প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ধর্মীয় লেবাসে ইয়াবার কারবার !

ইসমাঈল হুসাইন ইমু : ধর্মের ভুল ব্যাখ্যা ও প্রলোভন দিয়ে ইয়াবার গডফাদাররা মসজিদের ইমাম, মুয়াজ্জিন ও হাফেজদের মাদক পাচারে ব্যবহার করছে। ইতিমধ্যে আইন শৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে বেশকজন ধরা পড়ার পর এমন চাঞ্চল্যকর তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

জানা গেছে, গত শুক্রবার চট্টগ্রামে ইয়াবা পাচার করতে গিয়ে ধরা পড়েছেন একজন মাদ্রাসা শিক্ষক ও মসজিদের এক মুয়াজ্জিন। কক্সবাজার থেকে ইয়াবা নিয়ে গাজীপুরে যাওয়ার পথে তারা নগরীর কোতোয়ালি থানা পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। শুক্রবার রাতে তাদের নগরীর স্টেশন রোডে অভিযান চালিয়ে মো. বেলাল ও আবুল বশরকে আটক করে।

কোতোয়ালি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মহসিন স্থানীয় সাংবাদিকদের জানান, গ্রেফতারকৃত বেলাল কক্সবাজারের রামু উপজেলার কাউয়ারকুপ এলাকার একটি জামে মসজিদের মুয়াজ্জিন এবং আবুল বশর নিজেকে একই উপজেলার হেদায়েতুল উলুম হেফজ খানা মাদ্রাসার শিক্ষক হিসেবে পরিচয় দিয়েছেন। এদের কাছ থেকে আড়াই হাজার করে মোট পাঁচ হাজার ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি আরও জানান, বেলাল ও বশর ইয়াবার ক্রেতা-বিক্রেতা নন। তারা মূলত বহনকারি। টেকনাফের শীর্ষ মাদক ব্যবসায়ীরা এ ধরনের অনেক মানুষকে ইয়াবা পাচারে ব্যবহার করছেন। কারণ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এদের সহজেই সন্দেহ করে না। আর প্রতি পিস ইয়াবা পাচারের জন্যে তাদেরকে ১১ টাকা করে দেওয়া হয় বলে বেলাল ও বশর জানিয়েছেন। এর আগেও তারা ইয়াবা পাচার করেছেন বলে স্বীকার করেছেন।

এছাড়া গত মার্চ মাসে কক্সবাজার এলাকায় পবিত্র কুরআন শরিফের ভেতরে বিশেষ কায়দায় লুকিয়ে ইয়াবা পাচারের সময় ৩ জনকে আটক করে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ। গত ১২ মার্চ গভীর রাতে মিয়ানমার থেকে আসা নৌকার যাত্রীদের বড়ইতলী এলাকায় বিজিবির টহল দল তাদের চ্যালেঞ্জ করে। এ সময় কিছু লোক পালিয়ে যেতে সক্ষম হলেও বিজিবি সৈন্যরা তিনজনকে আটক করেন। এ সময় তাদের একজনের দেহ তল্লাশির পর এক কপি কুরআন খুঁজে পায়। সেই কুরআনের ভেতরে বিশেষ কায়দায় কেটে ১৫ হাজার লুকানো ইয়াবা উদ্ধার করা হয়।

এ ঘটনার পর বিজিবির কর্মকর্তা জানান, চোরাচালানিরা আমাদের ধর্মীয় অনুভূতিকে ব্যবহার করে মাদকপাচার করছে। এর আগে গত ১০ মার্চ কক্সবাজার থেকে এক ব্যক্তিকে আটকের পর তার মাথার পাগড়ির মধ্যে ৬০০০ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। এছাড়া, গত ৬ জুন কক্সবাজারের টেকনাফের শাহপরীর দ্বীপের বাসিন্দ দুই চাচা-ভাতিজা কুরআনের হাফেজকে পুলিশ গ্রেফতার করে। তারা হলেন চাচা মো. শহীদুল্লাহ (৩৩) আর ভাতিজা হাফেজ মাহমুদ (২৫)। শহীদুল্লাহ রাঙ্গুনিয়ার এক মসজিদের ইমাম। তিনি ১০-১২ বছর দাওরা পড়ে ভারতের দেওবন্দ মাদ্রাসায় কারিয়ানা পড়া শেষ করে দেশে আসেন। এরপর তিনি চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া ফেরিঘাট জামে মসজিদে ইমামতি করেন।

সূত্র জানায়, শহীদুল্লাহর ঘনিষ্ঠ বন্ধু টেকনাফের বাসিন্দা ট্রাকচালক আলমগীর। ইমামতি করার সময় তার মাধ্যমে ইয়াবা ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন তিনি। আলমগীরের মালিকানাধীন ট্রাকের চেচিসের ভেতরে বিশেষ কৌশলে টেকনাফ থেকে ঢাকায় মাসে চালান আনতেন অন্তত ৬টি। এতে তার প্রতিমাসে এক লাখ টাকা আয় হতো। এরপর তার ভাতিজা হাফেজ মাহমুদকে শহীদুল্লাহ ইয়াবা ব্যবসায় জড়িয়ে ফেলেন। লেবাস আর মসজিদ ব্যবহার করে চাচা-ভাতিজা মিলে নয়া কৌশল ব্যবহার করে টেকনাফ থেকে ঢাকায় ইয়াবা নিয়ে আসতেন, তারপর খুচরা ব্যবসায়ীদের হাতে তুলে দিতেন। ট্রাকের চেচিসের ভেতরে টেকনাফ থেকে ইয়াবা তুলে চালকের পাশের সিটে বসতেন হাফেজ শহীদুল্লাহ। তার বেশভূষা দেখে বিন্দুমাত্র কারও সন্দেহের উদ্রেক হতো না। শহীদুল্লাহর পরনে থাকতো ধবধবে সাদা রঙের লম্বা পাঞ্জাবি, মাথায় সফেদ টুপি। প্রতিবার টেকনাফ থেকে ইয়াবাভর্তি ট্রাক এসে থামতো যাত্রাবাড়ী ও শনির আখড়ার বিভিন্ন মসজিদ সংলগ্ন স্থানে। আগে থেকে ঢাকা, গাজীপুর, বরিশাল, মাদারীপুরের খুচরা ইয়াবা ক্রেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ থাকতো তাদের। শহীদুল্লাহ যাত্রাবাড়ী ও শনির আখড়ায় নেমে পড়তেন, তার কাছে থাকা ছোট্ট শপিং ব্যাগের ভেতরে ইয়াবা নিয়ে ঢুকে পড়তেন মসজিদে। খুচরা ব্যবসায়ীরা ওই এলাকায় পৌঁছা পর্যন্ত ওখানেই তিনি নামাজ ও কুরআন তেলাওয়াত করতেন। এরপর একে একে খুচরা ব্যবসায়ীদের কাছে হাতবদল করতেন ইয়াবার চালান। যাত্রাবাড়ী এলাকায় অভিযান চালিয়ে শহীদুল্লাহসহ আরও সাতজনকে গ্রেফতার করে ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি)।

শহীদুল্লাহ গোয়েন্দাদের জানান, প্রতি হাজার পিস ইয়াবা ঢাকায় পার্টির কাছে পৌঁছে দেওয়ার বিনিময়ে তিনি পেতেন ৫ হাজার টাকা। তবে এ ব্যবসার পুরোটা দেখভাল করতেন তার বন্ধু আলমগীর। ভালো লাভ দেখে সঙ্গে নিয়ে নেন ভাতিজা হাফেজ মাহমুদকে। গত ২৬ এপ্রিল রাজধানীর ডেমরা থানাধীন পশ্চিম হাজিনগর লেক এলাকা থেকে দুই হাজার পিস ইয়াবাসহ ধরা পড়েন ভাতিজা। তখন পুলিশের জিজ্ঞাসাবাদে মাহমুদ জানান, ওই ইয়াবা টেকনাফের শহীদুল্লাহর। এর আগে শহিদুল্লাহ ২০১৬ সালের ডিসেম্বরে চট্টগ্রামের কর্ণফুলী থানা পুলিশের হাতে ৫ হাজার ইয়াবাসহ ধরা পড়েছিলেন। এক বছর কারাগারে থাকার পর ২০১৭ সালের শেষের দিকে মুক্তি পান তিনি। কারাবন্দি থাকার সময় তিনি জেলের মধ্যে কয়েদি ও বন্দিদের নিয়ে নামাজ পড়তেন। জেল থেকে বের হয়ে রাঙ্গুনিয়ার জামে মসজিদের ইমাম হন তিনি। এরপরই পুনরায় জড়ান ইয়াবা ব্যবসায়। আর তার চক্রের অন্যতম সদস্যরা হলো স্বপন দত্ত (৩২), মাহবুর সরদার (৩০), মাহমুদ হোসেন (৩০), ইসমাইল হোসেন (৪৭), কালা হাসান (৪৫) ও বরকত আলী (৩৫)। এছাড়া গত ২০১২ সালের অক্টোবর মাসে এক হাফেজসহ দুজনকে আটক করে ডিবি পুলিশ। রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার সাতরাস্তা মোড় এলাকা থেকে হাফেজ রুহুল আমীন (৩০) ও ইমাম আলী খন্দকার ওরফে সুমন (২৫) দুজনকে গ্রেফতার করে। তাদের কাছ থেকে ৫শ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। এদের মধ্যে হাফেজ রুহুল আমীন একজন পেশাদার ইয়াবা ব্যবসায়ী।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের একজন সহকারী পরিচালক নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, একবার এক মসজিদের ইমাম মওলানাকে ইয়াবাসহ ধরা হলো। এরপর জিজ্ঞাসাবাদে তিনি জানান, ইয়াবার গডফাদাররা তাকে বুঝিয়েছেন, ব্যবসা করা হালাল। ব্যবসা যেটাই হোক না কেন। ব্যবসাকে তো হারাম বলা হয়নি। তাই আপনি তো ব্যবসাই করছেন। এতে হারাম কিসের হলো। এভাবে বুঝিয়ে তাকে ইয়াবা ব্যবসায় বাধ্য করেছেন বলে জানান তিনি।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত