প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

সাত বছরেও মানবপাচারে বাংলাদেশের অবস্থানের পরিবর্তন নেই!

ডেস্ক রিপোর্ট:  মানবপাচার দমনে বাংলাদেশ সরকার উল্লেখযোগ্য পদক্ষেপ নিলেও তা কাজে লাগছে না বলে মনে করছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের স্টেট ডিপার্টমেন্ট। জুন মাসে প্রকাশিত ‘ট্রাফিকিং ইন পারসন’ শীর্ষক বার্ষিক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ এ বছরেও টায়ার টু’র নিচের স্তর টায়ার টু নজরদারির তালিকায় রয়েছে। এর আগে ২০১২ সাল থেকে ২০১৬ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশকে রাখা হয়েছিল দ্বিতীয় স্তর টায়ার-টু তে। ২০১৭ সালে এক ধাপ নামিয়ে বাংলাদেশকে টায়ার টু’র ‘নজরদারিতে থাকা দেশের’ তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সেই অবস্থার পরিবর্তন এ বছরেও হয়নি।
বাংলাদেশের সঙ্গে এবার আরও স্থান পেয়েছে আলজেরিয়া, এঙ্গোলা, ভুটান, সেন্ট্রাল আফ্রিকান রিপাবলিক, চাদ, কিউবা, ফিজি, হংকং, ইরাক, কুয়েতসহ মোট ৪২টি রাষ্ট্র।
মানবপাচার পরিস্থিতি বিবেচনা করে স্টেট ডিপার্টমেন্টের বার্ষিক প্রতিবেদনে দেশগুলোকে তিনটি টায়ারে ভাগ করা হয়ে থাকে। এর মধ্যে যেসব দেশ ট্রাফিকিং ভিকটিমস প্রোটেকশন অ্যাক্টসের ন্যূনতম মান পূরণে সক্ষম হয়েছে বলে যুক্তরাষ্ট্র মনে করে, সেসব দেশকে প্রথম স্তর বা টায়ার ওয়ানে রাখা হয়। টায়ার-টু আবার দুই ভাগে বিভক্ত, টায়ার-টু এবং টায়ার-টু ওয়াচলিস্ট। সবশেষে রয়েছে তৃতীয় স্তর বা টায়ার-থ্রি।
বাংলাদেশকে ফের টায়ার টু নজরদারির তালিকায় নিয়ে আসার কারণ হিসেবে বলা হয়েছে বিচারহীনতার কথা। ২০১৭ সালে মাত্র একজন পাচারকারীকে আইনের আওতায় আনা হয়েছে, যা আগের বছরের তুলনায় কম। পাচারের শিকার যারা তাদেরকে পুনর্বাসনের ব্যবস্থার বিষয়ে আদালতের আদেশ থাকলেও তাও বাস্তবায়ন করা হয়নি।
এছাড়াও কারণ হিসেবে আরও উল্লেখ করা হয়েছে. জনশক্তি রফতানিতে সরকার রিক্রুটমেন্ট ফি নিয়ন্ত্রণ করার লক্ষ্যে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে শ্রম রফতানিকারক চুক্তি স্বাক্ষর করার পরও উচ্চ অভিবাসন খরচ অনুমোদন অব্যাহত রাখে এবং অবৈধভাবে যারা বিদেশে শ্রমিক পাঠানোর কাজ করে তাদের নজরদারির মধ্যে আনায় ব্যর্থ। সাব এজেন্টদের কারণেই শ্রমিকদের পাচারের শিকার হতে হয় বলেও রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়।

শুধু স্টেট ডিপার্টমেন্টের প্রতিবেদনেই না ইউরোপীয় কমিশনের পরিসংখ্যান দফতর ইউরোস্ট্যাটের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৮ থেকে ২০১৭ পর্যন্ত এক লাখেরও বেশি বাংলাদেশি ইউরোপের দেশগুলোতে অবৈধভাবে প্রবেশ করেছেন। এর মধ্যে ২০১৬ সালে ১৭ হাজার ২১৫ জন রাজনৈতিক আশ্রয়ের আবেদন করলে ১১ হাজার ৭১৫টি আবেদন বাতিল করা হয়।
ইতালির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের দেওয়া তথ্য মতে, কেন্দ্রীয় ভূমধ্যসাগর ব্যবহার করে ইতালিতে প্রবেশের হার দিন দিন বেড়েই চলছে। ইউএনএইচসিআর এর মতে ভূমধ্যসাগর ব্যবহার করে ইউরোপে প্রবেশকারীর সংখ্যায় বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ স্থানে।
এছাড়া বাংলাদেশে অবস্থিত ব্রিটিশ হাইকমিশনের পৃষ্ঠপোষকতায় অভিবাসী কর্মী উন্নয়ন প্রোগ্রাম (ওকাপ) বাংলাদেশ থেকে ইতালির অনিয়মিত অভিবাসন প্রক্রিয়ার ওপর সম্প্রতি এক গবেষণায় উল্লেখ করেছে, বাংলাদেশ থেকে ভূমধ্যসাগর ব্যবহার করে লিবিয়া হয়ে ইতালি যাওয়ার মাত্রা চরম আকারে পরিণত হয়েছে। বিশেষ করে ২০১৬ এবং ২০১৭ সালে এই মাত্রা চরম আকার ধারণ করেছে। এমনকি ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালি যাওয়ার ক্ষেত্রে বাংলাদেশ দ্বিতীয় বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর তালিকায় ২০১৭ সালের প্রথমভাগে অবস্থান করে। এছাড়া এতে আরও বলা হয়, ৯৬.৭ শতাংশ অভিবাসী কেন্দ্রীয় ভূমধ্যসাগরের পথটি ব্যবহার করে লিবিয়া উপকূল হয়ে ইতালি যায়।
আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থা আইওএম’র মতে, এ বছর এখন পর্যন্ত ভূমধ্যসাগর দিয়ে প্রায় ৪৫ হাজার অভিবাসন প্রত্যাশী ইউরোপে প্রবেশ করেছে। বিপদজনকভাবে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইউরোপে প্রবেশে এই উপকূল ব্যবহার করতে পছন্দ করে শরণার্থী ও অবৈধ অভিবাসন প্রার্থীরা। গত বছর এই পথ পাড়ি দিয়ে ইতালি ও অন্য ইউরোপীয় দেশগুলোতে প্রায় এক লাখ ২০ হাজার শরণার্থী পৌঁছেছে।
ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের দেওয়া তথ্য মতে, ১৯৭৬ সালে থেকে এ বছরের জুন পর্যন্ত ১১ মিলিয়ন বাংলাদেশি অভিবাসিত হয়েছে। যার মধ্যে কাজের উদ্দেশ্যেই ২০১৭ সালে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে ১ লাখ ৫ হাজার ৫২৫ জন বাংলাদেশি। এছাড়া ব্র্যাক আরও জানায়, ২০১২ থেকে ২০১৫ পর্যন্ত প্রায় দেড় লাখ বাংলাদেশি বঙ্গোপসাগর পাড়ি দিয়ে বিদেশ গিয়েছে।

ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের হেড শরিফুল হাসান বাংলা ট্রিবিউনকে বলেন, ‘পাচারকারীদের চিহ্নিত করে যদি আমরা আইনের আওতায় না আনতে পারি তাহলে কিভাবে আমরা পাচার রোধ করবো? মানবপাচার বন্ধ করতে মানুষকে যেমন সচেতন হতে হবে তেমনি যে মামলাগুলো হয়েছে তার দ্রুত নিষ্পত্তির মাধ্যমে বিচারের ব্যবস্থা করতে হবে। স্টেট ডিপার্টমেন্টের প্রতিবেদনেও কিন্তু বলা হয়েছে তদন্ত, দক্ষ কর্মকর্তা ও প্রসেকিউশন নাই। এই মামলাগুলো বিচারকাজ সম্পন্ন করার জন্য প্রত্যেকটি জেলায় ট্রাইবুন্যাল হওয়ার কথা ছিল। যার কারণে আমাদের বিচার হচ্ছে না। আইনের শাসন কিন্তু আমাদের প্রতিষ্ঠা করতে হবে তা নাহলে কিন্তু পাচারকারীদের থামানো যাবে না।’
এদিকে সুপ্রিমকোর্ট সূত্রে জানা গেছে, সারা দেশে এ পর্যন্ত মানবপাচারের মামলা হয়েছে ৪ হাজার ১২৮টি, যার মধ্যে ১৫৭টি নিষ্পত্তি করা হয়েছে এবং ১৯টি মামলা বদলি হয়েছে। বর্তমানে বিচারাধীন রয়েছে ৩ হাজার ৯৫২টি মামলা।
অন্যদিকে পুলিশ হেডকোয়াটারের হিউম্যান ট্রাফিকিং মনিটরিং সেলের দেওয়া তথ্য মতে, ২০১২ সাল থেকে এ বছরের জুন পর্যন্ত ৪ হাজার ২০৪টি মামলা দায়ের করা হয়েছে। এর মধ্যে ২৬৭ টি মামলা দায়ের হয়েছে শুধু এই বছরেই। বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) দেওয়া তথ্য মতে, ২০১৮ সালের জুন পর্যন্ত মামলা দায়ের করেছে ৫৭টি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয়ের জন সুরক্ষা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (রাজনৈতিক ও আইসিটি) মোহাম্মদ শামসুর রহমান বলেন, ‘প্রায় ৪ হাজারের ওপর মামলা হয়েছে। সাজা হয়েছে মাত্র একটি মামলায়, বিচার হয়েছে মনে হয় ৫-৭ শতাংশ। এই মামলাগুলোর ফলাফল যথেষ্ট ভালো নয়। মামলাগুলো পরিচালনায় বার বার বলা হচ্ছে স্পেশাল ট্রাইবুন্যালের কথা। স্পেশাল ট্রাইবুন্যাল সম্ভব নয় কিন্তু ইতোমধ্যে আইনমন্ত্রণালয় আদেশ দিয়েছে প্রত্যেকটি জেলায় নারী ও শিশু নির্যাতনের বিচার করার জন্য যে আদালত আছে সেই আদালতে সপ্তাহে দু’দিন মানবপাচারের যেই মামলাগুলো আছে তা বিচারের আওতায় আনবেন। কিন্তু বিচার কার্যক্রমে যেটা বড় সমস্যা তা হলো যারা বিদেশে যাচ্ছেন তারা অনেক তথ্য গোপন করে যাচ্ছেন। কেউ তার নাম পালটিয়ে যাচ্ছেন, কেউ আকার ঠিকানা। বিদেশে এই লোকটিকে চিহ্নিত করা কঠিন। টাকা পয়সা লেনদেনের কোনও তথ্য বা ডকুমেন্ট থাকে না। বিচার কাজ কোনও তথ্য প্রমাণ ছাড়া করা যায় না। সেই জায়গাটিতে আমরা খুব পিছিয়ে আছি।’

তিনি আরও বলেন, ‘ইতালিতে ১০ হাজারেরও বেশি বাংলাদেশির অবস্থান। তারা সবাই বাংলায় কথা বলতে পারেন। কিন্তু এটা মনে রাখতে হবে, বাংলায় কথা বলতে পারলেই তারা বাংলাদেশি নন। এই বিষয়টি আমরা তাদের বোঝানোর চেষ্টা করছি। তারা সবাই বাংলাদেশ থেকে যায়নি। বাংলাদেশে বসে সেখানে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষে মনিটরিং করা সব জায়গায় সম্ভব নয়। যার ফলে এই সমস্যার সৃষ্টি। আমরা মাঝে মাঝে বিরক্ত হই যখন শুনি বৈধভাবে যেতে ২১টি স্টেপ লাগে। ২১টি স্টেপকে জদি ভয় পান, তাহলে অবৈধভাবে যারা যান তাদের যে অভিজ্ঞতা তা থেকে ওই ২১টি স্টেপ ভালো। সরকার চেষ্টা করছে, কাজ করছে এই ব্যাপারে।’ বাংলা ট্রিবিউন।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত