প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

adv 468x65

সিপিবির আনুগত্য আওয়ামী লীগে আদরণীয় হলেও বিরোধ অসহনীয়

আদম মালেক : বাম গণতান্ত্রিক জোটের আওয়ামী লীগ সরকার বিরোধী আন্দোলন জনগণের কাছে গুরুত্বপূর্ণ নয়।এই জোটের প্রধান শরীক বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি সব সময় আওয়ামী লীগের লেজুড়বৃত্তি করে আসছে। আওয়ামী লীগকে খুশি করা, ক্ষমতায় রাখার জন্য এ দল এক সময় নিজকে বিলুপ্ত করে আওয়ামী লীগের সঙ্গে একাকার করে দিলেও সরকার তাদের সামান্য বিরোধিতা সহ্য করতে পারছে না বলে রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা জানিয়েছেন।

জানা গেছে, বৃহস্পতিবার বাম গণতান্ত্রিক জোটের পূর্ব ঘোষিত নির্বাচন কমিশন (ইসি) ঘেরাও মিছিলে পুলিশ হামলা ও লাঠিচার্জ করে।হামলায় জোটের অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়।

সিপিবি নেতা রুহিন হোসেন দাবি করেন, গণসংহতি আন্দোলনের নেতা জোনায়েদ সাকি, বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি সাইফুল হক ও ইউনাইটেড কমিউনিস্ট লীগের সাধারণ সম্পাদক মোশাররফ হোসেনসহ অধর্শত নেতাকমীর্ আহত হয়েছেন। তাদের মধ্যে ছাত্র ইউনিয়নের সভাপতি জিলানী শুভসহ প্রায় ১৫ জন ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন। সিপিবি সাধারণ সম্পাদক মো. শাহ আলমও এই হামলায় আহত হন।

এর আগে ২০১৩ সালের সেপ্টেম্বরে ছাত্রলীগ জয় বাংলা স্লোগান দিয়ে সিলেটে বাসদ-সিপিবর জনসভায় হামলা চালায়। হামলার শিকার হন কমিউনিস্ট পার্টির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম। আক্রান্ত হয় ২৫ নেতাকর্মী। এ ঘটনায় সিলেট জেলা ছাত্রলীগের কমিটি বাতিল করা হয়। হামলার ঘটনায় দু:খ প্রকাশ করে সে দিন ছাত্রলীগের দপ্তর সম্পাদক শেখ রাসেল বলেন, ঘটনাটি হয়ত ভুল বোঝাবুঝির জন্য হতে পারে। সিপিবির সঙ্গে আমাদের কোনো ঝামেলা নেই। তাদের ওপর হামলা করার কোনো কারণ থাকতে পারে না। এর আগের ১৯৯৬ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় এলে জাতীয় প্রেসক্লাবের সামনে সরকার বিরোধী এক কর্মসূচিতে মুজাহিদুল ইসলামকে প্রহার করা হয়।

শাহবাগ আন্দোলনে, ছাত্র ইউনিয়ন নেত্রী লাকি আক্তার ছাত্রলীগের হামলার শিকার হলেও কমিউনিস্ট পার্টি তার বিরোধীতা করেনি। শাহবাগ আন্দোলন সামগ্রিকভাবে যুদ্ধাপরাধী বিচার প্রশ্ন সামনে আসেনি। শুধু আওয়ামী পরিকল্পিত বিচারাধীন কিছু সংখ্যক ব্যক্তির ফাঁসির দাবীতে মাতম তোলে। তারা পাকিস্তানী ১৯৫ জন চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীসহ দেশের হাজার হাজার যুদ্ধাপরাধীর তালিকা প্রকাশ ও বিচার দাবী করেনি। তারা পাকিস্তানী মূল যুদ্ধাপরাধী ১৯৫ জনকে ক্ষমা করে দেবার জাতীয় জন্য আওয়ামী লীগের ১৯৭২-৭৫ সরকারের বিরুদ্ধে ক্ষোভ প্রকাশ করেনি।

এ প্রসঙ্গে জাতীয় মুক্তি কাউন্সিলের সাধারণ সম্পাদক ফয়জুল হাকিম লালা বলেন, এ মুহুর্তে দ্বি-দলীয় বৃত্ত ভাঙ্গার স্লোগানে আওয়ামী লীগের ফ্যাসিবাদী শাসনকে আড়াল হয়ে যায়। জোট গঠনের পর সিপিবি নেতৃত্বের সরকারের প্রতি উচ্ছাস সরকার বিরোধীতার নিশ্চয়তা দেয় না। সিপিবি নেতৃত্ব সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে। সরকারের লুটপাট দু:শাসনে জনজীবন অতিষ্ঠ। নিজেদের ওপর আস্থা ভরসা কম। সামান্য আন্দোলন সংগ্রামও সহ্য করতে পারছে না। এজন্য বাম জোটের মিছিলে সরকার হামলা চালায়।

রাজনীতি বিশ্লেষকদের দাবি, কমিউনিস্ট পার্টি দেশের অন্যান্য দলের ন্যায় ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারীর নির্বাচন বর্জন করে। দলটি জানে নির্বাচনে অংশ নিলেও তারা একক শক্তিমত্তায় কোনো আসন পাবে না। কিন্তু নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনে বাধ্য করার জন্য আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে কোনো কার্যকর আন্দোলন সংগ্রামেও তারা সামিল হয়নি। এখন এ দল প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পদত্যাগসহ সংসদ ভেঙ্গে দিয়ে নির্দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের দাবিতে বাম গণতান্ত্রিক জোট গঠন করলেও তা আইওয়াশ ছাড়া আর কিছু নয়। প্রকারান্তরে তারা আওয়ামী লীগের ক্ষমতাই দীর্ঘায়িত করতে চায়। ৯০ সালে জামায়াতে ইসলামী বাংলাদেশ, আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে ৮ দল, বিএনপির ৭ দলীয় জোট ও ৫ দলীয় বাম জোটের সৃষ্ট আন্দোলনে এরশাদের পতন হয়। সেদিন কমিউনিস্ট পার্টি আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ৮ দলীয় জোটের সদস্যভুক্ত হয়ে এরশাদ পতন আন্দোলন তরান্বিত করে। এখন কমিউনিস্ট পার্টি দ্বি-দলীয় বৃত্ত ভাঙ্গার নামে আওয়ামী লীগের সঙ্গে অতীতের মতোই ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রাখছে। বিএনপির সঙ্গে জামায়াত যুদ্ধাপরাধী ও মৌলবাদের গাঁটছড়া বাঁধার অজুহাতে আওয়ামী বৃত্তে বন্দী হয়ে পড়েছে। তাছাড়া এই দলের কন্ঠে প্রতিধ্বনিত হয় আওয়ামী লীগের মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের বাণী। তাদের কাছে সব সময় গুরুত্বপূর্ণ নয় কার্ল মার্কস বা কমরেড লেনিন। গুরুত্বপূর্ণ বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। সম্প্রতি কমিউনিস্ট পার্টির উপদেষ্টা ও সাবেক সভাপতি মঞ্জুরুল আহসান খান বলেছেন, বঙ্গবন্ধু এই মুহূর্তেও বাংলাদেশে খুবই প্রাসঙ্গিক। কারণ বঙ্গবন্ধু ও তার আদর্শ আমাদের সামনে ধ্রæব তারার মতো কাজ করবে। তার আদর্শ অনুসরণ করেই আমরা পথ চলতে থাকব। তিনি আরও বলেন, শেখ হাসিনা ক্ষমতায় আসার পর বাংলাদেশ আবারও মূল সড়কে চলতে শুরু করে। এখনো সেই পথেই অগ্রসর হচ্ছে।

গেল ১৮ জুলাই ‘বাম গণতান্ত্রিক বিকল্প’ গড়ে তোলার লক্ষ্যে দেশের আটটি বাম দলের সমন্বয়ে নতুন ‘ বাম গণতান্ত্রিক জোট’ আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মপ্রকাশ করে। জোট গঠনের পর গত ২৪ জুলাই আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক এবং সড়ক পরিহন ও সেতুমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের সিপিবি নেতৃবৃন্দের সঙ্গের তাদের পল্টনস্থ অফিসে বৈঠক করেন। এ বৈঠককে ওবায়দুল কাদের সৌজন্য সাক্ষাৎ বলে দাবি করেন। দলটির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম কোনো কিছুই খোলাসা করেননি।

পর্যবেক্ষকদের মতে, বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর পর থেকে শুরু করে নব্বইয়ের এরশাদ-বিরোধী আন্দোলন পর্যন্ত আওয়ামী লীগের সঙ্গে সিপিবির সম্পর্কে মাঝে-মধ্যে টানাপড়েন দেখা দিলেও তা কখনো শত্রæতার পর্যায়ে যায়নি। সবসময়ই আওয়ামী লীগের সঙ্গে সিপিবির মিত্রতার সম্পর্কই বজায় ছিল। আওয়ামী লীগকে বাদ দিয়ে সিপিবি একক শক্তিতে দেশে প্রগতির চাকা এগিয়ে নিতে পারবে না বলে মনে করে। শেখ মুজিবুর রহমানের জীবদ্দশায়ও কমিউনিস্ট পার্টির আওয়ামী লীগের বি-টিম হিসেবে রাজনীতিতে অবস্থান করতো। সর্বহারা পাটি, বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল বা জাসদের মতো সরকারের হাত থেকে ক্ষমতা কেড়ে নেয়ার জন্য সশস্ত্র সংগ্রামের গৌরবোজ্জল ইতিহাস কমিউনিস্ট পার্টির নেই। বরং দেশ স্বাধীনের পর যখন সিরাজ সিকাদারের নেতৃত্বাধীন সর্বহারা পার্টি, মো.তোয়াহার সাম্যবাদী দল ও জাসদ শ্রেণী শক্রু খতমের জন্য বঙ্গবন্ধু সরকারের বিরুদ্ধে যখন অস্ত্র ধরে তখন কমিউনিস্ট পার্টি নিজের আত্মপরিচয় মুছে দিয়ে বাকশালের সঙ্গে একাকার হয়ে যায়।

সুশাসনে জন্য নাগরিক(সুজন) এর সাধারণ সম্পাদক ড. বদিউল আলম মজুমদার বলেন, সিপিবি সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগছে। তবে সরকার তাদের সামান্যতম বিরোধীতাও সহ্য করতে পারছে না।

ষাটের দশকের গোড়ার দিকে আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানের সঙ্গে কমিউনিস্ট নেতা মনি সিংহ ও খোকা রায়ের গোপন বৈঠক পাকিস্তানের সামরিক স্বৈরশাসক আইয়ুব খানের বিরুদ্ধে বৃহত্তর গণতান্ত্রিক আন্দোলন গড়ে তোলার ক্ষেত্রে বড় অবদান রেখেছিল। ৬-দফা, ১১-দফা, ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান এবং তার ধারাবাহিকতায় মহান মুক্তিযুদ্ধসহ সবকিছুতেই আওয়ামী লীগের সঙ্গে কমিউনিস্ট পার্টির ভূমিকা ছিল। স্বাধীনতার পরও বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি বা সিপিবি লাখো শহীদের রক্তে মুক্ত স্বদেশকে গড়ে তোলার জন্য বঙ্গবন্ধুর নেতৃত্বের প্রতি আস্থা রেখেই অগ্রসর হয়েছে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত