঙ্গে সঙ্গে যেন সেই নিয়োগকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়। কারণ, সৌদি যদি মনে করে যে বাংলাদেশি মেয়েদের সঙ্গে যা ইচ্ছা তা-ই করা যায়, তার গায়ে আগুন দেওয়া যায় বা টর্চার করা যায়, রেপ করা যায়, তাহলে কিন্তু নির্যাতন বন্ধ হবে না। এ জন্য দূতাবাস বা রাষ্ট্র সবাইকে সোচ্চার হতে হবে।’

সরকারের উদ্যোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘অস্বীকার করার একটা প্রবণতা তৈরি হয়েছে। বলা হচ্ছে, আমাদের তো আড়াই লাখ মেয়ে বিদেশে গিয়েছে, কিন্তু মাত্র সাত হাজার ফিরেছে। কিন্তু আমি মনে করি সংখ্যা বিবেচনা না করে মানবাধিকারের বিষয়টি বিবেচনা করা উচিত। একটা ঘটনাও যদি ঘটে তাহলে তা আমলে নিয়ে দায়ী ব্যক্তিকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির আওতায় আনতে হবে। আমরা যদি আমাদের মেয়েদের নিরাপত্তার কথা না ভাবি তাহলে অন্য কেউ ভাববে না।’ শরিফুল হাসান বলেন, ‘আমরা শুনছি অনেক কিছু, কিন্তু তার ফলাফল পাচ্ছি না। কোনও নিয়োগকর্তা শাস্তির আওতায় এসেছে বা আমাদের মেয়েরা গিয়ে শতভাগ নিরাপদে রয়েছে, এমন নজির কিন্তু নেই। বরং আমরা দেখতে পাচ্ছি আমাদের মেয়েদের ফেরার পরিমাণ বাড়ছে।’

প্রবাসী শ্রমিকদের কর্মপরিবেশ নিয়ে গবেষণা সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, যৌন নির্যাতনের শিকার হয়ে দেশে ফেরার পর অনেকেই নিজের পরিবারে ফিরতে পারছেন না। এ কারণে তারা দেশে ফিরেও তাদের নতুন করে অনিশ্চিত জীবনের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। নির্যাতনের শিকার হয়ে অনেকেই বিদেশে আত্মহত্যা করেছে বলেও জানা গেছে।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আগে বিদেশে নারী শ্রমিকদের পাঠানোর জন্য মাত্র ২৫টি রিক্রুটিং এজেন্সি কাজ করতো। এ সংখ্যা এখন ৫৫০ ছাড়িয়েছে। কিন্তু নারী শ্রমিকদের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার কোনও উদ্যোগ নেই। সাধারণত মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো থেকে নারী শ্রমিকের চাহিদাপত্র আসার পর নিয়োগকর্তার খরচেই নারী শ্রমিকদের পাঠানো হয়ে থাকে। এজন্য নারী শ্রমিকদের বিদেশমুখী হওয়ার প্রবণতা বাড়ছে। সেই সঙ্গে বাড়ছে নির্যাতনের শিকার হওয়ার সংখ্যাও।

বাংলাদেশ অভিবাসী মহিলা শ্রমিক অ্যাসোসিয়েশনের পরিচালক সুমাইয়া ইসলাম বলেন, ‘সরকার যে উদ্যোগ নিয়েছে তা খুবই সীমিত। সরকারের পক্ষ থেকে পলিসিগতভাবে নারী শ্রমিকদের বেতন যেন ব্যাংকে দেওয়া হয় আর এক বাসার কথা বলে যেন একাধিক বাসায় কাজ না করায় সেজন্য কিছু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু মূল যে বিষয়, নির্যাতন, সেটি বন্ধে তেমন কোনও উদ্যোগ নেই।’

তিনি বলেন, ‘মধ্যপ্রাচ্যের বাসিন্দারা বাংলাদেশ থেকে যাওয়া নারী শ্রমিকদের যৌনদাসী হিসেবে আচরণ করে, যা কোনওভাবেই কাম্য নয়। আধুনিক ও সভ্য সময়ে শ্রমিককে তার শ্রমের মর্যাদা এবং মানুষ হিসেবে তাদের মর্যাদ দিতে হবে। এজন্য ব্যপক উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন।’

সুমাইয়া ইসলাম বলেন, ‘নির্যাতন বন্ধ করতে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে বাংলাদেশ দূতাবাসের পক্ষ থেকে সাপোর্ট সার্ভিস আরও বেশি এনসিওর করতে হবে। কিন্তু এসব কিছুই হচ্ছে না। নির্যাতনের শিকার হয়ে ফেরত আসা নারী শ্রমিকদের ডাটাবেজ নেই। বিষয়টি আসলে চরম অমানবিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এভাবে চলতে থাকলে বিদেশে নারী শ্রমিক যাওয়ার হার যেমন কমে যাবে, তেমনি বিদেশ থেকে রেমিট্যান্স আসাও কিন্তু কমবে।’ দ্রুত এ বিষয়ে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দেন তিনি। বাংলাট্রিবিউন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত