প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কানাডা-সৌদি তিক্ততায় যুক্তরাষ্ট্র

ডঃ শোয়েব সাঈদ, মন্ট্রিয়ল : তিন যুগেরও আগে স্কুলে পড়ার সময় বাড়ির মসজিদে দুই উকিল মুরব্বির সৌদি আরবকে নিয়ে ঝগড়াটি এখনো মনে পড়ে। এক উকিল সাহেব বলছিলেন “আমাদের কেবলা ওদের দিকে আর ওদের কেবলাতো আমেরিকার দিকে”। এই কথায় রেগে গিয়ে সৌদি ভক্ত আরেক উকিল সাহেব বললেন “ওদের নিয়ে বাজে কথা বলবেন না, ওদের কুত্তাটাও আমাদের কাছে সন্মানের পাত্র। সৌদি আরবকে নিয়ে নানা বিষয়ে এই বচসা বহু বছর ধরেই চলে আসছে; বাংলাদেশের এক মফস্বল শহর থেকে পশ্চিমা বিশ্বের তুখোড় কূটনৈতিক/রাজনীতি বিশ্লেষকদের ফর্মাল মিটিং বা ব্যক্তিগত আড্ডা সর্বত্রই। এর অতি সাম্প্রতিক এপিসোডটি হল কানাডা-সৌদির বর্তমান কূটনৈতিক লড়াই।

কানাডায় বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর সাথে সংযুক্ত হাসপাতাল বা অন্যান্য বড় বড় হাসপাতাল থেকে যারা সেবা গ্রহন করে থাকেন তাঁরা একটু খেয়াল করলে দেখবেন মিডেল ইস্টার্ন/আরবীয় চেহারার অনেক ডাক্তার রোগীদের সেবা দিয়ে যাচ্ছেন। তাঁদের একটি বড় অংশ সৌদি আরবের। শুধু ডাক্তার নয়, সৌদি শিক্ষার্থীদের প্রচুর আনাগোনা কানাডায়। দ্বিপাক্ষিক যুক্তি, ডোনেশন ইত্যাদি নানা পন্থায় কানাডিয়ান মেডিক্যাল সিস্টেমে সৌদিরা অনেকটা ক্যাশকাউয়ের মত। কানাডা-সৌদির চমৎকার এই সম্পর্কে বেশ কিছুদিন যাবৎ টানাপোড়েন চলছিল যা সম্প্রতি ক্লাইমেক্সে পৌঁছেছে সৌদিতে নিযুক্ত কানাডার রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কারের মাধ্যমে।

কেন সম্পর্কের এই অবনতি? সংক্ষিপ্ত উত্তরটি হচ্ছে সৌদি আরবের মানবাধিকার বিষয়ে কানাডার সমালোচনায় সৌদি সরকার ভীষণ ক্ষিপ্ত হয়েছে। ওয়াকিবহাল সুত্র মতে মানবাধিকার নিয়ে পশ্চিমাদের এই সব সমালোচনা হরহামেশাই হয়ে থাকে। ডাবল স্ট্যান্ডার্ডের অভিযোগে অভিযুক্ত পশ্চিমাদের এই অভিযোগের যৌক্তিক ভিত্তি সবসময় যে থাকে তা তো নয়। এমনকি সমালোচনা শুনতে শুনতে অভ্যস্ত হয়ে যাওয়া মধ্যপ্রাচ্যের সরকারগুলো এই সমালোচনা যে আমলে নেন বা পাত্তা দেন তাও নয়। তবে হঠাৎ করে সৌদি সরকার কানাডার সাথে এরকম চরম প্রতিক্রিয়া দেখালো কেন? নেপথ্যে কি কেউ কলকাঠি নাড়ছে? যিনি নাড়ছেন উনি কি কোন কারণে কানাডার উপর অসন্তুষ্ট আর সৌদিদের উপর তাঁর নিশ্চয় ব্যাপক প্রভাব আছে এবং অভিন্ন স্বার্থে উভয়ই এক সূত্রে গাঁথা?

সামারর বাদাউই মূলত একজন সৌদি মানবাধিকা্র/নারী অধিকার কর্মী, যিনি কিছুদিন আগ পর্যন্ত কানাডায় তেমন পরিচিত ছিলেন না। ২০০৮ সালে সামার পিতার কাছ থেকে বিয়ের অনুমতি না পাওয়ায় আর নির্যাতনের কারণে বাড়ী থেকে বের হয়ে যান এবং পিতার অভিভাবকত্ব থেকে মুক্ত হবার জন্যে পিতার বিরুদ্ধে মামলা করেন। তাঁর পিতাও অবাধ্যতার অভিযোগে মামলা করেন। মামলা চলার এক পর্যায়ে সামার নিজেই গ্রেপ্তার হন পিতার অবাধ্য হবার অভিযোগে। এই ঘটনায় ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হলে সামারের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলে নেওয়া হয়। এই বিজয় পরবর্তীতে সামারকে সাহসী করে তোলে। সৌদি নারীদের ভোটাধিকারের জন্যে সামার আইনি লড়াইয়ে নামেন। আইনি লড়াইয়ে হেরে গেলেও পরবর্তীতে কিং আবদুল্লাহ নিজে থেকেই মেয়েদের ভোটের অধিকার দেন। সামার মেয়েদের ড্রাইভিং অধিকারের পক্ষেও ক্যাম্পিং করেন। ২০১২ সালে সামারকে মার্কিন স্টেট ডিপার্টমেন্ট ইন্টারন্যাশনাল উইম্যান অব কারেজ এওয়ার্ড প্রদান করেন। আরেক সৌদি নারী নাসিমা আল সাদাহও একজন নারীবাদী মানবাধিকার কর্মী। ২০১৫ সালে মেয়েদের স্থানীয় নির্বাচনে অংশ নেবার সুযোগে নাসিমা প্রার্থী হন কিন্তু নির্বাচনের একদিন আগে তাঁর প্রার্থিতা বাতিল করা হয়। সামার আর নাসিমা কিছু দিন আগে আবার গ্রেফতার হন। কানাডা এই গ্রেফতারের সমালোচনা করে। গত মে থেকে বেশ কয়েকজন সৌদি নারী মানবাধিকার কর্মী আটক আছেন যাদের অনেকেরই অভিযুক্ত হলে ২০ বছরের জেল হতে পারে। আটক নারী মানবাধিকার কর্মীদের মুক্তির বিষয়ে কানাডার পররাষ্ট্র মন্ত্রী ক্রিস্টিয়া ফ্রিল্যান্ড কথা বলেছেন। কানাডার পররাষ্ট্র মন্ত্রী সবসময়ই মানবাধিকার বিষয়ে কথা বলছেন এবং এতে সৌদিদের অবাক হবার কিছু ছিলনা। সামারের ভাই রাইফ বাদাউই একজন ব্লগার। ২০১২ সালে গ্রেফতার হন এবং ১০০০ বেত্রাঘাত এবং ১০ বছরের কারাদণ্ডে দণ্ডিত হন। রাইফের স্ত্রী একজন কানাডিয়ান এবং কূটনৈতিকদের মতে একজন কানাডিয়ানের পরিবারের সদস্যদের বিষয়ে কানাডার পররাষ্ট্র মন্ত্রীর কথা বলা বা উদ্বেগ প্রকাশ করাটা অপ্রাসঙ্গিক নয়।

তাহলে সৌদিদের এতটা খ্যাপে উঠার কারণ কি? একটি উক্তি আমি প্রায়ই রেফারেঞ্চ হিসেবে ব্যবহার করি সেটি হচ্ছে ১৯৬৯ সালে যুক্তরাষ্ট্র বিষয়ে অটোয়া ন্যাশনাল প্রেস ক্লাবে বর্তমান প্রধানমন্ত্রী জাস্টিন ট্রুডুর পিতা তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী পিয়েরে ট্রুডুর একটি বিখ্যাত উক্তি। পিয়েরে ট্রুডু বলেছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিবেশী হিসেবে থাকাটা হচ্ছে হাতির সাথে ঘুমানো।যত বন্ধুত্ব ভাবাপন্ন বা ভদ্র হওক না কেন প্রাণীটির প্রতিটি আকস্মিক আন্দোলন বা ক্ষুদ্র শব্দেও প্রতিক্রিয়া হবে (এক কথায় অস্বস্তিতে থাকা)। যুক্তরাষ্ট্রের সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে জাস্টিন ট্রুডু সেই বাস্তবতাকেও মনে রেখে চলতে গিয়েও ক্রমাগত হোঁচট খাচ্ছেন ট্রাম্প প্রশাসন বিশেষ করে ট্রাম্প নিজের অসংলগ্ন আর বিদ্বেষি আচরণের জন্যে। নাফটা ইস্যু, বানিজ্য যুদ্ধ ইত্যাদি নিয়ে নিরীহ নিকটতম প্রতিবেশী কানাডার প্রতি এতটা অসংবেদনশীল, অবন্ধুত্বপূর্ণ মার্কিন প্রশাসন বিরল ঘটনাই বটে।

প্রতিবেশী দেশ বা ইউরোপ নয়, ট্রাম্পের প্রেসিডেন্ট হিসেবে প্রথম বিদেশ সফরটি ছিল সৌদি আরব। ২০১৭ সালের মে মাসের সফরে নজীরবিহীন সম্বর্ধনায় ভীষণ তুষ্ট ট্রাম্প। তখন থেকেই ট্রাম্প ইয়েমেন সঙ্কটে সৌদির একচেটিয়া সমর্থক। ইয়েমেন নিয়ে ইউরোপ আর কানাডার উদ্বেগী অবস্থার বিপরীতে যুক্তরাষ্ট্রের ফুরফুরে অবস্থান মানবতার প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের ক্রমশ সংবেদনহীনতার অন্যতম উদাহরণ। উক্ত সফরে ট্রাম্প সৌদিদের সাথে ১১০ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র আর বিনিয়োগ চুক্তি স্বাক্ষর করে। এর বিপরীতে কানাডার ১৫ বিলিয়ন ডলারের হাল্কা সমরযানের চুক্তিটি ভীষণ বিতর্কের মধ্যে পড়ে ইয়েমেন যুদ্ধের কারণে। এতে সৌদি সরকার বিব্রত হয়।

সবকিছুকে ছাড়িয়ে বড় সমস্যাটি ইরান। বারাক ওবামা ইসরায়েলের পরামর্শ অগ্রাহ্য করেই ইউরোপিয়ানদের পূর্ণ সমর্থনে ইরানের সাথে একটা সমঝোতা/বোঝাপড়া চেয়েছিলেন। অন্যদিকে ওবামার ভাষায় সৌদিদের সাথে সম্পর্ক ছিল জটিলতাপূর্ণ। ট্রাম্প ওবামার বিপরীত পথে হাঁটতে গিয়ে সৌদিদের কাছে টানলেন আর ইরানের প্রতি একক সিদ্ধান্তে খড়গ হস্ত হলেন। ইরান নিয়ে কানাডার অবস্থান ইউরোপিয়ানদের সাথে সংগতিপূর্ণ। চিরশত্রু ইরানের প্রতি কানাডার এই অবস্থান সৌদিদের ভীষণ অপছন্দ। কানাডা আর জাস্টিন ট্রুডুর প্রতি ট্রাম্পের বিরূপ আচরণ সম্পর্কে সৌদি সরকার অবহিত। এই বিষয়টি মানবাধিকার কর্মীদের নিয়ে কানাডার গতানুগতিক মন্তব্যে সৌদিদের কানাডার রাষ্ট্রদূতকে বহিষ্কার করা সহ কড়া প্রতিক্রিয়া দেখাতে উৎসাহিত করে থাকতে পারে। রিয়াদে নিযুক্ত কানাডার রাষ্টদূত ডেনিশ হোরাক একজন ক্যারিয়ার ডিপ্লোমেট। বিরল হলেও ডিপ্লোমেটরা সাধারণত বহিষ্কারের মত পরিস্থিতির জন্যে প্রস্তুত থাকেন। তবে ডেনিশ হোরাক একটু বেশীই আনলাকী। ২০১২ সালে ইরানের সাথে কানাডার সম্পর্ক ছিন্ন করার সময় ডেনিশ হোরাকই ইরানে কানাডার হেড অফ মিশন ছিলেন।

কানাডা-সৌদিদের এই তিক্ততায় যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্টের ভূমিকা ধোঁয়াটে। যুক্তরাষ্ট্র অনেকটাই নীরব। উভয় দেশকে বন্ধুপ্রতীম বললেও কানাডার পক্ষে অবস্থান নিতে অস্বীকার করেছে। স্টেট ডিপার্টমেন্ট থেকে জানানো হয় কানাডা-সউদির এই টানা পোড়েনে যুক্তরাষ্ট্রের জড়িত হতে অনিচ্ছুক। অভিযোগ উঠতে শুরু করেছে কানাডার বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিক্যাল সিস্টেম সহ সৌদিদের কাছ থেকে প্রাপ্ত নানাবিধ আর্থিক, ব্যবসা বানিজ্যিক কর্মকাণ্ডে দিক পরিবর্তনে কেউ পেছন থেকে ভূমিকা রাখছে কিনা? মিডিয়া সূত্রে প্রকাশ প্রতিবেশী যুক্তরাষ্ট্রের উপর নির্ভর করার চাইতে কানাডা এই সমস্যা নিরসনে সংযুক্ত আরব আমিরাত আর যুক্তরাজ্যের উপর নির্ভর করতে চাইছে। সৌদিদের কানাডার সাথে বাণিজ্য সম্পর্ক স্থগিত করা আর হাজার হাজার সৌদি ছাত্রদের দেশে ফিরে যাবার নির্দেশনার মাঝে কানাডার অর্থমন্ত্রী বিল মরনু কানেডিয়ান ভ্যালুজ অক্ষুণ্ণ রাখা পক্ষে দৃঢ় অবস্থান তুলে ধরেন। সৌদিদের সরবরাহকৃত তেলের বিকল্প ব্যবস্থা হয়তো কানাডা করতে পারবে, তবু আশংকা করা হচ্ছে কুবেক আর আটলান্টিক প্রদেশগুলোর তৈল শোধনাগারগুলো সমস্যায় পরতে পারে। ধর্ম, বর্ণ, জাতি, ভাষা নির্বিশেষে বৈশ্বিক মানবিকতার নেতৃত্বদানকারী কানাডা মনুষ্যত্বের প্রশ্নে দৃঢ়চিত্তে আপোষহীন থাকবে, এটিই কানাডিয়ানদের প্রত্যাশা।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ