প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

৩৬৫ দিনে সপ্তাহ!

প্রভাষ আমিন : এমনিতে ট্রাফিক সপ্তাহ বছরে একবার হয়। এবার নিরাপদ সড়কের দাবিতে আন্দোলনরত শিক্ষার্থীদের ঘরে ফেরানোর কৌশল হিসেবে পুলিশ ৫ আগস্ট বিশেষ ট্রাফিক সপ্তাহ শুরু করে। কৌশল কিছুটা কাজেও লাগে। ট্রাফিক সপ্তাহের শুরুতেই ঘরে ফিরে যেতে বাধ্য হয় শিক্ষার্থীরা। তবে পুলিশ শিক্ষার্থীদের দেখানো পথেই শুরু করে ট্রাফিক সপ্তাহের কার্যক্রম। এ যেন শিক্ষার্থীদের অসমাপ্ত কাজ সমাপ্ত করার চেষ্টা। শিক্ষার্থীরা ঘরে ফিরে গেলেও স্কাউটরা ট্রাফিক পুলিশের সঙ্গে কাজ করেছে। ট্রাফিক সপ্তাহের বিশেষ সাফল্যে উজ্জীবিত হয়ে পুলিশ ট্রাফিক সপ্তাহের মেয়াদ তিনদিন বাড়িয়ে নেয়। ১০ দিনের ট্রাফিক সপ্তাহ শেষ হয়েছে ১৪ আগস্ট। আমি বলছি বলে নয়, ট্রাফিক সপ্তাহ যে দারুণ সফল, তার প্রমাণ পরিসংখ্যানে। ১০ দিনে মামলা হয়েছে ১ লাখ ৮০ হাজার ২৪৯টি, জরিমানা হয়েছে ৭ কোটি টাকারও বেশি, প্রায় ৭৫ হাজার চালকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, আটক করা হয়েছে সাড়ে ৫ হাজারেরও বেশি যানবাহন। এমনিতে আমরা জানি, ট্রাফিক সপ্তাহের কারণে লাইসেন্স নেই, ফিটনেস নেই– এমন গাড়ি রাস্তায় কম নেমেছে। তারপরও ট্রাফিক সপ্তাহের এই ‘বাম্পার’ সাফল্য চিন্তার কারণ বটে। কিছু কিছু অর্জন আছে আমাদের গর্বিত করে না; লজ্জিত করে, চিন্তিত করে। ট্রাফিক সপ্তাহের অর্জনও তেমন। বিশাল সাফল্য মানে, বিপুলসংখ্যক মানুষ ট্রাফিক আইন মানে না, বিপুলসংখ্যক গাড়ির ফিটনেস নেই।

নিরাপদ সড়কের দাবিতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে সারাদেশে অভূতপূর্ব গণজাগরণ সৃষ্টি হয়েছিল। দলমত নির্বিশেষে সবাই তাদের দাবির যৌক্তিকতা মেনে নিয়েছিলেন, আন্দোলনের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। সবাই বলছিলেন, বাচ্চারা আমাদের শিখিয়েছে, চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। কিন্তু ট্রাফিক সপ্তাহ আবার চোখে আঙুল দেখিয়ে দিলো আমরা আসলে কিছুই শিখিনি। শিক্ষার্থীরা চোখে আঙুল দিয়ে শেখাবে কোত্থেকে; আমরা তো আসলে অন্ধ। আমাদের চোখই নেই। শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সময় বিআরটিএতে লাইসেন্স আর ফিটনেসের জন্য মানুষ আর গাড়ির উপচেপড়া ভিড় ছিল। তারপরও ট্রাফিক সপ্তাহের এই বিশাল সাফল্য!

স্বভাবগতভাবে আমরা আইন মানতে চাই না। সুযোগ থাকলেই আইন ভাঙতে চাই। অবশ্য এটা শুধু আমাদের প্রবণতা নয়, সবাই সুযোগ পেলে আইন ভাঙতে চান। উন্নত দেশে আইনের প্রয়োগ হয় কঠোরভাবে। কিন্তু আমাদের এখানে সেটা সম্ভব হয় না। ‘ঠেলার নাম বাবাজি’। শিক্ষার্থীরা যে ক’দিন রাস্তা নিয়ন্ত্রণ করেছে, সে ক’দিনই আমরা সবাই তারের মতো সোজা ছিলাম। তারা ঘরে ফিরে যেতেই আমরা আবার আগের স্টাইলে ফিরে গেছি। আইন-কানুনের বালাই নেই। ট্রাফিক সপ্তাহের মধ্যেও রাজপথে বিশৃঙ্খলা ছিল চরমে। দুই বাসের রেষারেষি, যেখানে সেখানে থামানোর দায় না হয় বাসচালকদের। কিন্তু যেখানে সেখানে হাত দেখিয়ে বাসে ওঠার চেষ্টা বা ‘ওস্তাদ একটু স্লো করেন’ বলেই লাফ দিয়ে বাসার সামনে নামতে চাই তো আমরাই। আমরা মানে আমি-আপনি। অথচ আমাদের সন্তানরাই কিন্তু রাস্তায় নেমেছিল আমাদের শৃঙ্খলা শেখাতে। ফুটওভার ব্রিজের নিচ দিয়ে যারা দৌড়ে রাস্তা পার হয়, অ্যাক্রোবেটিক দক্ষতায় যারা কাঁটাতারের ফাঁক গলে পারাপার করে তারা কারা? মোটর সাইকেলের অত্যাচারের কথা বলতে গেলে মহাকাব্য হয়ে যাবে। তারা যেন রাস্তার রাজা। আইন-কানুনের বালাই নেই, কাগজপত্রের চিহ্ন নেই, হেলমেটের দেখা নেই। রাস্তা আর ফুটপাতে পার্থক্য নেই। তো এই মোটর সাইকেলগুলো কারা চালায়? পরিবহন শ্রমিক, ট্রাফিক পুলিশ আর সরকারের কেউ কিন্তু নয়। যারা শৃঙ্খলা ফেরাতে রাস্তায় নেমেছিল, সেই শিক্ষার্থীদের বাবা-মায়েরাই তো রাস্তায় আইন ভাঙে, মোটর সাইকেল চালায়।

বাংলাদেশে নিবন্ধিত যানবাহন আছে প্রায় ৩৬ লাখ। আর ড্রাইভিং লাইসেন্স আছে ১৮ লাখের মতো। তাহলে বাকি ১৮ লাখ গাড়ি কোন ভুতে চালায়? ট্রাফিক সপ্তাহে তো মামলা অনেক কম হয়েছে। মাত্র ৭৫ হাজার চালকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অথচ মামলা হওয়ার কথা কমপক্ষে ১৮ লাখ।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলন শেষ। ট্রাফিক সপ্তাহও শেষ হয়ে গেছে ১৪ আগস্ট। তারমানে এখন আমরা স্বাধীন। আমরা আবার দাপিয়ে বেড়াতে পারবো রাজপথ, যা ইচ্ছা তাই করতে পারবো। লাইসেন্স লাগবে না, ফিটনেস লাগবে না, ফুটওভার ব্রিজ লাগবে না, জেব্রা ক্রসিং লাগবে না। সড়ক হয়ে উঠবে আমাদের যেমন ইচ্ছা তেমন করার মাঠ।

শিক্ষার্থীদের আন্দোলন বা টক শো’র মিষ্টি মিষ্টি কথা আর উপদেশমূলক লেখায় কাজ হবে না। কঠোর আইন বানিয়েও কাজ হবে না। রাস্তায় শৃঙ্খলা ফেরাতে, সড়ক নিরাপদ করতে চাই আইনের কঠোর প্রয়োগ। আইন বানানো সহজ, প্রয়োগ করা কঠিন। এই আমাকে ক্যান্টনমেন্টের ভেতরে নিয়ে যান। আমি সব নিয়মকানুন মেনে, গতিসীমা মেনে গাড়ি চালাবো। আবার এই আমি জাহাঙ্গীর গেট থেকে বেরুলেই রাস্তার রাজা বনে যাবো। আমরা সবাই শক্তের ভক্ত, নরমের যম।

ক্যান্টনমেন্টে যদি সারাবছর সবাই আইন মেনে চলতে পারে, বাইরে পারবে না কেন? বাইরেও পারবে, যদি জানে, আইন ভাঙলেই শাস্তি হবে। শাস্তির ভয়ে কেউ লাইসেন্স ছাড়া রাস্তায় নামবে না, ফিটনেস না থাকলে গাড়ি বের করবে না, উল্টোপথে যাবে না, ট্রাফিক আইন ভাঙবে না। কিন্তু আমরা জানি, ট্রাফিক সপ্তাহের কড়াকড়ি শেষ। এখন সব চলবে ঢিমেতালে। ট্রাফিক পুলিশের পকেটে কিছু গুজে দিয়ে মিষ্টি হেসে পার পাওয়া যাবে। কিন্তু আমরা নিরাপদ সড়ক চাই, রাজপথে শৃঙ্খলা চাই। তাই চাই আমাদের বিরুদ্ধে আইনের কঠোর প্রয়োগ।

আমার লাইসেন্সের মেয়াদ গত এপ্রিলে ফুরিয়েছে। ফুরিয়েছে যে সেটা টের পেয়েছি, শিক্ষার্থীদের আন্দোলনের সময়। এমনিতে লাইসেন্স সঙ্গেও রাখতাম না। আন্দোলনের সময় লজ্জার ভয়ে লাইসেন্স বের করে দেখি মেয়াদ নেই। এখন আমি মেয়াদোত্তীর্ণ লাইসেন্স দিয়েই ধুমসে গাড়ি চালাচ্ছি। কিন্তু আমি শিক্ষার্থীদের যতটা ভয় পেতাম, ট্রাফিক সপ্তাহে যতটা অস্বস্তি হতো; আমি চাই সারাবছর ততটা ভয় বা অস্বস্তি থাকুক মনে। আমি যেন মেয়াদোত্তীর্ণ লাইসেন্স দিয়ে একদিনও গাড়ি চালাতে না পারি। তবে যারা আইন মেনে চলবেন, তাদের যেন হয়রানি করা না হয়। নিছক মামলার টার্গেট পূরণ করার জন্য যেন ছুতোনাতায় মামলা দেওয়া না হয়। আমি চাই সারাবছর ট্রাফিক সপ্তাহ থাকুক। ১০ দিনে সপ্তাহ হতে পারলে, ৩৬৫ দিনে সপ্তাহ হতে দোষ কী?

লেখক: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ