প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

লাল ঝুঁটি কাকাতুয়া ধরেছে যে বায়না –

বিভুরঞ্জন সরকার : বিএনপি চেয়ারপার্সন বেগম খালেদা জিয়ার শারীরিক অসুস্থতা এবং চিকিৎসা নিয়ে রাজনৈতিক বাহাস শুরু হয়েছে। বিএনপি ক্রমাগত দাবি করছে কারাগারে বিএনপি নেত্রী গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েছেন।তার উন্নত চিকিৎসা দরকার এবং সেটা হতে হবে বিশেষায়িত হাসপাতালে।সে হাসপাতাল হতে হবে আবার ইউনাইটেড অথবা অ্যাপোলো।এই দুই হাসপাতাল ছাড়া খালেদা জিয়া অন্য কোনো হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে চান না কেন–এই প্রশ্নের সন্তোষজনক জবাব কি বিএনপির কাছ থেকে পাওয়া যাচ্ছে ? না। তবে বিএনপিদরদিরা মনে করেন রোগী নিজে যেখানে কমফোর্ট ফিল করবেন, সেখানেই তাকে চিকিৎসার সুযোগ দিতে হবে! খালেদা জিয়া একজন কারাবন্দি। তার চিকিৎসা হবে কারাবিধি অনুযায়ী। ইচ্ছা মতো চিকিৎসা হতে পারে স্বাধীন বা মুক্ত মানুষের। বিএনপির দাবি অনুযায়ী খালেদা জিয়া চলাফেরা করতে পারছেন না । এটা যদি সত্য হয়, তাহলে তিনি চিকিৎসার বিষয়টিকে রাজনৈতিক ইস্যু বানিয়ে কেন হাসপাালের বিষয়টিকে এভাবে গুরুত্ব দিচ্ছেন । বেগম জিয়ার মনোভাব থেকে তিনি কি স্পষ্ট কোনো বার্তা বা ম্যাসেজ দেশের মানুষের কাছে কি দিতে পেরেছেন ?

দেশের মানুষের একটা অংশ মনে করেন যে, বেগম জিয়াকে কারাগারে নিয়ে সরকার ভুল করেছে । আবার এটা আইনের স্বাভাবিক পরিণতি বলেও অনেকে মনে করছেন। তবে বিএনপি তাদের নেত্রীর জেল ও চিকিৎসা নিয়ে যেরকম হাহাকার-কান্না করছেন সেটা রাজনীতিতে মানানসই নয়। বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের জন্য জেল জীবন কোনো অস্বাভাবিক ঘটনা নয়। জেলজীবনকে উপভোগ্য বা অর্থময় করে তোলার জন্য অনেক বিখ্যাত রাজনীতিক কত কিছু করেছেন। রাজনীতিবিদদের জন্য কারাগারকে শাস্তির জায়গার চেয়ে জীবনগঠনের শিক্ষালয় বলে মনে করা হয়।নিভৃত কারাপ্রকোষ্ঠে একজন রাজনৈতিক বন্দি আত্মজিজ্ঞাসার একটি উপযুক্ত ক্ষেত্র মনে করেন। পঠন-পাঠনেরও এক বড় সুযোগ পাওয়া যায় জেলে। জেলে থেকে বই লিখে অনেকে বিখ্যাত হয়েছেন, সুনামের অধিকারী হয়েছেন। জওহরলাল নেহরুর বিখ্যাত গ্রন্থ ‘দ্য ডিসকভারি অফ ইন্ডিয়া’ জেলে বসে লেখা। আমাদের বর্তমান কৃষিমন্ত্রী মতিয়া চৌধুরীর কারাস্মৃতি নিয়ে লেখা ‘দেয়াল দিয়ে ঘেরা’ একটি মূল্যবান গ্রন্থ। সত্যেন সেন জেলে না গেলে লেখক হয়ে উঠতেন কি না সন্দেহ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান কারাগারে বসে যে অসাধারণ দুটি গ্রন্থ রচনা করেছেন তা আমাদের জাতীয় ইতিহাসের মহামূল্যবান উপকরণ হয়েছে।

খালেদা জিয়া কি পারেন না কারাগারের অখন্ড অবসরে এমন কিছু লিখতে যা ব্যক্তিগতভাবে তাকে, তার দল বিএনপিকে এবং সামগ্রিকভাবে দেশের রাজনীতির জন্য এক অমূল্য উপহার হতে পারে

খালেদা জিয়া হাসপাতাল নিয়ে যেভাবে জেদ ধরে আছেন তাতে একটি শিশুতোষ গানের কলি মনে পড়ছে :
‘লাল ঝুঁটি কাকাতুয়া ধরেছে যে বায়না
চাই তার লাল ফিতে চিরুণি আর আয়না –
জেদ বড় লালপেড়ে টিয়া রং শাড়ি চাই
মন ভরা রাগ নিয়ে হলো মুখ ভারী তাই –।

বেগম জিয়ার দরকার চিকিৎসা। দ্রুত সুস্থ হয়ে ওঠা। বিএনপি অভিযোগ করছে, তাকে তার পছন্দ মতো হাসপাতালে চিকিৎসার সুযোগ না দিয়ে হত্যার ষড়যন্ত্র করছে। কিন্তু এখন তো উল্টো সরকারই বিএনপির বিরুদ্ধে অভিযোগ করতে পারে যে সিএমএইচের মতো সুনামের অধিকারী এবং অত্যন্ত নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য হাসপাতালে চিকিৎসা সুযোগ না নিয়ে বিএনপি এবং খালেদা জিয়া নিজেই একটি বড় ষড়যন্ত্র করছে, তাহলে তাকে ভুল প্রমাণ করা হবে কীভাবে? বাজারে কত রকমের গুজব। সরকারকে বিপাকে ফেলতে ‘অনির্ধারিত’ বা ‘অপ্রত্যাশিত’ কিছুর আশায় আছে বিএনপি। এই অবস্থায় সরকারকে সর্বাধিক সতর্কতার সঙ্গেই আগাতে হবে। বিএনপির বা অন্য কোনো পক্ষের পাতা ফা্ঁদে পা দেওয়া চলবে না।

বেগম জিয়াকে লাল ফিতে চিরুণি আয়নার জেদ পরিহার করে তাড়াতাড়ি সিএমএইচে গিয়ে চিকিৎসার সুযোগ নিতে হবে।
যে গানের কথা আগে উল্লেখ করছি, তার আর দুটি কলি :
‘ছোটো থেকে কোনোদিন বড় যদি হতে চাও
ভালো করে মন দিয়ে পড়াশোনা করে যাও। —
দুষ্টুমি করে যে কেউ তারে চায় না
লাল ঝুঁটি কাকাতুয়া ধরেছে যে বায়না —!

অসুস্থতা, চিকিৎসা, এমন কি রাজনীতি কেনোটাই বায়নার বিষয় নয়। এগুলো নিয়ে ‘দুষ্টমি’ করার পরিণতিও ভালো হয় না। খালেদা জিয়া এবং তার পরামর্শকমন্ডলীকে শুভ বুদ্ধির পরিচয় দিতে হবে।

সরকার তাদের সহযোগিতাই করতে চায় বলে অনেকেরই মনে হচ্ছে। মন ভরা রাগ নিয়ে মুখ ভার করে বসে থাকার সময় বিএনপির অন্তত আছে বলে মনে হয় না।

লেখক : যুগ্ম গ্রুপ সম্পাদক, আমাদের নতুন সময়।