প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মুরাহ্ মহিষ, রাজনীতি ও উন্নয়নের সময়োপযোগী পদক্ষেপ

দীপক চৌধুরী : মানুষের মঙ্গলের জন্য রাজনীতি, ক্ষমতার জন্য নয়। রাজনীতি মানুষের কল্যাণের জন্য হতে হবে। ঢাকার চারপাশে এলিভেটেড রিং রোড হবে। খুবই সুন্দর খবর। পাশাপাশি গ্রামের কথাও বিবেচনায় আনতে হবে। সাড়ে ৮ হাজার ডাকঘরে ই-সেন্টার চালু হয়েছে। এখন গ্রামের অসংখ্য ডাকঘর ‘অফিস’ যাদুঘরে পাঠানোর উপক্রম। অর্থাৎ সময়ের সঙ্গে আমাদের এগিয়ে যেতে হবে। দেশের অগ্রগতি ও উন্নয়ন নিয়ে শুধু সরকারকেই ভাবতে হবে, তা কেন? কিন্তু এটাই যেন আমাদের রাজনীতির বৈশিষ্ট্য হয়ে গেছে। সামনে আসছে, একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন। রাজনীতির ‘জ¦ালাও-পোড়াও’ বা ‘মারামারি’ ইস্যু নিয়ে অনেকেই আশঙ্কায়। কিন্তু গ্রামে তা খুবই কম। কীভাবে পেটে চারটি ভাত জুটাবে এমন চিন্তাই গুরুত্ব পায় তাদের আলোচনায়। পল্লী অঞ্চলে মানুষেরা দেশের অগ্রগতি ও কর্মসংস্থান নিয়ে ভাবে। কয়েকমাস আগে মাদারিপুর যেতে হয়েছিল। সেই সুবাদেই টেকেরহাট মুরাহ্ মহিষ খামার দেখা। সত্যিই সেখানে চাক্ষুষ দেখলাম, শুধু কথায় নয় বাস্তবতায়ও শেখ হাসিনার সরকার জনগণের অন্তরে ঢুকতে পেরেছে। দারিদ্র্য দূরীকরণকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে কাজ করার চেষ্টা সরকারের। সম্প্রতি স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রী খন্দকার মোশাররফ হোসেন এ রকমই একটি কথা বলেছেন। মন্ত্রীর ভাষায়, দেশে যত উন্নয়ন কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে তার মূল লক্ষ্য হচ্ছে দারিদ্র্য বিমোচন। যে কোনো উপায়ে দেশ থেকে দারিদ্র্য হটাতে হবে। সরকার দারিদ্র্য দূরীকরণকে সর্বোচ্চ প্রাধান্য দিয়ে কাজ করছে। আমরা জানি, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ থেকে দারিদ্র্য দূরীকরণে দেশের অবকাঠামোগত উন্নয়নে গুরুত্ব দিয়েছেন। দরিদ্র মানুষকে স্বাবলম্বী করে গড়ে তুলতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ‘একটি বাড়ি একটি খামার’ এবং ‘আশ্রয়ন’-এর মত প্রকল্পসমূহ বাস্তবায়ন করছেন। দেশকে দারিদ্র্যমুক্ত করতে কৃষিখাত প্রধান ভূমিকা রাখবে। দেশের পল্লীঅঞ্চলে বিদ্যমান পুষ্টিব্যবস্থার উন্নয়নে প্রায়োগিক গবেষণা দরকার। বলছিলাম, আমাদের দেশের জন্য নতুন জাত মুরাহ্ মহিষ ফার্মের কথা। পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে এটি শুরু হয়েছে। হোক না ছোট আঙ্গিকে।

মুরাহ্ জাতের মহিষের খামার এদেশে দুগ্ধ উৎপাদনে নতুন গতি আনতে পারে এবং পুষ্টিজগতে সৃষ্টি করতে পারে নতুন অধ্যায়। প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর মধ্যে কর্মসংস্থান সৃষ্টি ও আয় বৃদ্ধির লক্ষ্যই এ উদ্যোগ। দেশের মাদারীপুর জেলার আলোচিত জনপদ টেকেরহাট বন্দরের মিল্ক ভিটা দুগ্ধ উৎপাদনকারী সংস্থার সংলগ্ন এলাকায় বিশাল শেডে নয়ানাভিরাম পরিবেশে মুরাহ্ জাতের মহিষের খামার গড়ে তোলা হয়েছে। এগুলো হরিয়াণা প্রদেশের কার্ণাল জেলা থেকে বৈধ অনুমতি ক্রমে দুগ্ধ বৃদ্ধির লক্ষে আনা হয়েছে। এর সর্বশেষ চালানটি এসেছে গত মধ্য অগাস্টে। দৈনিক আমাদের অর্থনীতির মাদারীপুর জেলা প্রতিনিধি আলী আকবর খোকা জানালেন, বর্তমান কৃষিবান্ধব সরকারের পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ের আওতায় বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে ভারতের হরিয়ানা প্রদেশ থেকে উক্ত মুরাহ্ জাতের প্রায় ৮৫টি মহিষ আমদানি করা হয়। এগুলো প্রতিপালনে সুদুর পাবনা থেকে আনা হয়েছে মাসিক চুক্তিভিত্তিক ১০ জন কর্মচারি। তারা রাখাল হিসেবে এসব মহিষকে পরিচর্যা করছে। সকাল থেকে রাত অব্দি প্রতিটি মহিষকে খাবার সরবরাহ, খাবার পরিবেশন, দুগ্ধ আহরণ, মহিষদের পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখাসহ সযত্নে লালন-পালন করা হয়। রাখালদের প্রতিমাসে বেতন দেওয়া হয় ১৫০০০/-টাকা করে। খামারের মুরাহ্ মহিষের খামারটি একটি লাভজনক প্রতিষ্ঠান করার লক্ষ্যে সরকারি অর্থায়নে গড়ে তোলা হয়। প্রতিদিন ৪৩০ থেকে ৪৫০ কেজি দুধ উৎপন্ন হয় ৮৫টি মহিষ থেকে। এর বাইরে বাছুরগুলোও প্রায় তিনমাস পর্যন্ত দুগ্ধ পান করে। একেকটি বাছুর প্রায় তিন লিটার দুগ্ধ খায়। এর সঙ্গে যুক্তরা জানান, এদেশে এখন মহিষ নেই। এটি সফল হলে ভবিষ্যতে গ্রামীন জনগোষ্ঠীকে স্বাবলম্বী করে তোলা সহজ হবে। মহিষের দুধে ফ্যাটের পরিমাণ প্রায় দ্বিগুণ থাকায় এই তরল খাদ্যের জনপ্রিয়তা রয়েছে। এগুলোকে ধানের খড়, কাচা ঘাস, দানাদার খাবার, নদী বা টিউবওয়েল এর পানি সরবরাহ করা হয়। মহিষগুলোর আহরিত দুধ নিকটবর্তী মিল্কভিটা দুগ্ধ উৎপাদকারী সংস্থাতেই প্রক্রিয়াজাত করে উন্নত মানের ঘি, রসমালাই, ঘোল, মাঠা,ক্রীম-মাখনসহ পাস্তুরিত দুধ ও দুগ্ধজাত দ্রব্যাদি নিজ জেলার চাহিদা মিটিয়ে অন্যান্য জেলায় নিয়মিত সরবরাহ করা হয়। মহিষগুলোর শিং বেনিওয়ালা। সুন্দর আচরণ, মায়াবি, দেখতে অনেক সুন্দর। এদের আয়ুষ্কাল ১৩ থেকে ১৫ বছর। চার পাঁচবার বাঁচ্চা প্রজনন পর্যন্ত দুগ্ধ উৎপাদন অটুট থাকে। একই সঙ্গে এদের রোগ বালাই কম হওয়ায় মহিষ পালনে বা উৎপাদনের ক্ষেত্রে এদের খরচের মাত্রা খুবই সামান্য।

অনেকেই মনে করেন, শিক্ষায় রিনিয়োগ জাতি গঠনের লক্ষ্যে। মহিষে বিনিয়োগ আমাদের পুষ্টি সমৃদ্ধ করবে এটাই স্বাভাবিক। পুষ্টির অভাব রয়েছে স্বীকার করতেই হবে। মহিষ প্রকল্পের পরিচালক প্রীতম কুমার দাস জানালেন, বাণিজ্যিক চিন্তা সকলক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়। এটি চিন্তা করতে হবে উন্নয়নের বিবেচনায়। মুরাহ্ মহিষ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে এ কর্মকর্তা আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে মন্তব্য করেন, পুষ্টি সমৃদ্ধির ক্ষেত্রে গুরুত্ব দিয়ে এগিয়ে গেলে এটি দেশের অগ্রগতিতে ভবিষ্যতে চমৎকার ইতিবাচক ভূমিকা রাখবে। জানা গেছে, পরিদর্শন রুটিন অনুযায়ী স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায় মন্ত্রণালয়ে একবার প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গিয়েছিলেন। বিভিন্ন উন্নয়নের প্রসঙ্গে দুগ্ধ উৎপাদন বৃদ্ধির ব্যাপারেও তিনি পরামর্শ দেন। ভারতের মতো বাংলাদেশে মহিষের খামার গড়ে তোলা ও বৃদ্ধি করার ওপর তিনি জোর দেন।

আলী আকবর খোকা আরো জানালেন, মুরাহ জাতের মহিষের খামার দেখতে প্রতিনিয়ত উৎসুক জনতা ভিড় জমাচ্ছে। সরকারি সাহায্য পেলে ব্যক্তি উদ্যোগেও এ ধরণের মহিষের খামার স্থাপন করে প্রচুর পরিমান বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব। স্থানীয়রা মন্তব্য করেন, এ ধরণের মহিষের খামার ভবিষ্যতে প্রতিটি জেলায় স্থাপন করা হলে বাংলাদেশের একদিকে যেমন বেকারত্ব দূর হবে অপরদিকে দুধ ও দুগ্ধজাত দ্রব্যে সমৃদ্ধি হবে। আমাদের পুষ্টি অভাবের কথা কারো অজানা নয়। এটি দূর করতে সংযোজিত হয়েছে মুরাহ্ মহিষ খামার।
লেখক : উপ-সম্পাদক, দৈনিক আমাদের অর্থনীতি

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত