প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আব্বা কেনো ডিসি অফিসের কেরাণী ?

সাজ্জাদ চৌধুরী: কোটা ও আমি, সময়টা ২০১৩ সাল। এই প্রথম ৩৪তম বিসিএসে প্রিলিমিনারী হতেই কোটা প্রয়োগ হওয়াতে মোট শিক্ষার্থী চান্স পায় প্রায় ১৪ হাজার। যেখানে ১০০ নাম্বারের মধ্যে ৪০ এর কাছাকাছি নাম্বার পেয়ে ৫৬% কোটাধারী ৭০০০+ জন। এবং ৮৮ পেয়ে কোটাহীন ৬০০০+ প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত হয়। অনেক ঝানু ও অভিজ্ঞ বিসিএস পাবলিক সেবছর প্রিলিতেই বাদ পড়ে। জীবনে আমিও সেইবার প্রিলি ফেইল করার স্বাদ নিলাম।
এ নিয়ে দেশের ছাত্রসমাজ ফুলে উঠল। তবে সংখ্যায় কম, জাস্ট যারা প্রিলি দিয়েছিল ১.৫ লক্ষ তাদের অনেকেই বিষয়টি জানত না, বা জানলেও আগ্রহ দেখায়নি। যথারীতি কয়েকদিন আলোচনা চলল, কিছু মানববন্ধনও হয়েছিল। রাস্তায় কতটুকু আন্দোলন হয়েছিল মনে নেই। কারণ, তখন আমি ৩৩তম ভাইভা দেওয়ার স্বপ্নে বিভোর।
কয়েকদিনের বিক্ষুদ্ধ অবস্থার পর পিএসসি রেজাল্ট পুনঃবিবেচনা করল। ৫০-৫৫ এর মাঝামাঝি একটা কাট মার্কস নির্ধারণ করে সব কোটাধারীকে রেখে ৪৪ হাজার জন পরীক্ষার্থীকে উত্তীর্ণ করে সেবারের মত হাফ ছেড়ে বাঁচল।
এর পর ৩৩তমতে ভাইভা পাস, তবে নন ক্যাডার। পরে নন ক্যাডারে প্রায় ২০০ জন প্রথম শ্রেণি ও ৩৯০ জন দ্বিতীয় শ্রেণি নিয়োগ দিলেও আমি সুপারিশ বিহীন। আড়াইবছর পর যখন ৩৩তম ক্লোজ হলো, তখনো আমি একজন তৃতীয় শ্রেণির সরকারী কেরাণী।
কোটার খোঁটা বুঝতে বাকী রইল না। জাস্ট ৪৫০ টি জেনারেল ক্যাডার এর ৫৬% কোটাধারীর আর ৪৪% কোটাহীন এর মর্তবা হাঁড়ে হাঁড়ে টের পেলাম। বুঝতে পারলাম সারাদেশে প্রথম ২১০ জনের মধ্যে থাকার মত যথেস্ট মেধাবী আমি নই। তবে, এ বিশ্বাস আছে যে, আমি মেধাবী এবং লেবেল প্লেয়িং ফিল্ড পেলে সারা দেশে ৪৫০ জন এর মধ্যে থাকতে সক্ষম হব, নয়ত কমপক্ষে একটি প্রথম শ্রেণির চাকরিতে হলেও মুখ বাঁচানোর পথ পাব।
কিন্তু আফসোস, পারলাম না। ৩৩-৩৭ সর্বমোট ৫টি প্রিলি, ৪টি রিটেন ও ৪টি ভাইভা দিয়েও ৪বার নন-ক্যাডার। অথচ ৩৩তম বিসিএস এ আমার প্রাপ্ত নাম্বার (৪৯০+) মুক্তিযোদ্ধা কোটায় নিয়োগ পাওয়া প্রশাসন ক্যাডার বা পুলিশ ক্যাডারের চেয়েও বেশি। ৪৮০ পেয়েও ক্যাডার, যার মার্কসসীট আমার কাছে আছে। ব্যক্তিগত কারণে ব্যাংক, বীমা, বিদেশ, ব্যবসা বা প্রাইভেট জবে যাওয়া সম্ভব ছিল না বলে সরকারী চাকরির জন্যই শুরু হতে নিজেকে তৈরী করতে চেষ্ট করেছি। অথচ বার বার যোগ্যতার প্রমাণ দেয়া সত্তে¡ও নিজেকে এখনো একজন সরকারী কেরাণী হিসেবেই মুখ লুকিয়ে চলতে হয়, জানি না কতদিন চলতে পারব, আমি চলতে পারলেও হয়ত আমার সন্তান পারবে কি-না, হয়ত তার বন্ধুমহলে বাবাকে কেরাণীর সন্তান পরিচয় দিতে গিয়ে লজ্জ্বায় মুখ লুকাবে, অথবা বাবার যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন করবে অমুকের বাবা ৪৮০ পেয়ে ডিসি হতে পারলে আব্বা কেনো ডিসি অফিসের কেরাণী ?
নন ক্যাডার হতে শতভাগ নিয়োগ দেয়ার বিষয়েও সরকারী আগ্রহ যথেষ্ট নয়। আবার অনেক ক্ষেত্রে এমন স্থানে নিয়োগ দিচ্ছেন যা সত্যিই কষ্টের। বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় হতে পাস করে নন ক্যাডার সহযোদ্ধাদের অনেকে প্র্রধান শিক্ষক, সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয় বা সহকারী শিক্ষক, সরকারী হাই স্কুল এ চক, ডাস্টার নিয়ে ব্যস্ত থাকতে হচ্ছে। এখনো কোন কোন রাতে ঘুম ভেঙ্গে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে চিন্তা করি, যদি ২০১৩ এর কোটা আন্দোলন সফল হত, তবে আমিও হয়ত কোন এক ডিসির বাংলোতে মা বাবার স্বপ্ন পূরণের ইতিহাস রচনা করতে পারতাম।
পোস্টটি কপি করে রাখতে পারেন। এখন যারা ৩৮তমতে রিটেন বা ৪০তমতে প্রিলি নিয়ে লাইব্রেরীতে মুখ থুবড়ে পড়ে আছেন, আগামী ৪ বছর পর এটিই পোস্ট করতে পারবেন। আবারো যখন কোন রাশেদ, নুরু, তরিকুল হাতুড়ীর ভয় উপেক্ষা করে দাঁড়িয়ে যাবে, তখন আপনাদের সেই কাপুরুষতা আমার মত কুঁড়ে কুঁড়ে খাবে। কিন্তু আপনি তখন মস্ত কেরাণী, ঘুম ভেঙ্গে কপালের ঘাম মুছে কোটাধারী ডিসি স্যারের ছবি স্বপ্নে দেখা ও দীর্ঘশ্বাস ফেলা ছাড়া তখন উপায় থাকবে না।
এখনো সময় আছে রাশেদ, নুরু, তরিকুলের রক্তের প্রতিদান দেয়ার, হলে ঘুমিয়ে না থেকে রাজু ভাস্কর্যে নিজের ও দেশের ভবিষ্যত গড়ার।
সময় গেলে হবে না সাধন।
-ফেসবুক থেকে

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ