প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দেশের দুই খ্যাতিমানের রাষ্ট্রক্ষমতার সাধ

মে. জে. (অব.) মোহাম্মদ আলী শিকদার : বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন এলেই জোট এবং ভোটের বহু হিসাব-নিকাশ নিয়ে মাঠে নামেন অনেক জানা-অজানা এবং খ্যাত-অখ্যাত ব্যক্তিরা। সম্প্রতি দেশের দুই খ্যাতিমান ব্যক্তি ড. কামাল হোসেন এবং ডা. বি. চৌধুরী আগামী জাতীয় নির্বাচনকে সামনে রেখে যেরকম দৌঁড়-ঝাপ এবং উচ্চবাচ্চ্য শুরু করেছেন তাতে দেশের মানুষ একদিকে যেমন এটি কৌতুক হিসেবে উপভোগ করছেন, অন্যদিকে বিভ্রান্তিতে পড়েছেন। এ কারণে যে, এই দুই খ্যাতিমান ব্যক্তি রাজনীতিতে বহুদিন আছেন। বহু ঘাটে ঘোরাফেরা করেছেন বলেই মানুষ তাদের ভালো করে জানে এবং  চেনে। দেশের রাজনীতি, রাষ্ট্রনীতি এবং জনবান্ধব, জনকল্যাণে তারা কতটুকু ভূমিকা বিগত দিনে রেখেছেন তার বিচার-বিশ্লেষণ করলে তাদের বর্তমান হাঁকডাকের মূল রহস্য বোঝে উঠা কষ্টকর হয়ে যায়। তারা দুজনই বলছেন, এবার তারা দেশের গণতন্ত্র উদ্ধার করে ছাড়বেন! বাংলায় একটা প্রবাদ আছে, ‘বৃক্ষ তোমার নাম কি ফলে পরিচয়’। তাই ডা. বি. চৌধুরী ও ড. কামাল হোসেনের বিগত দিনের ট্র্যাক রেকর্ড পর্যালোচনা করলে মানুষ বুঝতে পারবেন জীবনভর এই খ্যাতিমান ব্যক্তিরা দেেশর মানুষের জন্য কী ধরনের ফল খাইয়েছেন। প্রথমে ধরা যাকÑবি. চৌধুরীর কথা। তিনি বাংলাদেশের প্রথম সামরিক স্বৈরশাসক জিয়াউর রহমানের অন্যতম প্রধান সহযোগি ছিলেন। জিয়া সামরিক আদেশ বলে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শে পূর্ণ বাহাত্তরের মূল সংবিধান থেকে গণতন্ত্রের অন্যতম রক্ষাকবচ ধর্মনিরপেক্ষতাকে বাতিল করে যখন গণতন্ত্রের কবর রচনা করলেন তখন বি. চৌধুরী জিয়াউর রহমানের অন্যতম সহযোগি। শুধু তাই নয়, বাহাত্তরের সংবিধান থেকে মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ সংবলিত সমস্ত শব্দ, বাক্য ও অনুচ্ছেদ জিয়াউর রহমান সামরিক আদেশ বলে বাতিল করে দিলেন। সেসময় বি. চৌধুরী জিয়াউর রহমানের সেই অপকর্মে যুক্ত থেকে প্রমাণ করেছেন যে, তিনি গণতন্ত্র ও মুক্তিযুদ্ধের আদর্শকে যে স্বৈরশাসক হত্যা করেছেন তার একান্ত সহযোগি তিনি। এই দায় তিনি এড়াতে পারেন না। তিনি যখন বিএনপির মহাসচিব ১৯৭৮ সালে তখন জিয়া সরকারের প্রধানমন্ত্রী হলেন রাজাকার শিরোমনি শাহ আজিজুর রহমান। মন্ত্রী হলেন যুদ্ধাপরাধী আবদুল আলিম। এবং একাত্তরের বুদ্ধিজীবীদের ঘাতক মাওলানা আবদুল মান্নান। বি. চৌধুরীর মুক্তিযুদ্ধের আদর্শের প্রেমের নিদর্শন এখানেই শেষ নয়, আরও আছে।

২০০১-২০০৬ মেয়াদে তিনি রাষ্ট্রপতি হলেন। এবং তখন তিনি বিএনপি সরকারে দুজন চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধী মতিউর রহমান নিজামী ও আলী আহসান মুজাহিদ গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রী হলেন। তিনি অত্যন্ত অপমানজনকভাবে বিএনপি থেকে বহিস্কৃত বিতারিত হয়ে নতুন দল ‘বিকল্প ধারা’ গঠন করলেন। তারও চৌদ্দ-পনের বছর তার রাজনৈতিক সংগঠন জনগণের সঙ্গে কতটুকু সম্পর্ক স্থাপন করতে পেরেছেন তা সবাই জানে। দেশের ৬৪ জেলা, ৪৮৫টি উপজেলার মধ্যে কয়টিতে উনার দলের কমিটি আছে, সেটি বোধহয় আঙুল গুণে বলা যায়। সুতরাং জনাব বি. চৌধুরীর রাজনৈতিক ট্র্যাক রেকর্ড ও বর্তমান রাজনৈতিক দলের ক্ষমতার যে অবস্থা তাতে তিনি যখন ঘোষণা দেন আগামী নির্বাচনে জিতে রাষ্ট্রপতি হবেন তখন মানুষের কাছে হয় ভুল বার্তা যায়, নয়তো কৌতুকপূর্ণ মনে হয়।

একইভাবে ড. কামাল হোসেনের ট্র্যাক রেকর্ড এবং তার দলের সাংগঠনিক ক্ষমতা আরও অথৈবচ। তিনি প্রায়শ্চ অন্যান্য বড় রাজনৈতিক দলের অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তিনি যে প্রশ্ন তোলেন সেই প্রশ্নটি যদি তাকে কেউ করেন তার নিজ দলের ভেতরে কি গণতন্ত্র আছে? কারণ গণফোরাম গঠনের এ পর্যন্ত তিনি একাই দলের সভাপতি পদ আকড়ে আছেন। তিনি বঙ্গবন্ধুর একজন পরম স্নেহভাজন  ব্যক্তি ছিলেন। বঙ্গবন্ধুর অপার কৃপার কারণেই বাংলাদেশের মানুষের কাছে পরিচিতি পেয়েছেন। কিন্তু বঙ্গবন্ধু হত্যাকা- ও পরবর্তী সময় ড. কামাল হোসেনের কর্মকা- সবসময় রহস্যে ঘেরা ছিল। দেশের সংকটে তাকে জনগণের মধ্যে কখনো দেখা যায়নি। সুতরাং আলোচ্য খ্যাতিমান ব্যক্তিরাÑ জনগণের সঙ্গে সম্পর্ক ও সংযোগহীন অবস্থায় যখন বলেন, আগামী নির্বাচন, যার সময় চারমাস, এই সময়ে তারা জনগণকে নিয়ে, জনগণের সমর্থনে নির্বাচনে জয়ী হয়ে ক্ষমতায় যাবেন তখন মানুষের মনে বহু রকমের সন্দেহের সৃষ্টি হয়। কারণ সিঁদুরের মেঘ দেখলে ভয় পায়। ৭৫ সালের পর থেকে বাংলাদেশকে নিয়ে কত যড়যন্ত্র হয়েছে তা অন্য কোনো দেশে পাইনি। আর এই ষড়যন্ত্রের কারণে বাংলাদেশের রাজনীতি কলুষিত হয়েছে। ধর্মান্ধ, উগ্রবাদী শক্তির উত্থান ঘটেছে। সর্বোপরি বাংলাদেশ পিছিয়ে পড়েছে। তাই দেশের মানুষ আর কোনো ষড়যন্ত্র দেখতে চায় না।

লেখক : কলামিস্ট, নিরাপত্তা ও রাজনৈতিক বিশ্লেষক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ