প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

দুঃখ-কষ্টে ওদের ৪৩ বছর

সাঈদুর রহমান রিমন : বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদে গড়ে তোলা প্রতিরোধযুদ্ধে অংশ নেওয়ার অপরাধে (?) আট শতাধিক প্রতিরোধযোদ্ধা সপরিবারে দেশত্যাগে বাধ্য হয়েছেন। চার দশকেও তারা কেউ দেশের মাটিতে ফিরতে পারেননি। এসব প্রতিরোধযোদ্ধা ও তাদের পরিবারের সদস্যরা আসাম ও মেঘালয়ের গহিন পাহাড়ে অবর্ণনীয় অভাব অনটনে জর্জর অবস্থায় দিনাতিপাত করছেন। ৪৩ বছরেও তাদের নির্বাসন জীবনের অবসান ঘটেনি, কোনো সরকারও তাদের ফিরিয়ে আনার উদ্যোগ নেয়নি। বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আনন্দ-উল্লাসকারীরা দেশত্যাগী এই বীরযোদ্ধাদের ভিটেমাটি, সহায়-সম্পদ ইতিমধ্যে জবরদখল করে নিয়েছে। তারা প্রতিরোধযোদ্ধাদের আত্মীয়-স্বজনদের পর্যন্ত বিতাড়িত করেছে নিষ্ঠুর বর্বরতায়। দেশের উত্তর-পূর্ব সীমান্তের গারো পাহাড়বেষ্টিত উপত্যকার অধিবাসীদের নানা বীরত্বপূর্ণ ভূমিকার গল্পগাথা ছড়িয়ে আছে ইতিহাসের পাতায় পাতায়। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনকালের বিভীষিকা, হাজং বিদ্রোহ দমনে রাজকীয় বাহিনীর সীমাহীন অত্যাচার-নির্যাতন, ’৬৪ সালের সাম্প্রদায়িক দাঙ্গাসহ ’৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর নির্বিচার হত্যাকাণ্ডেও গারো পাহাড়বাসীকে দেশত্যাগে বাধ্য করা যায়নি। অব্যাহত নিপীড়ন-নির্যাতনের মুখেও তারা লাল মাটি আঁকড়ে থেকেছেন মাতৃভূমিতেই। অথচ সেই লড়াকু মানুষজনই পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ করে নিজেদের বাপ-দাদার ভিটেমাটিতেও টিকে থাকতে পারেননি।

বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ করায় তাদের ওপর নেমে আসে সীমাহীন প্রশাসনিক অত্যাচার, খুনি মোশতাক চক্রের দোসররাও মেতে ওঠে ঘৃণ্য জিঘাংসায়। তারা প্রতিরোধযোদ্ধাদের বাড়িঘরে হামলা চালায়, লুটে নেয় সর্বস্ব। তাদের নিরপরাধ স্বজন-পরিজনরা পর্যন্ত নির্মম অত্যাচার থেকে রেহাই পাননি। যারা বঙ্গবন্ধু হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় আনন্দ মিছিল করেছে, মিষ্টি বিতরণ করেছে-তারাই রাতারাতি প্রতিরোধযোদ্ধাদের বাড়িঘর, ভিটে-মাটি, ফসলি জমি সবকিছুই জবরদখল করে নিয়েছে। উপায়ন্তরহীন অবস্থায় প্রতিরোধযোদ্ধাদের পরিবার এমনকি তাদের আত্মীয়-স্বজনরাও জীবন বাঁচাতে দেশ ছেড়ে পালিয়ে যেতে বাধ্য হন। তারা গারো পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে যান ভারতের আসাম কিংবা মেঘালয়ে। সেখানেও তাদের নিশ্চিত আশ্রয় জোটেনি, মেলেনি দুবেলা খাবারের নিশ্চয়তা। আজও তারা সে াতের শ্যাওলার মতো ঘুরে বেড়ান এক স্থান থেকে অন্য স্থানে, জীবিকার সন্ধানে-বেঁচে থাকার আশায়। কারও ভাগ্যে স্থায়ী ঠিকানা পর্যন্ত জোটেনি।

গারো পাহাড়ের অদূরে সুনামগঞ্জ জেলার ধর্মপাশা থানায় হাওরবেষ্টিত গ্রাম বাঙ্গালভিটা ছিল প্রতিরোধযোদ্ধাদের শক্তিশালী ঘাঁটি। গ্রামের ৬২টি আদিবাসী পরিবারই ছিল মুজিব ভক্ত। ফলে বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদকারী বীরযোদ্ধাদের অবাধ বিচরণ, অবস্থান ছিল বাঙ্গালভিটায়। প্রতিরোধযুদ্ধ শেষ হতেই গ্রামটির ওপর নিদারুণ আক্রোশ নেমে আসে। অব্যাহত নিপীড়ন-নির্যাতন, জবরদখল, লুটপাটের মুখে বাঙ্গালভিটার সবগুলো আদিবাসী পরিবারকে উচ্ছেদ করা হয়, তাদের দেশত্যাগেও বাধ্য করা হয়। কাইতাকোনার এলিন সাংমা, বাঙ্গালভিটার সুদন হাজং, সুবোধ হাজংদের মতো বীরযোদ্ধারাও গ্রামে টিকে থাকতে পারেননি। পরিবার পরিজন নিয়ে সীমান্তের ওপারে দুর্গম পাহাড়-জঙ্গলেই তাদের ঠাঁঁই নিতে হয়েছে। বাংলাদেশে একেকটি পরিবারের বিঘার পর বিঘা জায়গা জমি রয়েছে, অথচ ভিনদেশে তাদেরই বেঁচে থাকতে হচ্ছে অন্যের জমিতে পাইট খেটে। একইভাবে নেত্রকোনা কলমাকান্দার বরুয়াকোনা গ্রামের প্রতিরোধযোদ্ধা সিলি নাফাক, আশুতোষ কুবি, ইনর নংমিনসহ ১৫টি পরিবারকে রাতের অন্ধকারে সব ফেলে সীমান্ত পেরিয়ে জীবন বাঁচাতে হয়েছে। ময়মনসিংহের হালুয়াঘাট থানার সীমান্তবর্তী বারোমারী এলাকার অলিং ম্রং, বরুন ম্রং, অনুকূল রেমাসহ ১১ জনকেও বেছে নিতে হয়েছে নির্বাসনের জীবন। হালুয়াঘাটের গোবরাকুড়ায় প্রভাবশালী আদিবাসী পরিবার বলতে বরাবরই উঠে আসে প্রবোধদিওর নাম। পঁচাত্তরে কাদের সিদ্দিকীর নেতৃত্বে প্রতিরোধযুদ্ধের প্রথম ডিফেন্স ক্যাম্পটিও গড়ে উঠে প্রবোধদিওর টিলা বাড়িতেই। সেখানে সেনাবাহিনী, বিডিআর ও পুলিশের সঙ্গে প্রতিরোধযোদ্ধাদের ভয়াবহ সম্মুখযুদ্ধ হয়। টানা তিন রাত তিন দিন এ যুদ্ধে মুহুর্মুহু গুলি-বোমার বিস্ফোরণে গোটা এলাকা প্রকম্পিত হয়ে ওঠে। যুদ্ধে দুই পক্ষেরই প্রচুর ক্ষয়ক্ষতি হয়। এ যুদ্ধের খবর বিবিসিসহ আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে। ফলে বিশ্ববাসী প্রথমবারের মতো জানতে পারে যে, ‘জনতা’ বঙ্গবন্ধু হত্যাকারীদের প্রতিরোধ শুরু করেছে। সেই গৌরবদীপ্ত ইতিহাসের অংশীদার হয়েও প্রবোধদিও দেশে টিকে থাকতে পারেননি। পঁচাত্তর-পরবর্তী সময় থেকে তাকেও মেঘালয়ের পাহাড়-বনে নির্বাসনের দুর্বিষহ যন্ত্রণা বয়ে বেড়াতে হচ্ছে।

শুধু প্রবোধদিও একাই নন, তার গ্রাম গোবরাকুড়াসহ আশপাশ এলাকার ২৬ পরিবারের শতাধিক নর-নারী সহায়সম্পদ সব ফেলে রেখে ভারতে পাড়ি জমাতে বাধ্য হন। প্রতিরোধযোদ্ধা দীপু সাংমারও ঠাঁই হয়নি বঙ্গবন্ধুর বাংলায়। সহযোদ্ধা সুনামগঞ্জ তাহেরপুর থানার শরীফপুরের অজিত তালুকদার, দেবল সরকারসহ ৯ পরিবারের সদস্যরাও ৪০ বছর ধরেই আসামের গোহাটিতে নির্বাসন জীবন কাটাচ্ছেন। দুর্গাপুরের আরেক প্রতিরোধযোদ্ধা দিবস ম্রং নির্ঝঞ্ঝাট বসবাসের আশায় পৈতৃক ভিটেমাটি ফেলে টিকরিখিলা এলাকায় বাড়ি বানিয়েছিলেন। কিন্তু সেখানেও তাকে স্বাভাবিক জীবন-যাপনের সুযোগ দেওয়া হয়নি। দুর্বৃত্তরা হামলা চালিয়ে তার টিকরিখিলার বাড়িটিও দখল করে নেয় এবং দিবসকে সপরিবারে দেশ ছাড়তে বাধ্য করা হয়। উপায়ন্তরহীন অবস্থায় জীবন বাঁচাতে দিবস ম্রং মেঘালয়ে পাড়ি জমান। সেখানে তুরা এলাকার গহিন জঙ্গলে ডেরা তুলে কোনোরকমে বেঁচে আছেন তিনি। তার আশপাশেই অস্থায়ী ডেরা তুলে বছরের পর বছর অবহেলায় চরম দুরবস্থায় জীবন কাটাচ্ছেন ক্লেমেন, সুখাই, হেস্টিনসহ আরও অর্ধশতাধিক প্রতিরোধযোদ্ধা ও তাদের পরিবার। আসাম ও মেঘালয়ের বিভিন্ন দুর্গম জনপদে আট শতাধিক প্রতিরোধযোদ্ধা ও তাদের পরিবারের সদস্যরা স্বেচ্ছা নির্বাসন জীবন-যাপনে বাধ্য হচ্ছেন। শুধু বঙ্গবন্ধু হত্যার সশস্ত্র প্রতিবাদ করার কারণেই তাদের দেশছাড়া হতে হয়েছে। বিগত চার দশকেও তাদের খোঁজ নেয়নি কেউ। প্রতিরোধযোদ্ধারা তাদের সেসব সহযোদ্ধাদের সসম্মানে দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারি উদ্যোগ নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন। একই সাথে জবরদখলকারীদের কবল থেকে প্রতিরোধযোদ্ধাদের বাড়িঘর, ফসলি জমিসহ লুটে নেওয়া সহায়সম্পদ উদ্ধারে কঠোর প্রশাসনিক পদক্ষেপ গ্রহণেরও আকুতি জানিয়েছেন তারা।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ