প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ছেলেকে প্রেসিডেন্ট করার রাজাপাকসার স্বপ্নে বিভেদই বাড়াচ্ছে

মাছুম বিল্লাহ : শ্রীলংকার সাবেক প্রেসিডেন্ট মহিন্দা রাজাপাকসা চেয়েছিলেন দেশের শীর্ষ পদ ও তার নতুন দল শ্রীলংকা পদুজনা পেরামুনার (এসএলপিপি) নেতৃত্ব উভয়ইটি তার পরিবার, বিশেষ করে তার ছেলে নমল রাজাপাকসার নিয়ন্ত্রণে থাক। প্রেসিডেন্টিয়াল ক্রাউন প্রিন্স হিসেবেই নমলকে ঘোষণা করার আয়োজন সম্পন্ন করছিলেন মহিন্দা। আর তাতেই এত দিন তার একান্ত অনুগতদের মধ্যে ফিসফিস করে যে গুঞ্জন চলছিল, তা প্রকট আকারে প্রকাশিত হচ্ছে। তিনি ভারত সফরকালে দি হিন্দু পত্রিকার সাথে সাক্ষাতকারে ছেলেকে প্রেসিডেন্ট ও দলের উত্তরসূরী করার পরিকল্পনা ফাঁস করেন। অবশ্য ২০২০ সালের নির্বাচনে তার ভাই ও সাবেক প্রতিরক্ষামন্ত্রী গোতাবায়া রাজাপাকসাই প্রার্থী করার পক্ষে বলেছেন। এক্ষেত্রে তিনি যুক্তি দিয়েছেন যে নমল রাজাপাকসার এখনো প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হওয়ার বয়স হয়নি বলেই তাকে এখন ওই পদের জন্য মনোনীত করা হচ্ছে না।-খবর সাউথ এশিয়ান মনিটর।

প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হওয়ার বয়স ৩০ থেকে ৩৫ করায় নমলকে প্রার্থী করা যাচ্ছে না বলে হিন্দুর এক প্রশ্নের জবাবে রাজাপাকসা সুস্পষ্টভাবে বলেছেন। ২০১৫ সালে ক্ষমতায় আসা বর্তমান সরকার ১৯তম সংশোধনীর মাধ্যমে ওই পরিবর্তন আনে। ওই পরিবর্তনে আরো বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি তৃতীয় মেয়াদে প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না। এর ফলে দুই মেয়াদে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব পালনকারী মহিন্দা রাজাপাকসাও প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে পারছেন না। তিনি নিজে প্রার্থী না হতে পারলে ছেলেকে প্রার্থী করার আশায় ছিলেন। সেখানেও কাজ না হওয়ায় এখন ভাই গোতাবায়াকে প্রার্থী করতে চাচ্ছেন। আর তিনিও যদি কোনো কারণে বাদ পড়েন তবে আরেক ভাই বাসিল রাজাপাকসা আছেন। তাতেও কাজ না হলে রাজনৈতিকভাবে অনেকটা নীরব চমল রাজাপাকসা আছেন। অর্থাৎ রাজাপাকসা নন, এমন কারো ওই দল থেকে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী হওয়ার সম্ভাবনা বলতে গেলে নেই।

মনে হচ্ছে, ভারতে গিয়ে চেপে রাখা অনেক কথাই ফাঁস করে দিয়েছেন মহিন্দা রাজাপাকসা। নিজের ৩২ বছর বয়স্ক ছেলেকে প্রেসিডেন্ট প্রার্থী করা ছাড়াও নিজের প্রার্থিতার ব্যাপারেও কথা বলেছেন তিনি। জানিয়েছেন, আদালতের রায়ের মাধ্যমে তিনি প্রেসিডেন্ট পদে প্রার্থী হতেও পারেন। তিনি দি হিন্দুর এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, আমিই এসএলপিপির নেতৃত্ব দেব। সংবিধান সংশোধনী সত্ত্বেও আমি নির্বাচনে লড়াই করতে পারি, তারপর আদালতে যেতে পারি।

এতে রাজাপাকসার স্বৈরতান্ত্রিক মানসিকতা আবারো ফুটে ওঠেছে। আইনগত যে বাধাই থাকুক না কেন, তিনি ফাঁকফোকর দিয়ে ক্ষমতায় যেতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। আর কোনো কারণে তিনি যদি ক্ষমতায় যেতে না পারেন, তবে রাজাপাকসাদের কাউকেই তিনি সামনে আনবেন। অ-রাজাপাকসাদের স্থান এখানে নেই।

অথচ তিনি কিন্তু ইতিহাস থেকে শিক্ষা গ্রহণ করেননি। তিনি ক্ষমতায় থাকার সময় দল ও সরকারি পদকে পারিবারিক বিষয়ে পরিণত করার কারণেই তার একসময়ের ঘনিষ্ঠ সহকর্মীরা তাকে ছেড়ে চলে গেছে। এমনকি বর্তমান প্রেসিডেন্ট মৈত্রিপালা সিরিসেনাও এই কারণে তাকে ছেড়েছেন। আর ২০১৪ সালেও তার সমর্থকেরা তার বিরুদ্ধে এভাবে বলে আসছিল। ফল হাতে হাতে পেয়েছিলেন তিনি।

গত সপ্তাহে প্রথম মুখ খোলেন মহিন্দার একান্ত অনুগত কুমারা ওয়েলগামা। তিনি বলেন, মহিন্দা রাজাপাকসা ক্ষমতায় থাকার সময় তার ভাইদের সাথে আচরণ করতেন একভাবে আর অন্য মন্ত্রীদের সাথে ভিন্নভাবে, বেশ কম মূল্য দিয়ে। এ কারণেই ২০১৫ সালের নির্বাচনে তার মন্ত্রীরাও গোপনে তার বিরুদ্ধে কাজ করেছিলেন। তিনি বলেন, আমাদের দলের প্রবীণদের বিপুল অভিজ্ঞতা রয়েছে। তাদের অগ্রাহ্য করা উচিত নয়।

একটু খতিয়ে দেখলে দেখা যাবে, ওয়েলগামা যেভাবে তার কথা বলেছেন, এসএলপিপির বেশির ভাগ সদস্যই তার সাথে একমত।

আবার এই প্রশ্নও ওঠেছে, মহিন্দা রাজাপাকসা কি তার ভাই গোতাবায়া রাজাপাকসাকে ভয় পান? রাজনৈতিক মহলে বলা হয়ে থাকে, নির্দয় গোতাবায়াকে ভয়ই পান মহিন্দা। প্রতিরক্ষামন্ত্রী থাকার সময় গোতাবায়া নির্মমভাবে প্রতিপক্ষকে দমন করতেন। তার বিরুদ্ধে মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। তার মানবাধিকার লঙ্ঘনের দায়দায়িত্ব প্রেসিডেন্ট হিসেবে মহিন্দা রাজাপাকসাকেই নিতে হয়েছে।

শ্রীলংকার ক্রিমিনাল ইনভেস্টিগেশন বিভাগ গত মাসে সাবেক প্রেসিডেন্টের কাছ থেকে ২০০৮ সালে দি ন্যাশন পত্রিকার সহযোগী সম্পাদক কিথ নয়াহরকে অপহরণ ও নির্যাতন নিয়ে তার বক্তব্য পেশ করেছেন। জানা গেছে, মহিন্দা রাজাপাকসা প্রতিরক্ষামন্ত্রী গোতাবায়া রাজাপাকসাকে ফোন করার পরই ওই সাংবাদিককে মুক্তি দেয়া হয়েছিল। তবে ওই ঘটনায় তদানিন্তন সেনাপ্রধান ও বর্তমান সরকারের মন্ত্রী জেনারেল শরথ ফনসেকাকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হচ্ছে না সে প্রশ্ন তুলেছে রাজাপাকসার জয়েন্ট অপজিশন।

নিজের ভাইকে ভালোমতো চেনেন বলেই গোতাবায়াকে প্রেসিডেন্ট পদে মনোনীত করতে চাচ্ছেন না মহিন্দা। কারণ একবার যদি গোতাবায়া প্রেসিডেন্ট হয়ে যান, তবে তার ছেলে নমল যদি প্রার্থী হওয়ার বয়সে উপনীত হওয়ার পরও গোতাবায়া তার পদ ছাড়বেন না। শেষ পর্যন্ত ২০২০ সালের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে কে প্রার্থী হবেন তা ওই বছরই জানা যাবে। তবে মহিন্দা রাজাপাকসা যে সামন্ততান্ত্রিক যুগ বহাল রাখবেন তা বোঝা যাচ্ছে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ