প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কেন এত আলোচিত ডা. মনীষা চক্রবর্তী?

শর্মিলা সিনড্রেলা : তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মেয়র প্রার্থীদের মধ্যে যিনি সবচেয়ে বেশি আলোচনায়, সবাইকে ছাপিয়ে যিনি মানুষের নজর নিজের দিকে টেনে নিয়েছেন; সেই তিনি আর কেউ নন – বরিশালের ডা. মনীষা চক্রবর্তী। বাংলাদেশ সমাজতান্ত্রিক দল-বাসদ’র এ প্রার্থী এরই মধ্যে ভোটারদের মন জয় করেছেন। কিন্তু কেন তিনি এত আলোচনায়?

প্রায় আড়াই লাখ ভোটারের বরিশাল সিটি নির্বাচনে আওয়ামী লীগ, বিএনপি, জাতীয় পার্টি এবং ইসলামী অান্দোলন বাংলাদেশ ছাড়াও বামদলের পক্ষ থেকে দুই প্রার্থী মেয়র পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাদেরই একজন ডা. মনীষা চক্রবর্তী। অন্যজন সিপিবি’র আবুল কালাম আজাদ।

সোমবারের নির্বাচনের পরেই আসলে বোঝা যাবে নারী হিসেবে একমাত্র মেয়রপ্রার্থী ডা. মনীষা চক্রবর্তীর চূড়ান্ত অবস্থানটা ঠিক কোথায়? কিন্ত তার আগেই প্রচারণা পর্যায়ে তাকে নিয়ে যে আলোচনা; তা বরিশালের গণ্ডি ছাড়িয়ে পৌঁছে গেছে সারাদেশে।

ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক কেন্দ্রীয় সভাপতি ডঃ মঞ্জুরে খোদা
তিনি ফেসবুকে দেয়া এক পোস্টের মাধ্যমে ডা. মনীষার প্রতি তার সমর্থনের কারণ তুলে ধরেছেন ১৩টি পয়েন্ট দিয়ে।

১. মনীষা চক্রবর্তী প্রথম কোনো মেয়ে যে বাসদ ও বামদের মধ্য থেকে প্রথম মেয়র নির্বাচনে অংশগ্রহণ করছে। এক্ষেত্রে তাকে সবার সহযোগিতা করা উচিত বলে মনে করি। এতে করে বাংলাদেশে তরুণ নারী নেতৃত্ব উৎসাহী হবে এবং রাজনীতিতে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়তে ভূমিকা রাখবে।

২. মনীষা বয়সে তরুণ, তারুণ্যের প্রতীক, ওর নির্বাচনের মাধ্যমে বাংলাদেশে তরুণরা ইতিবাচক রাজনীতিতে, নির্বাচনে ও নেতৃত্বে অনুপ্রাণিত হবে। বড় কাজের জন্য তারুণ্য একটি যোগ্যতা ও সামর্থ।

৩. মনীষা প্রগতিশীল রাজনৈতিক পরিবারের মেয়ে, তার দাদা মুক্তিযুদ্ধে নির্মমভাবে নিহত হয়েছেন, তার বাবা একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। সে নিজেও ৩৪তম বিসিএসের সুযোগ-নিয়োগ গ্রহণ করেনি। দেশের প্রতি তাদের পরিবারের অবদান–ভূমিকার কথা বরিশালের সবার জানা। পারিবারিকভাবেই সে রাজনৈতিকভাবে পরীক্ষিত ও প্রমাণিত।

৪. মনীষা নিজে ক্যারিয়ারের দিকে না গিয়ে সমাজবদলের রাজনীতি করছে। আজকের তরুণদের মধ্যে সেটা বিরল, তরুণরা সমাজ পরিবর্তনের রাজনীতি থেকে ছিটকে পড়ছে। সে কারণে তার সাফল্য ও অগ্রগতি অন্যান্য তরুণদের প্রগতিশীল রাজনীতিতে উৎসাহিত করবে।

৫. মনীষা তার চিকিৎসাবিদ্যাকে পেশা হিসেবে গ্রহণ না করে, সেবা হিসেবে নিয়েছেন, এই দুর্যোগে, এই সময়ে এই ঘটনা একটি অনন্য দৃষ্টান্ত! তার এই আত্মত্যাগের উদাহরণ অন্যদের অনুসরণ করতে ও ভাবতে অনুপ্রাণিত করবে।

৬. মনীষা জনবান্ধব একটি মেয়ে, ইতোমধ্যে সে গরীবের ডাক্তার হিসেবে পরিচিতি পেয়েছে। এবং সে তার ব্যক্তি ইমেজ দিয়ে এই দুঃসময়ে অধিক ভোট টানার ক্ষমতা ও যোগ্যতা রাখে। তার নির্বাচনী তৎপরতা- রাজনীতির প্রতি সাধারণ মানুষের ইতিবাচক আগ্রহ তৈরিতে ভূমিকা রাখছে। গরীব মানুষ মাটির ব্যাংকের জমানো পয়সা তার নির্বাচনী তহবিলে দিয়েছে। রিক্সা-টেম্পু চালকরা তার নির্বাচনী কাজে ভাড়া নিচ্ছে না! গরীর, সাধারণ ও সীমিত আয়ের মানুষ তাকে নানাভাবে সহযোগিতা করছে।

৭. মনীষা বুদ্ধিদীপ্ত মেয়ে, তার বক্তব্য, স্মার্টনেস ঈর্ষনীয়, যে কারণে প্রচার মাধ্যমও তাকে সামনে নিয়ে আসছে। এমন তরুণ মেধাবী রাজনীতিককে এগিয়ে যেতে সবার সাহায্য করা সবার কর্তব্য মনে করি, এতে প্রগতিশীল রাজনীতি লাভবান হবে।

৮. বয়স কখনো যোগ্যতার মাপকাঠি হতে পারে না, তাহলে ধরে নিতে হবে যার যত বয়স তার ততো যোগ্যতা! কারো দীর্ঘ রাজনৈতিক বয়স এক ধরণের নিষ্ঠা প্রমাণ করে, কিন্তু সেটা নির্বাচনী যোগ্যতা প্রমাণ করে না। সেই যুক্তি মানলে বলতে হয়, সিপিবি বাংলাদেশের সবচেয়ে প্রাচীন রাজনৈতিক দল তারা কয়বার ক্ষমতায় গেছে?

৯. শারীরিক ও রাজনীতির বয়সের চেয়ে রাজনীতিতে কে বেশি আলোচিত ও আলোড়িত এবং মানুষকে অধিক আন্দোলিত করতে পেরেছে সেটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। মনীষা অল্প বয়সেই সেটা করতে সক্ষম হয়েছে, তার এই সামর্থকে রাজনীতির বিকল্প ধারা তৈরিতে কাজে লাগানো উচিত।

১০. মনীষা সংখ্যালঘু (?) পরিবারের একটি মেয়ে সে হিসেবেও তাকে সমর্থন দান করা উচিত মনে করি। কারণ বাংলাদেশের সংখ্যালঘুদের উপর যে জুলম-নির্যাতন চলছে, তাতে তার রাজনৈতিক ক্ষমতায়ন সংখালঘুদের আত্মবিশ্বাসী করবে।

১১. মনীষা মূলধারার প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নিজেকে রাখতে পারলে, বামরা ২০০-৪০০ ভোটের বৃত্ত থেকে বেড়িয়ে আসবে! এতে বামদের প্রতি মানুষের আগ্রহ বাড়বে এবং তার নির্বাচনের মাধ্যমে বাম-রাজনীতির ইমেজ উদ্ধারের একটা সুযোগ তৈরি হয়েছে, তাকে কাজে লাগানো। নির্বাচন যদি ভোটের কারণে ও হিসেবে হয়, তাহলে যার ভোট অধিক পাবার সম্ভবনা তাকেই মনোনয়ন দেয়া সমীচীন মনে করি। সেটা করতে না পারা দলীয় সংকীর্ণতার পরিচয়।

১২. পরীক্ষিত নেতৃত্ব খুবই আপেক্ষিক বিষয়, মতিয়া আপা, মানিক-নাহিদ-দোহা ভায়েরা কি পরীক্ষিত ছিলেন না? এ কথা বলে কাউকে যোগ্য-অযোগ্য ভেবে- গ্রহণ বা খারিজের কোন যৌক্তিকতা দেখিনা বা যথার্থ মনে করি না!

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারি অধ্যাপক শেখ আদনান ফাহাদ
তিনি ফেসবুক পোস্টে ডা. মনীষার প্রতি তার সমর্থনের কথা জানিয়েছেন। তিনি লিখেছেন, ‘বেঁচে গেছি, আমি বরিশাল সিটির ভোটার নই। না হলে মধুর সমস্যায় পড়তাম। আমার ভোট অবশ্যই সাদিক আব্দুল্লাহ পেত, তবে সেটি শেখ হাসিনার ভোট, বঙ্গবন্ধুর ভোট, প্রার্থীর নয়। তবে দুই ভোট দেয়ার সুযোগ থাকলে একটা আমি অবশ্যই মনীষাকে দিতাম। মনীষা যে আদর্শের জন্য আজ বাসদ থেকে নির্বাচন করছেন, এর সাথে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের তেমন কোন তফাৎ নেই। বরং বঙ্গবন্ধু চাইতেন বাংলাদেশ হবে সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র। এই সমাজতন্ত্র বাংলাদেশের সমাজতন্ত্র, সোভিয়েত বা চায়না মডেলের নয়। শোষিতের গণতন্ত্র। যাই হোক, মনীষার

পোস্টে তিনি তুলে ধরেছেন মনীষা চক্রবর্তীর প্রতি সমর্থনের কারণ। লিখেছেন, বরিশাল সিটি করপোরেশন নির্বাচনে প্রথম নারী মেয়র প্রার্থী মনীষা চক্রবর্তী। মনীষার জন্য অনেক ভালোবাসা রইল। আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীদের কাছে অনুরোধ থাকবে, কেউ যেন মনীষা চক্রবর্তীর সাথে দুর্ব্যবহার না করে। তাকে কেউ যেন ভয় না দেখায়। বরং মনীষা যেন বুঝতে পারে বঙ্গবন্ধুর মহান আদর্শকে। আজ হোক, কাল হোক, মনীষা বঙ্গবন্ধুকে, শেখ হাসিনাকেই ভালোবাসবেন। মনীষার মতো মানুষই এখন আওয়ামী লীগে বেশি দরকার। মিডিয়া খুব বেশি কাভারেজ দিচ্ছে না মনীষাকে। কারণ মনীষা কাউকে কিছু দিতে পারবে না, মনীষা ক্ষমতাকাঠামোর অংশ নয়, তার হাতে নগদ নেই কিছু। একটি মেয়ে ডাক্তার, কত কঠিন ডাক্তারের জীবন, টাকা কামানোর ধান্দা বাদ দিয়ে আসছে পলিটিক্স করতে। এমন কাজ মনে হয় বরিশালেই সম্ভব। বরিশাল যে স্পেশাল, আবার প্রমাণ হলো। যাই হোক, দোয়া করি সাদিক আব্দুল্লাহ জিতুক। কিন্তু সবার চেষ্টা থাকুক, মনীষা যেন কোনভাবেই অপমানিত না হয় বা আমাদের কারো দ্বারা কষ্ট না পাক। জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।

সাংবাদিক আশিষ কুমার দে লিখেছেন, বীরকন্যা প্রীতিলতা ওয়াদ্দেদার, বেগম রোকেয়া সাখাওয়াত, ইলা মিত্র, মনোরমা বসু মাসীমা, অনীমা সিংহ, কবি সুফিয়া কামাল, হেনা দাশের যোগ্য উত্তরসূরী ডা: মনীষা চক্রবর্ত্তী। গ্রেপ্তার, মামলা, হয়রানি ও কারা নিপীড়ন- কোনো কিছুই রুদ্ধ করতে পারেনি তোমার কন্টকাকীর্ণ চলার পথ। সমকালীন নারী জাগরণের অনুপ্রেরণা তুমি।

সাংবাদিক মোহাম্মদ আকবর লিখেছেন, মনীষা চক্রবর্তী অন্যদলকে দোষারোপ করে নয় বরং সততা, সাহস ও যুক্তি দিয়ে নিজেকে মানুষের কাছে অনিবার্য করে তুলুন। আমি কোন প্রার্থীর পক্ষে নই। অন্যের মুখে আপনার কথা শুনেছি। আপনার ত্যাগ ভালো লেগেছে। কিন্তু নির্বাচনী প্রচারণার ভাষা ভালো লাগেনি। ক্ষমা করবেন।

সেই সঙ্গে বলি, আপনাদের রাজনীতিতে আসাটা পজেটিভ। এইবার না হোক অন্যবার বিজয় হবে; নির্বাচনের অথবা আপনার।

নাট্যকর্মী পাভেল রহমান লিখেছেন, বরিশাল সিটি নির্বাচনে ডা. মনীষা চক্রবর্তী বিপুল ভোটে ফেল করবেন। কারণ বাংলাদেশের জনগণ ভালো মানুষকে নির্বাচনে জয়ী করে না।

চোর, দুর্নীতিবাজ, লুটেরাদের নির্বাচনে ভোট দিয়ে জয়ী করে। আর দেশটা শেষ হয়ে গেল বলে হাহাকার করে আনন্দ পায়, বোকা জনগণ। এটাই বাংলাদেশ। মাঝে মাঝে মনীষার মতো কেউ কেউ এসে এই বোকা জনগণের ঘুম ভাঙাতে ডাক দিয়ে যায়।

আমি যদি বরিশাল সিটির ভোটার হতাম মনীষাকে ভোট দিতাম। একটা মেয়ে সাহস করে লুটেরাদের বিপক্ষে দাঁড়িয়েছে। বোকা জনগণের মানসিকতার পরিবর্তন হোক।

রুহুল মাহফুজ জয় নামে একজন লিখেছেন, ডা. মনীষা চক্রবর্ত্তী গণমানুষের প্রার্থী। যার কাছে উন্নয়ন মানে মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন। যিনি আপনাদের সেবা করার জন্য ৩৪তম বিসিএসে নিয়োগপ্রাপ্ত হয়েও সরকারি চাকরিতে যোগ দেননি।

বাসদের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য রাজেকুজ্জামান রতন এক ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ওর লড়াই শ্রমজীবীদের মুখের ভাষা, মধ্যবিত্তদের সৌজন্যের প্রকাশ, নারীদের জন্য দৃষ্টান্ত, তারুণ্যের সাহস আর নগরবাসীর ভরসা হয়ে উঠুক। রাজনীতিতে নীতি ও সংস্কৃতির জাগরণের প্রতীক হয়ে উঠুক এই লড়াই। মনীষাকে ভোট দিয়ে বরিশাল নগরবাসী বলতে পারবে আমরা আমাদের বিবেকের কাছে পরিস্কার। আমরা কোনো দুর্নীতিবাজ, লুন্ঠনকারী, সন্ত্রাসীকে ভোট দেই নাই। দুর্নীতি লুটপাটের বিরুদ্ধে এক মোহনায় মিশে যাক মনীষার লড়াই আর বরিশালবাসীর ভোট।

এক নজরে মনীষা চক্রবর্তীর জীবন:
বরিশালের মেয়ে মনীষার প্রাথমিক শিক্ষা শুরু সেখানকার মল্লিকা কিন্ডার গার্টেন স্কুলে। এরপর বরিশাল সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়ে (সদর গার্লস) থেকে অষ্টম শ্রেণিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি এবং এসএসসিতে জিপিএ ৫ পেয়ে উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হন অমৃত লাল দে কলেজে।

সেখান থেকে উচ্চ মাধ্যমিকে এ প্লাস পেয়ে বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিকেল কলেজে ভর্তি হন। মেডিকেলের পড়াশুনা শেষ করে ৩৪তম বিসিএস-এ স্বাস্থ্য ক্যাডারে সহকারি সার্জন পদে নিয়োগ পান।

প্রগতিশীল পরিবারে জন্ম নেয়া মনীষা চক্রবর্তীর পিতামহ আইনজীবী সুধীর কুমার চক্রবর্তীকে মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে অবস্থান নেয়ায় নৃশংসভাবে হত্যা করে রাজাকার বাহিনী। তার বাবা আইনজীবী অ্যাডভোকেট তপন কুমার চক্রবর্তী মুক্তিযুদ্ধে ৯ নং সেক্টরে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন।

অসংখ্য প্রগতিশীল মানুষদের সান্নিধ্যে বেড়ে ওঠা ডা. মনীষার ছোটবেলা অতিবাহিত হয় পিসেমশায় (ফুপা) বিশিষ্ট প্রকৃতিবিজ্ঞানী দ্বিজেন শর্মার সংস্পর্শে।চ্যানেল আই অনলাইন।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ