প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মানবসভ্যতার সংকট : রোহিঙ্গা ও বিশ্ব প্রেক্ষাপট

ড. ফোরকান উদ্দিন আহমদ : প্রায় দশ লাখ রোহিঙ্গা আজ উদ্বাস্তু হয়ে বাংলাদেশে মাটিতে আশ্রয় নিয়েছে। রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের সন্তান। মিয়ানমারের মাটি রোহিঙ্গাদের মাটি। আমরা কেন অন্যের সন্তানকে লালন করব? হ্যাঁ, তবে বিশ্ব সন্তান হিসেবে বিশ্বের বিবেক কেন জাগ্রত হচ্ছে না। এর সমাধানে এখনও কোন কার্যকর পদক্ষেপ গৃহীত হচ্ছে না। এ প্রশ্ন প্রতিটি মানুষের। তাদের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে অন্যের অসুবিধা বা ভোগান্তি বাড়বে তা কখনই কাম্য নয়। আমাদের দেশে আমরাই হাজার সঙ্কটের মুখে আবর্তিত হচ্ছি। ৫৬ হাজার বর্গমাইলের এই দেশে আমরা ষোলো কোটিরও বেশি মানুষ ঠাসাঠাসি অবস্থায় বসবাস করছি। অধিকন্তু রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের চাপ। তাদের আবাসন, স্বাস্থ্য, নিরাপত্তা, খাদ্য, বস্ত্র ইত্যাদি বিষয়গুলো দেখার মত সামর্থ্য আমাদের কতটা আছে তা বিবেচ্য বিষয়। এই উদ্বাস্তু জনগোষ্ঠী যখন তার মৌলিক প্রয়োজন পূরণে বেসামাল হয়ে যাবে, তখন তারা বিভিন্ন অন্যায়, অনৈতিক, অবৈধ কাজের সঙ্গে জড়িয়ে পড়বে।

এখানকার স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সাথে মিশে অন্যায়, অশালীন ও অযাচিত উপায়ে জীবনাচরণে অভ্যস্ত হতে বাধ্য হবে। বেঁচে থাকার জন্য হয়তোবা যে কোনো ঘৃণ্য পন্থা বেছে নিতে দ্বিধা করবে না। সময়ান্তরে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তু জনগণ কাজের খোঁজে বেঁচে থাকার তাগিদে হন্যে হয়ে এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় ঘুরে বেড়াবে। এটা কোন্ অসভ্যতা? একবিংশ শতাব্দিতে মানুষ সভ্যতার চূড়ায় অবস্থান করেও মানুষ আদিম, অবস্থান থেকে মানুষের জীবন নিয়ে ছিনিমিনি ও তামাশা করে যাচ্ছে। মায়ানমার কর্তৃপক্ষ আজ নির্লজ্জের মতো। তারা মানবতর ও ইতর প্রাণীর চেয়েও বোধ বিবর্জিত নিকৃষ্ট বস্তুতে পরিণত হয়েছে। তারা তাদের নিজের মানুষের প্রতি এমন বৈরি আচরণ করবে তা ভাবতে পারার মত নয়।

কেননা, ধর্ম-নীতি, মতভেদ কিন্তু মানব ধর্মের কাছে এতটা গুরুত্ব পায়নি। তাই মানব ধর্মকে ও মানবতাকে প্রাধান্য দিয়ে হিংসা, পরশ্রীকাতরতা, বিদ্বেষ, বিদূরিত করে মনের পশুত্বকে পরিহার করে সভ্যতার লালন করতে হবে। মায়ানমার কর্তৃপক্ষ ও শাসক দলের কাছে বাঙালি ও বিশ্ব বিবেকের এটাই প্রত্যাশা। মিয়ানমারের সচেতন, সভ্য ও সুশীল সমাজের কাছে আমাদের নিবেদন আশা করি প্রত্যাখ্যাত হবে না। তারা হয়তো বা তা সহানুভূতি ও সহনশীলতার দৃষ্টিকোণ থেকেই দেখবেন। আর যদি না দেখেন তাহলে তো মানবতা ও বিশ্বসভ্যতা বিচূর্ণ হবেই। অন্যায়, অবিচার ও জুলুম প্রতিষ্ঠা পাবে, অশান্তি, অরাজকতা ও অস্থিরতা বৃদ্ধি পাবে। অসাম্প্রদায়িকতা, হানাহানি, নাশকতা ও রক্তপাত বৃদ্ধি পাবে। বিভেদ ও বৈষম্য বাড়বে। জাতীগত দাঙ্গায় সমাজকাঠামো নষ্ট হবে। এই অনাচার যদি কেউ লালন করে, তাহলে তার বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়ে বিশ্বকে ব্যবস্থা নিতে হবে। বিশ্বের শান্তিকে হুমকিতে ফেলার কারো কোনো অধিকার নেই। জাতিসংঘ এই অবমাননা কতকাল বহন করে চলবে।

সারা দুনিয়ার জনসাধারণ আজ ঘুমন্ত; তবে জাগ্রত ও ভীষণভাবে সক্রিয় আছে বিশ্বায়নবাদীরা। তারা সংকট বাড়িয়ে চলছে। দুনিয়াব্যাপী শুভবুদ্ধি আজ দুর্বল, পরাজিত, নির্যিত, অসহায়; আর অশুভবুদ্ধি বিজয়ী। বিজয়ী ও পরাজিত উভয় মহলেই আজ মানবতা লাঞ্ছিত। প্রতিযোগিতা চলছে লোভীর সঙ্গে লোভীর ব্যক্তিপর্যায়েই হোক আর সমষ্টিপর্যায়েই হোক। মানবজাতি আজ সভ্যতাবিমুখ, প্রগতিবিমুখ, ন্যায়বিমুখ ও অদূরদর্শী। অত্যন্ত দ্রুত যন্ত্রের গতিতে চলছে কিংবা চলতে বাধ্য হচ্ছে সবাই; এতে কোনো বিচার-বিবেচনা নেই। পাশ্চাত্য সভ্যতার প্রতি এই ঝোঁক,বলতে দ্বিধা নেই, সেকালের প্রায় সব লেখকের মধ্যেই লক্ষ্য করেছি আমরা। পশ্চাতপদ ভারতীয়রা ঔপনিবেশিক শাসকদের সংস্কৃতিকে শ্রদ্ধার চোখে দেখবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যতই তারা শিক্ষিত হতে থাকেন, ততই বুদ্ধিবৃত্তিক মোহাচ্ছন্নতা কাটিয়ে ওঠা তাদের পক্ষে সহজ হয়ে ওঠে। রবীন্দ্রনাথ ঠিক এরকম একটা সময়েই জন্মগ্রহণ করেছিলেন।

হুমায়ুন কবির সেই পরিস্থিতির ব্যাখ্যা দিয়েছেন এইভাবে, রবীন্দ্রনাথ যখন জন্মেছেন তখন হচ্ছে সেই সময়, যখন পশ্চিমের সম্মোহনের প্রথম দশা কেটে গিয়ে সমানুপাতিক মূল্যায়ন প্রতিষ্ঠার পথে। যেসব আদর্শ এদেশে আনীত হয়েছিল সেগুলো তখনও সক্রিয় ও প্রবল ছিল; কিন্তু সে সঙ্গে ভারতবর্ষের নিজস্ব উত্তরাধিকারের মূল্যবোধগুলোর স্বীকৃতিও উত্তরোত্তর বৃদ্ধি পাচ্ছিল। রবীন্দ্রভাবনারও বিবর্তনও ঘটেছিল এ পথে। ‘সভ্যতার সংকট’ প্রবন্ধটিকে রবীন্দ্রভাবুকতার চমৎকার ধারাভাষ্য বলে উল্লেখ করা বলা যায়। ইতালীয় মার্কসবাদী ভাবুক আন্তোনিও গ্রামসি তার ‘জেলখানার নোটবুকে’র একজায়গায় ভারতের স্বাধীনতা সংগ্রামের তিনটি স্তর ছিল বলে উল্লেখ করেছেন : সূচনা পর্ব, কৌশলী পর্ব এবং অর্জনের পর্ব। ভাবলে বিস্মিত হতে হয়, ভারতে ব্রিটিশ বিরোধিতা করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথ ঠিক এভাবেই অগ্রসর হয়েছিলেন।

জাতিসংঘের আসন্ন অধিবেশনে রোহিঙ্গা ইস্যুতে মানবতা ও মানব সভ্যতায় আরো সচেতন হয়ে কার্যকর ও কঠিন পদক্ষেপ নেবেÑ এ প্রত্যাশা জনগণের। আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী দৃঢ়তার সাথে বিগত দিনে রোহিঙ্গা উদ্বাস্তুদের বিষয়ে ভূমিকা রেখেছেন। এবারও তিনি সাবলিল ও বলিষ্ঠচিত্তে মায়ানমারের উদ্যত্যের বিরুদ্ধে জোরালো ভূমিকা রাখবে। জাতির পিতার সুযোগ্য সন্তান ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর কাছে জনগণ তাই প্রত্যাশা করে।

লেখক : কলামিস্ট ও গবেষক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ