প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

অজানা আতঙ্ক সিলেটে

আশরাফ চৌধুরী রাজু, সিলেট:সিলেটকে বলা হয় ‘সম্প্রীতির শহর’। হযরত শাহজালাল (রহ.) ও হযরত শাহপরান (রহ.) এর এই পূণ্যভূমিতে বিভিন্ন ধর্মাবলম্বীদের যেমন অসাম্প্রদায়িক অবস্থান রয়েছে, তেমনি রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীরাও এখানে সহবস্থান করেন। জাতীয় রাজনীতির উত্তাপ, প্রতিপক্ষের প্রতি কথার বাণ, সংঘাত এসব খুব কম সময়েই সিলেটে দেখা যায়। কিন্তু সেই সম্প্রীতির নগরে এখন অজানা আতঙ্ক তাড়া করে ফিরছে সাধারণ মানুষকে। সিলেট সিটি নির্বাচনের ক্ষণ এগিয়ে আসার সাথে বাড়ছে সেই অজানা আতঙ্ক।

সোমবার একযোগে দেশের সিলেট, রাজশাহী ও বরিশাল সিটিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। অন্য দুই সিটির তুলনায় সিলেটে ভোটের মাঠের পরিবেশ ছিল অনেক সহনীয়, শান্তিপূর্ণ। কিন্তু গত কয়েকদিনে পাল্টে গেছে পরিস্থিতি। নির্বাচনী ক্যাম্পে আগুন, ককটেল বিস্ফোরণ, বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা, সমর্থকদের মারামারি এসব কিছু মিলে সিলেট সিটি করপোরেশন (সিসিক) নির্বাচনের পরিবেশ এখন উত্তপ্ত। সাধারণ মানুষ এখন ভোটের দিন পরিস্থিতি কি হয়, তা নিয়েই আতঙ্কে। আর বিএনপি নেতাকর্মীদের তাড়া করছে ভোট সুষ্ঠু হবে কিনা সেই আতঙ্ক।সিলেটে ভোটের মাঠের শান্তিপূর্ণ পরিবেশ বদলে যেতে থাকে গেল ১৯ জুলাই থেকে।

সেদিন সিসিক নির্বাচনে বিএনপির বিদ্রোহী মেয়র প্রার্থী বদরুজ্জামান সেলিম দলীয় মেয়র প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরীর বাসায় সংবাদ সম্মেলন করে নির্বাচন থেকে সরে দাঁড়ান। সংবাদ সম্মেলন শেষে বিএনপি নেতারারা যখন বেরিয়ে যাচ্ছিলেন, তখন তাদের গাড়িতে তল্লাশি চালায় পুলিশ। হঠাৎ করে পুলিশের এই তল্লাশিতে বিতর্ক সৃষ্টি হয়। বিএনপি অভিযোগ করে, কতিপয় পুলিশ সদস্য অতিউৎসাহী হয়ে পরিবেশকে নষ্ট করছেন।

২০ জুলাই রাতে বিএনপির রাসেল ও সুমন নামের দুই কর্মীকে গ্রেফতার করে পুলিশ। পরদিন তাদের মুক্তির দাবিতে মহানগর পুলিশের উপ-কমিশনারের কার্যালয়ের সামনের সড়কে নেতাকর্মীদের নিয়ে অবস্থান নেন আরিফ। ওই দুই কর্মীকে নিয়মিত মামলায় গ্রেফতারের বিষয়টি জানার পর সরে যান তারা।

তবে ওই ঘটনায় ‘পুলিশের কাজে বাধার অভিযোগ’ এনে সেদিন রাতে (২১ জুলাই) বিএনপির ৩৯ নেতাকর্মীর নামোল্লেখ ও অজ্ঞাত আরো প্রায় ৬০ জনকে আসামি করে মামলা করে পুলিশ। সেদিন রাতে নগরীর টুলটিকরে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী বদর উদ্দিন আহমদ কামরানের একটি নির্বাচনী ক্যাম্পে আগুন দেয়ার ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের ৩৪ নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা করেন ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি ফরিদ আহমদ।

উভয় মামলায় গত মঙ্গলবার হাইকোর্ট থেকে জামিন নেন বিএনপি নেতাকর্মীরা।গত বুধবার রাত ১০টার দিকে নগরীর দক্ষিণ সুরমার মোমিনখলায় একটি ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। এতে আহত হন দক্ষিণ সুরমা থানার এসআই রায়হান উদ্দিন। এ ঘটনায় রাতেই তিনি বাদী হয়ে বিএনপির ৪৮ নেতাকর্মীর নামোল্লেখ করে মামলা করেন।

সিসিক নির্বাচনের প্রচারণার শুরুর পর তিন মামলায় সরাসরি বিএনপির ১২১ নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে। এছাড়া অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে আরো প্রায় শতাধিক নেতাকর্মীকে।সর্বশেষ নগরীর চৌকিদেখী এলাকায় গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে কামরানের একটি নির্বাচনী কার্যালয়ের সামনে ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় বিএনপির ৬৫ নেতাকর্মীর নামোল্লেখ করে মামলা করা হয়েছে। অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে আরো ১০-১৫ জনকে।

স্থানীয় আওয়ামী লীগ নেতা ফারুক হোসেন বাদী হয়ে মামলাটি করেছেন বলে জানিয়েছেন বিমানবন্দর থানার ওসি গৌছুল হোসেন। এ নিয়ে সিসিক নির্বাচনকে কেন্দ্র করে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে চারটি। এসব মামলায় দলটির দুই শতাধিক নেতাকর্মীকে আসামি করা হয়েছে।মামলার ফাঁদে পড়ে বিএনপি নেতাকর্মীরা এখন ঘর ছেড়ে পালিয়ে বেড়াচ্ছেন। রাতে নিজের বাসা-বাড়িতে না থেকে অন্যত্র থাকছেন তারা। এমনকি অনেক নেতাই নিজের সার্বক্ষণিক ব্যবহারের মোবাইল নম্বর পাল্টে নতুন নম্বর ব্যবহার করছেন।

বিএনপির অভিযোগ, ভোটের মাঠ থেকে তাদেরকে সরিয়ে দিতে পরিকল্পিতভাবে এসব মামলা দেয়া হয়েছে। পুলিশ নেতাকর্মীদের গ্রেফতার ও হয়রানি করছে। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকজন নেতাকর্মীকের গ্রেফতার করেছে পুলিশ। ভোটের দিন ভোটাররা কেন্দ্রে গিয়ে অবাধে ভোট দিতে পারবেন কিনা, তা নিয়েও শঙ্কায় রয়েছে বিএনপি। দলটির মধ্যে ভোট নিয়ে এখন আতঙ্ক তাড়া করছে। তারা মনে করছে, সম্প্রতি খুলনা ও গাজীপুর সিটিতে যে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং’ হয়েছে, সিলেটেও সেরকম কিছু হতে পারে।বিএনপির মেয়র প্রার্থী আরিফুল হক চৌধুরী বলেন, ‘নিজের কর্মীবাহিনী দিয়ে পূর্বপরিকল্পিতভাবে টুলটিকরে নিজের নির্বাচনী অফিস পুড়িয়ে মিথ্যা ও কাল্পনিক নাটক সাজিয়ে বিএনপি নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা দেয়া হয়েছে। বিএনপির দুই কর্মীর খোঁজ করতে গিয়ে পুলিশের কার্যালয়ের সামনে শান্তিপূর্ণ অবস্থান কর্মসূচি পালিত হলেও আমাদের শীর্ষ নেতৃবৃন্দের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দেয়া হল। একইভাবে দক্ষিণ সুরমায় ককটেল বিস্ফোরণের ঘটনায় বিএনপির ৪৮ নেতাকর্মীর নামোল্লেখ করে মিথ্যা মামলা করা হয়েছে। এসব কিসের আলামত? প্রশাসন যদি একপেশে আচরণ বন্ধ না করে, তবে নগরবাসীই এর সমুচিত জবাব ভোটের মাধ্যমে দেবেন।’

এদিকে, গত ১৮ জুলাই নগরীর ২৩নং ওয়ার্ডে কাউন্সিলর প্রার্থী মোস্তাক আহমদ ও ফারুক আহমদের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়, গত মঙ্গলবার ১৬নং ওয়ার্ডে কাউন্সিলর প্রার্থী আব্দুল মুহিত জাবেদ ও সাব্বির আহমদ চৌধুরীর সমর্থকরা সংঘর্ষে জড়ায়। কয়েকদিন আগে নগরীর দর্শনদেউড়িতে বাগবিতণ্ডা হয় যুবলীগ ও শিবির নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে। ওই সময় উভয়পক্ষ মুখোমুখি অবস্থান নিয়েছিল।

এছাড়া প্রচারণার দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে নগরীর সুবিদবাজারে বিএনপি নেতার ভাগ্নেকে খোঁজতে গিয়ে যুবলীগ নেতার রেস্টুরেন্টে সশস্ত্র মহড়া দেয় শিবির ক্যাডাররা।হঠাৎ করে একের পর এক এসব অপ্রীতিকর ঘটনায় অজানা আতঙ্ক তাড়া করছে সাধারণ নগরবাসীকে।

আগামী সোমবার ভোটের মাঠের পরিস্থিতি কি হয়, নির্বাচনে কেন্দ্র দখল ও রাজনৈতিক দলগুলোর নেতাকর্মীরা সংঘাতে জড়ায় কিনা এসব বিষয় নিয়ে তারা শঙ্কিত।

নগরীর শিবগঞ্জের কাজী শওকত, পুরানলেনের তুহিনুল ইসলাম ও সুবিদবাজারের আবুল কালাম একই সুরে বলেন, ‘পরিস্থিতি যেভাবে খারাপ হচ্ছে, তাতে আমরা আতঙ্কের মধ্যে আছি। ভোটের দিন কি হয় না হয়, ভোটকেন্দ্রে গিয়ে অবাধে ভোট দিতে পারবো কিনা, তা নিয়ে আমরা শঙ্কিত।’

সামগ্রিক বিষয়ে সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন), সিলেট শাখার সভাপতি ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘নির্বাচন কমিশন শক্ত ভূমিকা রাখতে পারলে সিলেটে ভোটের পরিবেশ শান্তিপূর্ণ হতো, মানুষের মধ্যে আতঙ্ক কাজ করতো না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর ভূমিকাও ভোটের আগেই নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।’

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত