প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

একাকিত্ব নয়, একাকী

করভী মিজান : হুমায়ূন আহমেদ যখন হুমায়ূন আহমেদের পরিচিতি পাননি তখন তার বিশ্ববিদ্যালয় আবাসনে ২/৩ বার গিয়েছিলাম। অবশ্য লেখার সিলসিলাতেই গিয়েছিলাম। সেই অর্থে তার সঙ্গে আমার পরিচয় ছিল। চেনা-জানা ছিল না। আর দ্বিতীয় কোনও বাঙালি পুরুষকে দেখলাম না তার মতো লেজেন্ডারি লাইফ লিড করতে। যাই হোক, আমার লেখা হুমায়ূন আহমেদকে নিয়ে নয়। বরং তার এক উক্তিকে নিয়ে শুরু। হুমায়ূন আহমেদ বলেছিলেন, ‘একা থাকা দুর্বলতা নয়। সবাই একা থাকতে পারে না’।

আমার আজকের লেখা পঞ্চাশে নারীদের ‘একা থাকা’ নিয়ে। প্রায়ই আমরা গুলিয়ে ফেলি ‘একা থাকা’ এবং ‘একাকিত্ব’। অথচ দুটোই পুরোপুরি ভিন্ন ব্যাপার। যেমন– একা থাকা আপনার চয়েজ। আপনার সিদ্ধান্ত। আপনার জীবনযাত্রা। কিন্তু ‘একাকিত্ব’ আপনি রুমভর্তি মানুষের বা বন্ধুদের মধ্যে বসেও নিজেকে ভাবতে পারেন। অথবা বিবাহিত হলেও। এবং প্রচুর মানুষ এরকমই ভেবে থাকেন। তাকে বলা যায় ‘লোনলি ফিলিং’। বা তারা ‘লোনার’। ডিভোর্সের পর যখন একা থাকতে শুরু করলাম প্রচণ্ড ভয় আর অনিশ্চয়তা চেপে ধরলো। সেকি! ‘একা’ থাকবো? কী করে থাকবো? কীভাবে সম্ভব? চিন্তায় পড়লাম। বয়স আমার চল্লিশের বেশি তখন। আমার আবার জীবনের বিভিন্ন ডিপার্টমেন্টের বিভিন্ন অ্যাডভাইজার কমিটি বা বন্ধু আছে। ভেবে দেখলাম বেস্ট ফ্রেন্ডদের জিজ্ঞেস করে লাভ নেই। তারা সবাই বিবাহিত এবং সুখী। আমার প্রশ্নের মর্মার্থই বুঝবে না। কাজেই সিনিয়র দুইজনকে জিজ্ঞেস করলাম কয়েক রাতের ঘুম হারাম করার পর। সাংবাদিক ফারুখ ফয়সল বললো ‘রিভি একা থাকার আনন্দ যে কী আনন্দ, থাকো, বুঝতে পারবে’। প্রযোজক-পরিবেশক হাবিবুর রহমান খানকেও ব্রেকফাস্ট টেবিলে একই কথা জিজ্ঞেস করলাম। সে বললো, ‘জীবন আনন্দময় যার মনে যা লয়’। জানি না বাক্য সঠিক কিনা। তবে পরে বুঝতে পেরেছিলাম হাবিব ভাই সব কথাই জীবন আনন্দময় তারপর আরেকটা লাইন যোগ করে দেন।

আসলে মনে যখন থাকে ভয় ও দ্বিধা তখন যে কোনও পজিটিভ কথাই গ্রীষ্মের খাঁখাঁ দুপুরে এক পশলা বৃষ্টির মতো পরম শান্তি ও আরাম দেয়। ভরসা পেলাম। আমি শুরু করলাম একাকী পথ চলা। একা থাকার। স্বামী তো প্রথমেই প্রাক্তন (তাই তো একা পথচলা নিয়ে এত ভাবনা)। এরপর আস্তে আস্তে সন্তানরাও তাদের জীবনে চলার পথে আমাকে একা করে নিজেরাই জীবনে একাকী পথচলা শুরু করে দিলো। আমি রয়ে গেলাম আমার নিজ বাড়িতে। রক্ষী বাসার কাজের মানুষ। সেই পথচলা শুরু একাকী। কিছুদিনের মধ্যে একা থাকার ভয় বাঙালি কনসেপ্ট থেকে নিজেকে মুক্ত করলাম। তারও কিছুদিন পর একা থাকাটা উপভোগ করা শুরু করলাম। পঞ্চাশের আগেই।

বরাবরই আমি স্বাধীনচেতা। সেই ছোটবেলা থেকে আমাকে স্বাধীনতার জন্য মায়ের সঙ্গে তুমুল যুদ্ধ করে নিজের স্বাধীনতা অর্জন করতে হতো। অবশ্য জয়ের পর আব্বুর হাততালি বরাবরই আমার প্রাপ্য ছিল। কিন্তু সেই স্বাধীনতা আর পঞ্চাশে এসে স্বাধীনতার মধ্যে আকাশ-পাতাল তফাৎ। এখন যখন জানি আমি স্বাধীন। যে কিছুই আমি করতে পারি। কারো কাছে কোনও দায়বদ্ধতা নেই। তখন নিজেই নিজের স্বাধীনতাকে conditional করে ফেলি। টিনেজার থাকতে যেমন স্বপ্ন ছিল– যতক্ষণ খুশি রাত কাটাবো বাইরে। পঞ্চাশে এসে নিজেই নিজেকে বলতে হয়– ‘হ্যালো ম্যাডাম বাসায় চলেন। যথেষ্ট হয়েছে’। না, এটা সমাজের ভয়ে নয়। কিংবা বাসায় কেউ দরজা ধরে বা খাবার নিয়ে অপেক্ষা করছে– সেটার জন্যেও নয়। কারণ, কেউ তো নেই এসব করার। কিন্তু এই গায়েবি ডাকটা আসে ভেতর থেকেই। নিজের প্রতি দায়িত্বশীলতাবোধ থেকে। নিজের প্রতি নিজের যত্ন নেওয়ার বোধ থেকে। ভালোবাসা থেকে। আশ্চর্যকর তাই না?

স্যাডিস্টিক কিউরিয়াসিটি
সবচেয়ে বিরক্তিকর প্রশ্ন হচ্ছে– ‘আচ্ছা তুমি কীভাবে একা থাকো? সমস্যা হয় না? ভয় লাগে না? একাকী লাগে না?’ সরি, এরচেয়েও বিরক্তিকর প্রশ্ন হচ্ছে– ‘আচ্ছা তুমি একা থাকো তো বিয়ে করো না কেন? তোমার তো এমন বয়স হয়নি। আবার বিয়ে করো। একা থাকা ঠিক না’। পঞ্চাশে বিয়ে? ওয়েল হোয়াই নট? হতেই পারে। কিন্তু লোকেদের বুঝাতেই পারি না আমার একা থাকাটা আমার চয়েজ। আমার ইচ্ছা। আমার ভালো লাগা। আমাদের সমাজ এখনও একজন নারীর এসব অনুভূতি বুঝতে পুরোপুরি অক্ষম। অবশ্য আজকে অক্ষম। অদূর ভবিষ্যতে হবে সক্ষম। হতেই হবে। কারণ, নারীদের স্ট্যাটাসের এই পরিবর্তন বা বিবর্তন সময়েরই আহ্বান। যুগে যুগে বিবর্তনের মাধ্যমে সমাজ শিখেছে, আগে যা ছিল গর্হিত বা সমাজের চোখে অপরাধ তা আজকের দিনে গ্রহণযোগ্য বা সাধারণ ব্যাপার। এটা বিশ্বজুড়েই। শুধু বাংলাদেশে নয়।

বিরক্তিকর প্রশ্নে ফেরত যাই। এখানে ‘আমি’ বলতে পুরো সমাজে আমি একা নিজের কথা বলছি না। একা থাকা প্রতিটি নারীর অভিজ্ঞতার কথাই বলছি। সবাই যে এই দলে আমার মতো তালাক দিয়ে ‘একা থাকছে’ তা নয় কিন্তু। অনেকে বিয়েই করেনি। অথবা অনেকে স্বামী হারিয়েছে বয়স পঞ্চাশের অনেক আগেই। কিন্তু জীবনে চলার পথে আবার বিয়ে বা আরেক পুরুষের হাত ধরে না চলে নিজের ‘একা থাকার’ জীবনটাকে বেছে নিয়েছে। এই দলের নারীরা কিন্তু সংখ্যায় যথেষ্ট।

আমার বড় মেয়ে চব্বিশে পড়লো। আইন পড়ছে আমেরিকায়। আমাকে পদে পদে সাহস জোগায়। বলে, ‘আম্মু তোমরা যেকোনও ব্যাপারকেই এতো ড্রামাটিক করো কেন? এই দেশে (আমেরিকা) একা থাকাটাই সাধারণ ব্যাপার। কত কিছু করার আছে। জাস্ট এনজয় ইউর লাইফ মা। লোকের কথায় কান দিও না। জীবনে অনেক কষ্ট করেছো। লিভ হ্যাপি। আই এম ভেরি প্রাউড অফ ইউ’। কত সাহসী কথা। ইয়েস, আই এম লিভিং হ্যাপি। কিন্তু তাতেও সমস্যা। সমাজ তো পরে। নিজের আত্মীয়রাই এটা মেনে নিতে পারে না। একা থাকে? তাও আবার হ্যাপি? নো ওয়ে। আপন মা’ই কথা বন্ধ করে দিয়েছিল। কারণ, তার বিশ্বাস নারীর একা থাকা জীবনযাপন ঠিক না। স্বামী থাকা জরুরি। লজ্জায় মুখ দেখানো নাকি সমাজে মুশকিল। অথচ আমার বাবা মারা যাওয়ার আগে তার প্রায় ৮২ বছর বয়সে আমার হাত ধরে বলেছিল, ‘মা তুই আর বিয়ে করিস না। অনেক তো হলো। নিজের ফ্ল্যাট আছে। একা থাক। বাচ্চাদের খবর রাখ। স্বামীর কী দরকার? বৃদ্ধ বয়সে ওই স্বামীর নার্সগিরি করতে করতে জীবন যাবে। বরং একাকী পথ চলতে শুরু কর। তুই পারবি। দেখবি জীবন সুন্দর’। অবাক হই ভেবে, কত আধুনিক চিন্তাশক্তির মানুষ ছিলেন তিনি। ব্রিটিশ আমলে ময়মনসিংহের এক গ্রামে জন্ম নিয়েও পুরো বিশ্ব দেখেছিলেন। ছিলেন বৈমানিক। নিজেকে বদলে ছিলেন। তার তুলনায় এই যুগের সো-কলড মডার্ন পুরুষদের মানসিকতা নপুংশকই বটে! শুধু পুরুষদেরই বা দোষ দেই কীভাবে? যেখানে নারীরাই বাদ সাধে। সাপোর্ট বাদই দিলাম। তাদের তো বোঝেই আসে না। পুরো সমাজটাই এমন। নতুন যেকোনও কিছুতেই ভয়। ব্যতিক্রমও আছে। কিন্তু সংখ্যায় বড়ই নগণ্য। নারীর একা থাকা নিয়ে সমস্যা! বাড়ি ভাড়া নিতে গেলে সমস্যা! গাড়ি চালাতে সমস্যা! ব্যবসায় সমস্যা! একা নারী মাত্রই চারদিকে সমস্যার বাস! বাজি ধরে বলতে পারি, বাঙালি সমাজে একা থাকা পুরুষদের আমাদের নারীদের মতো এসব অর্থহীন প্রশ্নের সম্মুখীন হতে হয় না। তবে আমাদের কেন? এটাকে বাঙালি সমাজের একটা স্যাডিস্টিক কিউরিয়াসিটি ছাড়া আর কী আখ্যা দেওয়া যায়?

সাইনবোর্ড
প্রায়ই কোনও না কোনও দাওয়াতে কোনও না কোনও একজন অযাচিত উপদেশবাণী নিয়ে হাজির হবেন। ‘এই মেয়ে তুমি আর বিয়ে করবে না? নিদেনপক্ষে একটা বয়ফ্রেন্ড রাখো। বুঝলে তো সোসাইটিতে চলতে গেলে একটা সাইনবোর্ড লাগে’। সাইনবোর্ড? ভাবনা শুরু হয়- সেটা কী? মানে আমার পরিচয় কি যথেষ্ট নয়? নারী মানেই লেখা থাকতে হবে– এই দেহের, মনের ও সম্পত্তির ওপর অমুক পুরুষের অধিকার? আমার সন্দেহ হয়, একা জীবন বেছে নেওয়া এবং বিয়ে না করেও কন্যাসন্তান দত্তক নেওয়া বিশ্বসুন্দরী সুস্মিতা সেন বা কিংবদন্তি ফ্যাশন ডিজাইনার সেই সাদা-কালো যুগে একা থাকা ৮০ বছরের কোকো শ্যানেলকেও একই কথা শুনতে হয়েছিল কিনা! তবে আমাদের সমাজে মানসিকতা এমন কেন হবে? একা পথ চলতে গেলে সাইনবোর্ডের প্রয়োজন কেন পড়ছে? তাও এই বয়সে? আমার যদি নিজের পরিচয়সহ সবই থাকে, তবে সাইনবোর্ডটি কোথায় ঝোলাবো? ব্যাপারটি কি হাস্যকর নয়? প্রয়োজন আমাদের মানসিকতার পরিবর্তন। এখন তো প্রায়ই শুনি তরুণীরা ফ্ল্যাট ভাড়া করে ২/৩ জন একসঙ্গে শেয়ার করছে। কেউ চাকরিরত বা স্টুডেন্ট। মন্দ কিছু তো শোনা যায় না। আজকের দিনের মেয়েরা জানে– পুরুষ মানুষ এই আছে এই নেই। কিন্তু যেটা যায় না সেটা হলো তার ক্যারিয়ার। বিপদের বন্ধু। একা থাকা ঢের শান্তি। জীবনসঙ্গীর সঙ্গে সারাক্ষণ খিটির-মিটির বা ‘চিটিংবাজি’ সহ্য করাটাই এক বয়সে অসহ্যকর। জীবন হারাম হয়ে যায়। মানুষ পরিত্রাণ খোঁজে। নারীর সাইনবোর্ড নারী নিজে। অন্য পুরুষের করুণা ভিক্ষা করার সময় গেছে বহু আগেই। পরিবার ও সমাজের প্রয়োজন সাহায্যের হাত বাড়ানোর। দরকার মানসিকতা পরিবর্তনের।

আমার হীরে আমিই কিনবো
সেদিন ‘সোনাটা’ ছবিটা দেখছিলাম। তিনজন সিঙ্গেল নারী। বয়স পঞ্চাশের চেয়ে যথেষ্ট বেশিই। অরুনা, সুভদ্রা এবং দোলন। তিনজনই বেস্ট ফ্রেন্ড। একজন প্রফেসর, একজন ব্যাঙ্কার এবং একজন সাংবাদিক। এক বাড়িতে থাকে। ভাড়া শেয়ারিং। শুধু ভাড়া নয়। নিজেদের চিন্তা-চেতনা, ভালো লাগার মুহূর্ত সব। খুনসুটি, ঝগড়া সবই শেয়ার করছে। স্বামীরা নেই। সন্তানরা নিজের জীবন নিয়ে ব্যস্ত। এমন সমাজে আমরা কি বসবাস করতে পারি না? নিজেদের সম্মান নিয়ে? নিজেদের পরিচয়ে? অপর্ণা সেনের ছবি। তিন নারীর বন্ধুত্ব। তাদের জীবন।
জাতীয় চলচিত্র পুরস্কারপ্রাপ্ত নীনা গুপ্তার কথা মনে আছে কি? ভিভ রিচার্ডের কন্যাসন্তান জন্মদান করে ৯০ শতকে তোলপাড় করে ফেলেছিল? নীনা গুপ্তা কখনই কট্টর সমাজের কথা কানে নেয়নি। ৬২ বছরে এসে গর্বের সঙ্গে নীনা বলছেন– ‘নিজেকে অনেক গর্বিত মনে করি। এই বয়সেই আমি ফিল্মে ফিরে আসবো। সো হোয়াট? আমি তো মরে যাইনি। আমি ফিট, দেখতে ভালো এবং এখনও অভিনয় পারি। সো হোয়াই নট?’ এই হলো আত্মবিশ্বাস। ৬২ বছর বয়সেও। এবং এটাই চালিকা শব্দ একা জীবন শুরু করার। জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত এবং চারবার ফিল্মফেয়ার পুরস্কারপ্রাপ্ত কঙ্কনা সেন শর্মা একা থাকেন মুম্বাই শহরে। ব্রিলিয়ান্ট এই অভিনেত্রীর মাত্র ৩৮ বছর বয়স এবং সিঙ্গেল মা। পদ্মশ্রী এবং ফিল্মফেয়ার পুরস্কারপ্রাপ্ত ৪৭ বছরের টাবু তার একা থাকার জীবন নিয়ে খুব সরলভাবেই জবাব দেন– ‘আমি এখন মান্ডালা পেইন্টিং শেখা নিয়ে ব্যস্ত’। অর্থাৎ এই বিষয় নিয়ে কথা বলাটাই অর্থহীন মনে করেন টাবু। বিশ্বসুন্দরী সুস্মিতা সেন তার একাকী পথচলায় দারুণ সুখী। সোজাসাপ্টা উত্তর দিয়ে দেন– ‘হীরে কেনার জন্য আমার জীবনে পুরুষের প্রয়োজন নেই। হীরে আমি নিজেই নিজের জন্য কিনতে পারি’।

জিলাপির প্যাঁচ
আমরা বাঙালি তো। জিলাপি খুব প্রিয়। কাজেই সবকিছুতেই খুঁজি জিলাপির প্যাঁচ। আমি বলছি না যে স্বামী-সংসার-সন্তান সব ফেলে একা থাকার স্লোগান দিতে। কিন্তু বাই চয়েজ যারা একা থাকছেন তাদের জীবনটাতে জিলাপির প্যাঁচ লাগানোর দরকারটা কী? একা থাকা মানে বাসায় বসে চোখের জলে ভিজে ডিপ্রেশন নয়। বরং হতেই পারে এর উল্টোটা। পরিবার-বন্ধু-সমাজের সঙ্গে কানেকটভিটি, দায়িত্বশীলতাবোধ, সংবেদনশীলতা, পার্টিসিপেশন এসব বেশি হতেই পারে। পঞ্চাশেই। নেশা করা নয়। বরং এই বয়সে নিজের প্রতি যত্নশীলতা বাড়ে। কারণ, মরে পড়ে থাকলে কেউ যে দেখার নেই। নিজের শখগুলো নাড়াচাড়া করার সুযোগ আসে। তা পঞ্চাশেই হোক। এই যেমন আমি বহু বছর পর আবার কলম-কাগজ নিয়ে ঝামেলা করছি। স্কুলজীবনের ছবি আঁকাটাও আবারো শুরু করবো ভাবছি। বাই দ্য ওয়ে আমার এক বন্ধুর ক্যানভাস-রংতুলি কেনার কথা। তার কোনও খবরই নেই। কল করা দরকার। বিদেশি ভাষা শেখার কথাও ভাবছি। আমার বড় মেয়ে ফ্লুয়েন্ট ফ্রেঞ্চ বলে। ছোটটা স্প্যানিশ। আমি হিন্দিতে আধাকাঁচা। তাও হিন্দি ছবির কল্যাণে। কাজেই ভাবছি বিদেশি একটি ভাষা রপ্ত করা দরকার। ফ্রেঞ্চ না ইতালীয় সেটাই ভেবে ঠিক করতে পারছি না। এমনকি মিলানি ট্রাম্পও পাঁচটি ভাষায় কথা বলতে পারেন। অনেকেই ডিএসএলআর হাতে তুলে নিয়েছে। কেউবা সোশ্যাল ওয়ার্ক। ট্রাভেলিংওবা নয় কেন? পঞ্চাশে স্বপ্ন দেখা শুরু হতেই পারে। ডিপ্রেশন নয়। সবকিছুতেই জিলাপির প্যাঁচ থাকে না।

সিল্ক স্মিতা বা মেরিলিন মনরো নয়
সিল্ক স্মিতা বা মেরিলিন মনরো উদাহরণ নয়। জানি এই দুই তারকার কেউই পঞ্চাশের কাছাকাছি ছিলেন না। কিন্তু বেহিসেবী জীবন, মাদক, ডিপ্রেশন, পুরুষদের ছলনায় জীবনে হার মেনেছিলেন স্বেচ্ছায় মৃত্যুকে বেছে নিয়ে। এরা সংখ্যালঘু। সেই যুগের কট্টর সমাজ যদি তাদের সাহায্যে হাত বাড়াতো, হয়তো তাদের হারাতে হতো না।
নেগেটিভ কোনও কিছু উদাহরণ হতে পারে না। আবারো পঞ্চাশে যদি ফিরে যাই। সত্তর দশকের পুরুষদের হৃদয় কাঁপানো আজকের ৬৯ বছরের ডিম্পল কাপাডিয়া বলেছেন, ‘আমি সুখী এবং তৃপ্ত, আমার আবার বিয়ে করতে হবে কেন?’ হলিউডের সুপারহিট নায়িকা/ সেক্স-সিম্বল শ্যারন স্টোন ৫৪ বছর বয়সে একা এবং সুখী। আফ্রিকায় ২৮টি স্কুল তৈরি করেছেন শিশুদের জন্য। ক্যানসার সারভাইভার শ্যারন এই বয়সেও হার্পার বাজার ম্যাগাজিনে ছবি তুলেছেন। ক্যানসারও তাকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। শ্যারন বলেন, ‘আমি ভালোবাসি আমার ক্যারিয়ার। আমার জীবন, আমার পরিবার (বাচ্চারা)। এমনকি আমি সেসব মানুষকে ভালোবাসি, যারা আমাকে মাটির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছিল। কারণ, তারাই আমার শ্রেষ্ঠ শিক্ষক’।

ওল্ড মেইড মিথ
নারীদের একা থাকার বিষয় নিয়ে ইউরোপকেও পাড়ি দিতে হয়েছিল অনেকখানি পথ। ওল্ড মেইড শব্দটির উৎপত্তি স্কটল্যান্ডে, যে নামটি ভিক্টোরিয়ান যুগে কার্ড খেলায় ব্যবহৃত হতো। যার সহজ অর্থ ছিল- বিবাহযোগ্য বয়স্কা নারী মাত্রই ওল্ড মেইড মানে অশুভ। বলাই বাহুল্য, সেই যুগে মাত্র ৩০ বছর বয়সী অবিবাহিতা নারী মানেই ছিল ‘ওল্ড মেইড’। লোকেরা হাসাহাসি করতো এই বলে যে– কথা সামলে বলো নইলে একজন ওল্ড মেইড কপালে জুটবে। জ্বি, সেই যুগে নারীর পক্ষে একা থাকা এতখানিই অসহনীয় বা অসম্ভব ছিল। অথচ সেই যুগেই কুইন ভিক্টোরিয়া বা এলিজাবেথ দুজনের কেউই বিয়ে করেননি। একা জীবন বেছে নিয়েছিলেন। এবং বিশ্বের পরাক্রমশালী রাণী হিসেবে ইতিহাসে আজও বেঁচে আছেন। ৬৯ বছরের হলিউড অভিনেত্রী ডিয়ান কিটন বলেন, ‘শুধুমাত্র আমি বিবাহিত নই বলেই যে আমার জীবন কম কিছু তা আমি মনে করি না। এসব ওল্ড মেইড মিথ আবর্জনা বৈকি আর কিছুই না’। হ্যাঁ, এই যুগে অবশ্যই আবর্জনাই বটে। কিন্তু আমরা কি পেরেছি আজও আবর্জনার মতো এসব ভাবনা ও বিশ্বাসকে ছুড়ে ফেলে দিতে?

সংকট কার
একা থাকার সংকট নারীর না সমাজের? আমাদের দেশে একা থাকা নিয়ে ওই নারীর চেয়ে সমাজের উদ্বেগ কি বেশি নয়? তাহলে সংকট কার? রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভাতিজী স্বর্ণকুমারী ঘোষণা দিয়েছিলেন বিয়ে করবেন না। তিনি একা থাকবেন। তৎকালীন প্রগতিশীলতার পরকাষ্ঠা হিন্দু পরিবার– স্বর্ণকুমারীর সঙ্গে একটি তলোয়ারের বিয়ে দিতে চেয়েছিল। সেই সংস্কৃতির (?) উত্তরাধিকারী আজকের আমরা শিক্ষিত বাঙালি। আমরা ‘সতী’ ছবিতে দেখেছি শাবানা আযমীকে বটগাছের সঙ্গে বিয়ে দিতে। কুমারি কন্যাদের দেওয়া হতো কলাগাছের সঙ্গে বিয়ে। নতুবা মন্দিরের সেবাদাসী। সমাজ ছিল ভীত একা নারীর দায়িত্ব গ্রহণ করতে। কাজেই একাকী নারীকে কতটুকু সমাজে গ্রহণ করা হয় বা মেনে নেওয়া হয়– তা সহজে অনুমেয়। শত বছর পরেও এই অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে কি? শিক্ষিত বাঙালি পুরুষ ততটা না এগোলেও যুদ্ধ, মরক, বিপর্যয়, ধর্ষণ, নিপীড়ন, গৃহ নির্যাতন নারীকে যুগে যুগে ভেতর থেকে বদলে দিয়েছে অনেক। শিক্ষা ও অর্থনৈতিক ক্ষমতায়নে। নারীর অংশগ্রহণ নারীকে সাহস জুগিয়েছে সিদ্ধান্ত নিতে। শিক্ষিত লোকেরা এসব কিছু কম বেশি জানেন। বাহবাও দেন পরিবেশ পরিস্থিতি দেখে। প্রীতলতা ওয়াদ্দেদার নামে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নারীদের হল বানিয়েছি ঠিকই। কিন্তু সেই হলে বসবাসরত নারীদের বাস্তব জীবনে একা থাকতে চাইলে সমাজে পরিবারে শুরু হয়ে যায় হৈ হৈ রৈ রৈ। যে বেগম রোকেয়া আমাদের শিক্ষার পথ প্রদর্শক, অল্প বয়সে বিধবা হলেও পুরোটা জীবন একা পথ চলে বাঙালি সমাজে নারীদের শিক্ষার পথ খুলে দিয়েছিলেন। রোকেয়ার লেখায় একা জীবনে থাকা নিজের যন্ত্রণা নয়। বরং লিখে গেছেন সমাজের বঞ্চনা ও অপমানের কষ্টের কথা। আজ এত বছর পর নিজের দিকে তাকিয়ে উপলব্ধি হয় আমাদের সো-কলড হাই সোসাইটি নারীর একা থাকার বিষয়ে এতটুকু কি এগিয়েছে? কেবল উপহাস ও উপদেশের ধরন বদলেছে শ্রেণিবিশেষে। সূত্র : বাংলা ট্রিবিউন

লেখক: সাংবাদিক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত