প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বিএনপি ক্ষমতায় গেলে সরকারপ্রধান কে হবেন?

তারেক মামুন : দেশের চলমান সব রাজনৈতিক ইস্যুকে অন্তর্ভুক্ত করে জাতীয় ঐক্যের রূপরেখা চূড়ান্ত করা হয়েছে। সব কিছু ঠিক থাকলে আগামী ২২ সেপ্টেম্বর রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সমাবেশ থেকে জাতীয় ঐক্যের ঘোষণা আসতে পারে। ঐক্য প্রক্রিয়ার ব্যানারে এক মঞ্চে উঠতে পারেন বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা।

বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়াসহ সব রাজনৈতিক নেতাকর্মীর মুক্তি, নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে নির্বাচন, তার আগে জাতীয় সংসদ ভেঙে দেওয়া, নির্বাচনের সময়ে নির্বাহী ক্ষমতা দিয়ে সেনাবাহিনী মোতায়েন, নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠন, বিরোধী রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের নামে সব রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহার, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ, নির্বাচনে ইভিএম পদ্ধতি বাতিল, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা, নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর বিরোধী নেতাকর্মীদের নামে নতুন মামলা ও গ্রেফতার অভিযান বন্ধসহ আরও বেশ কয়েকটি ইস্যুতে এই রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে। বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের প্রধান শরিক জামায়াতে ইসলামীকে এই ঐক্য প্রক্রিয়ার বাইরে রাখা হয়েছে।

আগামী ২২ সেপ্টেম্বর রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে আয়োজিত সমাবেশে এই রূপরেখা তুলে ধরা হবে। গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন এই সমাবেশের ডাক দিয়েছেন। সমাবেশের প্রস্তুতি হিসেবে তার বাসায় গত বুধবার এক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সমাবেশ থেকে কী ঘোষণা দেওয়া হবে, সমাবেশে কাদের আমন্ত্রণ জানানো হবে- এ বিষয়গুলো চূড়ান্ত করা হয়। পাশাপাশি দেশের সর্বশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি নিয়ে আলোচনা করেন ঐক্য প্রক্রিয়া ও গণফোরাম নেতারা।

ঐক্য প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে গতকাল রাত ১০টার দিকে বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বিকল্পধারা বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট অধ্যাপক বদরুদ্দোজা চৌধুরীর বাসায় তার সঙ্গে একান্তে বৈঠক করেন।

এ বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন বলেছেন, বৃহত্তর ঐক্যের বিষয়ে সরকারের বাইরে থাকা দলগুলোর সঙ্গে আলোচনা চলছে। কথা হয়েছে, গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার ও ভোটের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য তারা ভূমিকা রাখবেন, ঐক্যবদ্ধ হবেন।

বিএনপি দলীয় সূত্র জানায়, দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে যাওয়ার আগে ৩ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাহী কমিটির সভায় তিনি জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানিয়েছিলেন। এরই ভিত্তিতে সরকার ও ১৪ দলীয় মহাজোটের বাইরে থাকা বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে ঐক্য গড়ে তোলার প্রচেষ্টা শুরু করেন দলটির সিনিয়র নেতারা। এ প্রচেষ্টার ধারাবাহিকতায় একাদশ সংসদ নির্বাচনের আগে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের বাইরে জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা হচ্ছে। যার রূপরেখাও চূড়ান্ত করা হয়েছে। কৌশলগত কারণে জাতীয় ঐক্যের প্রক্রিয়ায় বিএনপি ২০ দলীয় জোটগতভাবে অংশ নেয়নি। কারণ জোটগতভাবে এগোলেই প্রধান শরিক জামায়াতের ব্যাপারে প্রশ্ন তুলবেন দেশের অন্যান্য প্রগতিশীল দল ও সংগঠনের নেতারা। তাই জামায়াতকে বাইরে রেখে এই জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলা হচ্ছে।

এ বিষয়ে নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না বলেন, বৃহত্তর ঐক্য এখনও চূড়ান্ত হয়নি। তবে এ মাসেই এর কাজ অনেকটা এগোবে। এর বেশি কিছু তিনি বলতে রাজি হননি।

এ প্রসঙ্গে গণফোরামের নির্বাহী সভাপতি অ্যাডভোকেট সুব্রত চৌধুরী বলেছেন, জাতীয় ঐক্যের বিষয়ে অনেকদিন ধরেই আলোচনা চলছে। জামায়াতকে বাদ দিয়ে তারা অভিন্ন কর্মসূচি নিয়ে কাজ করছেন। তাদের সমাবেশ থেকে জাতীয় ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরা হবে। তবে এখন পর্যন্ত চূড়ান্ত কিছু করা হয়নি।

তবে বিএনপি সূত্র জানায়, সব রাজনৈতিক দলের মতামত নিয়ে বিএনপির নীতিনির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির নেতারা গত শনিবার ও সোমবার দফায় দফায় বৈঠক করে এই রূপরেখা চূড়ান্ত করেন। রাজধানীর গুলশানে দলের চেয়ারপারসনের রাজনৈতিক কার্যালয়ে এই বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।

জাতীয় ঐক্যের রূপরেখার বিষয়ে বিএনপির স্থায়ী কমিটির কয়েকজন সদস্য জানান, রূপরেখা তৈরির আগে তারা কয়েক দফায় বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এসব বৈঠকে যেসব বিষয়ে নেতারা ঐকমত্য পোষণ করেছেন সেগুলোকেই রূপরেখায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ সব রাজনৈতিক নেতাদের মুক্তির দাবিকে প্রধান ইস্যু করা হয়েছে রূপরেখায়। এতে কোটা সংস্কার আন্দোলনসহ নিরাপদ সড়কের দাবির আন্দোলনে গ্রেফতার শিক্ষার্থীদের মুক্তির দাবিও করা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে বিএনপির একজন নেতা বলেন, খালেদা জিয়া শুধু বিএনপির নেত্রী নন, তিনি দেশের সিংহভাগ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করেন। গণতন্ত্রের জন্য আজ তিনি কারাগারে রয়েছেন বলে মনে করছে দেশের সব রাজনৈতিক দল। তাদের মধ্যে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল-জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব বিএনপি নেতাদের জানিয়েছেন, খালেদা জিয়া একক দলের নন। তিনি সবার নেত্রী। তাই এই ইস্যুকে প্রাধান্য দিয়ে সব রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের জাতীয় নির্বাচনের আগে মুক্তি দেওয়ার দাবি জানান তিনি। অন্যান্য দলের নেতারাও এই ইস্যুতে একমত পোষণ করেছেন বলে বিএনপির ওই নেতা জানান। জাসদ সভাপতি আ স ম আবদুর রবের ফোন বন্ধ পাওয়ায় এ বিষয়ে তার কোনো মন্তব্য জানা যায়নি।

বিএনপির আরেকজন নেতা জানান, নির্বাচনকালীন নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থার দাবি এখন আর শুধু বিএনপির একার নয়। এটা সব রাজনৈতিক দলের দাবি। আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার অধীনে নির্বাচনে যাওয়া আর রাজনৈতিকভাবে আত্মহত্যা করা তাদের কাছে একই বিষয়। এইজন্য তারা নিরপেক্ষ সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচনকে প্রাধান্য দিয়েছেন। আর সবার জন্য নির্বাচনী লেভেল প্লেয়িং ফিল্ড নিশ্চিত করার জন্য নির্বাচনের আগে জাতীয় সংসদ ভেঙে দিতে হবে। নির্বাচনে সবার সুযোগ নিশ্চিত করার জন্য নির্বাহী ক্ষমতা দিয়ে সেনাবাহিনী মোতায়েনের দাবিও করছেন তারা।

দেশে গত পাঁচটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনে পক্ষপাতমূলক আচরণ স্পষ্ট হওয়ায় নির্বাচন কমিশন পুনর্গঠনের দাবিও জাতীয় ঐক্যের রূপরেখায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একইসঙ্গে নির্বাচনে ইভিএম পদ্ধতি বাতিলের দাবিকেও তারা জোরালো করেছেন।

নির্বাচনী পরিবেশ সৃষ্টি আর ভোটারদের আস্থা ফিরিয়ে আনার জন্যই বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীদের নামে সব রাজনৈতিক মামলা প্রত্যাহারের দাবি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে রূপরেখায়। নির্বাচনের আগে দেশের সংবাদ মাধ্যমের স্বাধীনতা নিশ্চিত করার দাবিও রয়েছে রূপরেখায়। সেল্কম্ফ সেন্সরশিপের অভিযোগ থেকে গণমাধ্যমকে মুক্ত করার জন্য এই দাবি করা হয়েছে। এরকম আরও বেশ কয়েকটি জাতীয় ইস্যুকে গুরুত্ব দিয়ে রূপরেখা তৈরি করা হয়েছে।

এই রূপরেখা প্রণয়নের সঙ্গে জড়িত একজন বিএনপি নেতা জানান, জাতীয় ঐক্য গড়ে তোলার সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য তারা কয়েকভাগে বিভক্ত হয়ে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে কয়েক দফা বৈঠক করেছেন, মতবিনিময় করেছেন। গণফোরাম সভাপতি ড. কামাল হোসেন, বিকল্পধারা বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী, তার ছেলে মাহী বি চৌধুরী, জেএসডি সভাপতি আ স ম আবদুর রব, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সভাপতি বঙ্গবীর কাদের সিদ্দিকী, নাগরিক ঐক্যের আহ্বায়ক মাহমুদুর রহমান মান্না ছাড়াও ডান-বাম সব ধরনের রাজনৈতিক দল ও সুশীল সমাজের নেতৃস্থানীয়দের সঙ্গে তারা বৈঠক করেছেন। পৃথক পৃথকভাবে কয়েক দফায় তারা এই বৈঠক করেন।

এর মধ্যে বিকল্পধারা বাংলাদেশের প্রতি ইঙ্গিত করে বিএনপির এ নেতা জানান, এই দলটির প্রত্যাশার মাত্রা অনেক বেশি। এ কারণে বি চৌধুরীর পাশাপাশি তার ছেলে মাহী বি চৌধুরীর সঙ্গেও তাদের বৈঠক করতে হয়েছে। এসব বৈঠকে তাদের কাছে মনে হয়েছে, ক্ষমতায় যেতে পারলে বিএনপির পক্ষ থেকে বি চৌধুরীকে পুনরায় রাষ্ট্রপতি করার নিশ্চয়তা চাইছে তারা। বিকল্পধারার এ মনোভাব বুঝতে পারলেও বিএনপি তাতে কোন সায় দেয়নি বলে জানান ওই নেতা। আবার আরেকটি বৈঠকে বিকল্পধারার পক্ষ থেকে প্রশ্ন তোলা হয়, বিএনপি ক্ষমতায় গেলে সরকারপ্রধান কে হবেন? বলা হয়, দলের চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া দুর্নীতির মামলায় দণ্ডিত। সেক্ষেত্রে বিএনপি থেকে না কি দলের বাইরের অন্য কাউকে সরকারপ্রধান করা হবে- তাও জানতে চাওয়া হয়। এসব বিষয়ে বিএনপির অনেক নেতা বিরক্ত হলেও জাতীয় ঐক্যের স্বার্থে বিষয়গুলো এড়িয়ে গেছেন। তবে দুই দলের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক রয়েছে। উৎসঃ সমকাল

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত