প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শিশু নির্যাতনের মূল্য ২২ হাজার!

ডেস্ক রিপোর্ট : দিনাজপুরের ফুলবাড়ী উপজেলার শিবনগর ইউনিয়নের দেবীপুর হাফিজিয়া মাদরাসার ছাত্র মো. শাকিলকে (১১) নির্যাতনের মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে ২২ হাজার টাকা। বাদী ও মাদরাসার প্রধান শিক্ষকের দাবি, পুলিশ শিশু নির্যাতনের বিষয়টি আপস-মীমাংসা করে থানায় মীমাংসাপত্র জমা দিতে বলেছে। অন্যদিকে থানায় অভিযোগ দেওয়া হলেও ঘটনার ১৭ দিন পরও মামলা রেকর্ড না হওয়ায় পুলিশের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

নির্যাতিত শিশু মো. শাকিল দেবীপুর গ্রামের মহিবুলের ছেলে। সে দেবীপুর হাফিজিয়া মাদরাসার ছাত্র। মায়ের মৃত্যু ও বাবা বিয়ে করে অন্যত্র সংসার করায় সে তার দিনমজুর নানা সাব্দুল মিয়ার বাড়িতে থাকে।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানান, দেবীপুর হাফিজিয়া মাদরাসার সহকারী শিক্ষক হাবিব উদ্দিন তাঁর ১৫০ টাকা চুরি সন্দেহে ৩১ আগস্ট সন্ধ্যায় শাকিলকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন। সে টাকা নেয়নি বলে জানায়। পরে হাবিব মাদরাসার ঘরে নিয়ে শাকিলকে বাঁশের লাঠি দিয়ে নির্মমভাবে পেটান। তার সারা শরীর দিয়ে রক্ত ঝরতে থাকে। খবর পেয়ে নানা দিনমজুর সাব্দুল মিয়া শিক্ষক হাবিবের হাতে-পায়ে ধরে নাতি শাকিলকে রক্তাক্ত অবস্থায় উদ্ধার করে সন্ধ্যা ৬টা ৫৫ মিনিটে ফুলবাড়ী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন।

উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ডা. সঞ্জয় কুমার সেদিন জানান, শাকিলের সারা শরীরে জখমের চিহ্ন পাওয়া গেছে। শরীরের অনেক জায়গা আঘাতের কারণে ছিলে গেছে। মাংসপেশি ফেটে গেছে। সারা শরীরে রক্তক্ষরণ হচ্ছে।

নির্যাতনকারী হাবিব উদ্দিন বলেন, টাকা চুরি করায় শাকিলকে একটু শাসন করা হয়েছে।

দেবীপুর হাফিজিয়া মাদরাসার প্রধান শিক্ষক বায়োজিদ বোস্তামী ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, ‘ঘটনার সময় আমি উপস্থিত ছিলাম না।’

গত শনিবার বিকেলে সরেজমিন গিয়ে দেখা যায়, দেবীপুর হাফিজিয়া মাদরাসার সভাপতি মাদরাসা ও এলাকার লোকজন নিয়ে নির্যাতিত শিশু শাকিল ও অভিযুক্ত শিক্ষককে ছাড়াই মীমাংসায় বসেছেন। কারণ অভিযুক্ত শিক্ষক সভাপতির নাতি।

প্রধান শিক্ষক বায়োজিদ বোস্তামী জানান, গত শুক্রবার তদন্তে আসা এসআই মাসুদ রানা ঘটনাটি ২৪ ঘণ্টার মধ্যে মীমাংসা করে মীমাংসার কাগজ থানায় জমা দিতে বলেছেন। তাই মীমাংসায় বসা হয়েছে। নির্যাতনের শিকার শাকিলের নানাকে ক্ষতিপূরণ বাবদ ২২ হাজার টাকা দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।

শাকিলের নানা সাব্দুল মিয়া বলেন, ‘গরিবের বিচার নাই। থানায় অভিযোগ দেওয়ার পরও মামলা হয়নি। দারোগা (তদন্তকারী কর্মকর্তা) ঘটনাটি মীমাংসা করে নিতে বলেছেন। তাই মীমাংসা করছি।’ তিনি বলেন, এই ঘটনার জন্য ২২ হাজার টাকা দিতে চেয়েছে। সাদা কাগজে স্বাক্ষর করে নেওয়া হয়েছে।

মাদরাসার সভাপতি আমিনুল সরদার মোবাইল ফোনে মীমাংসার কথা স্বীকার করে বলেন, ছাত্রকে নির্যাতনের অপরাধে সহকারী শিক্ষক হাবিব উদ্দিনকে মাদরাসা থেকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। তাঁর কারণে মাদরাসার অনেক ক্ষতি হয়ে গেল।

শনিবার নির্যাতিত শিশু শাকিলের বাড়ি গেলে সে তার শরীরের ক্ষত দেখিয়ে বলে, ‘আমি টাকা চুরি করিনি, বারবার বলার পরও আমাকে লাঠি দিয়ে পিটিয়েছে। অনেক কেঁদেছি, স্যারের পা ধরেছি, তাও আমাকে মেরেছে। এর আগে কোনো দোষ না করলেও প্রায়ই আমাকে মারধর করত। আমি এই মাদরাসায় আর পড়ব না। আমার চিকিৎসা হচ্ছে না। আজও আমি কোনো ওষুধ খাইনি। আমার ঘা এখনো শুকায়নি।’

অভিযোগের তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মাসুদ রানা ঘটনা মীমাংসা করতে বলার অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, শিশুটির নানা টাকার জন্য এ অভিযোগ করেছেন। কিন্তু কেন মামলা হয়নি, জানতে চাইলে তিনি কোনো উত্তর দেননি।

ফুলবাড়ী থানার ওসি শেখ নাসিম হাবিব রবিবার বলেন, ‘আমরা ঘটনা মীমাংসা করতে বলিনি।’ ঘটনার ১৬ দিন পরও কেন মামলা রেকর্ড হয়নি জানতে চাইলে তিনি বলেন, থানায় জিডি হয়েছে। তা ছাড়া মেডিক্যাল সার্টিফিকেট না পাওয়া পর্যন্ত কোন ধারায় মামলা হবে তা নিশ্চিত হওয়া যাবে না। আঘাতের চিহ্ন গুরুতর নয়।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিশু নির্যাতন নিষেধ রয়েছে, এর পরও এই নির্যাতনের মামলা হবে না কেন? এ বিষয়ে ওসি বলেন, এই আইনটি এখনো পাস হয়নি। তাই সেই আইনে মামলা নেওয়া যাচ্ছে না। তবে তারা মীমাংসা করলেও জিডিটি মামলা হওয়ার সুযোগ রয়েছে।
সূত্র : কালের কন্ঠ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত