প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মাদক আগ্রাসন থেকে রক্ষায় ৩ স্তরের এ্যাকশন প্ল্যান তৈরি

সুজন কৈরী : মাদকের ভয়াবহতা আগ্রাসন থেকে রক্ষা পেতে একটি এ্যাকশন প্ল্যান তৈরি করা হয়েছে। এতে স্বল্প, মধ্যম ও দীর্ঘ মেয়াদী-এই তিন স্তরের কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়নের কথা বলা হয়েছে। আজ রোববার রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে আয়োজিত একটি কর্মশালা অনুষ্ঠানের মাধ্যমে এ্যাকশন প্ল্যানটির উদ্বোধন করা হবে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থেকে অনুষ্ঠানের শুভ উদ্বোধন করবেন।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরের (ডিএনসি) মহাপরিচালক মো. জামাল উদ্দিন আহমেদের সভাপতিত্বে কর্মশালায় ১৬টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগ এবং আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি এবং গন্যমান্য ব্যক্তিবর্গ উপস্থিত থাকবেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

এ্যাকশন প্ল্যানের সারসংক্ষেপ পাঠ করবেন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রালয়ের সুরক্ষা সেবা বিভাগের সচিব ফরিদ উদ্দিন আহমেদ চৌধরী ও এ্যাকশন প্ল্যানটি উপস্থাপন করবেন সুরক্ষা সেবা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. আতিকুল হক।

ডিএনসি সূত্রে জানা গেছে, এ্যাকশন প্ল্যানটি স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তৈরি করেছে। পরে এটি পাঠানো হয় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। সেখান থেকে সম্প্রতি প্ল্যানটির অনুমোদন হয়েছে। এটি বাস্তবায়নের জন্য ওই কর্মশালার আয়োজন করা হয়।

এ্যাকশন প্ল্যানে কৌশলগত কর্মপরিকল্পনার কয়েকটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও উদ্দেশ্যের কথা বলা হয়েছে। সেগুলো হলো- সীমান্ত পথে মাদকের প্রবেশ বা পাচার বন্ধ, দেশের মধ্যে মাদকের উৎপাদন, সরবরাহ ও সহলভ্যতার বিলোপ সাধন, মাদকের সঙ্গে জড়িত ব্যক্তি ও মাদকে মদদদাতা এবং অর্থলগ্নীকারীদের গ্রেফতার, তদন্ত ও বিচারের মাধ্যমে শাস্তির ব্যবস্থাসহ মাদক ব্যবসার মাধ্যমে অর্জিত টাকা ও সম্পদ রাষ্ট্রের অনুকূলে বাজেয়াপ্ত করাসহ মানি লন্ডারিং আইনে যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা। ওষূধ উৎপাদন, চিকিৎসা, শিল্প কারখানা ও বৈজ্ঞানিক গবেষণায় ব্যবহৃত বিভিন্ন প্রকারের কাঁচামাল কালোবাজারে পাচার হয়ে মাদক উৎপাদনে ব্যবহৃত হতে না পারে, তার নিশ্চয়তা প্রদান, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদফতরকে (ডিএনসি) ড্রাগ এনফোর্স এজেন্সি হিসেবে রূপান্তর করা, মাদকাসক্তদের চিকিৎসা ও পুর্নবাসনের ব্যবস্থা করা, পরীক্ষামূলক প্রকল্প হিসেবে প্রতি বিভাগের একটি উপজেলাকে মাদকমুক্ত করার জন্য বিভাগীয় কমিশনারের নেতৃত্বে সকল বাহিনী ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের সমন্বয়ে কমিটি গঠণ, মাদক সংক্রান্ত সকল কাজে নিয়োজিত আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, প্রশাসন, বিচার ব্যবস্থা, হাসপাতাল, সরকারী-বেসরকারী সংস্থাসহ সংশ্লিষ্টদের কাজের মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ও সমন্বয় সাধনসহ সমাজের সকল স্তর ও পেশায় মাদকবিরোধী সচেতনতা ও সামাজিক উদ্ধুদ্ধকরণ নিশ্চিত করা এবং মাদকের চোরাচালান ও অপব্যবহারের বিরুদ্ধে একটি ব্যাপক সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা।

সূত্র জানায়, এ্যাকশন প্ল্যান বাস্তবায়নে ১ বছর মেয়াদী স্বল্প, ২ বছর মেয়াদী মধ্য ও ৫ বছর মেয়াদী দীর্ঘ- এই তিন স্তরের পরিকল্পনার কথা বলা হয়েছে। স্বল্প মেয়াদী পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে- সীমান্ত পথে মাদকের প্রবেশ রোধে কোস্ট গার্ড, বিজিবি ও র‌্যাব-পুলিশ এবং ডিএনসির সমন্বয়ে নৌপথে দেশে মাছ ধরার নৌকাগুলোকে ভিন্ন রং করা ও মায়ানমারের নৌকা থেকে নিরাপদ দূরত্বে অবস্থান নিশ্চিত করা। এছাড়া অন্যান্য সীমান্ত পথে যৌথ চেকপোস্ট স্থাপনসহ নজরদারি বৃদ্ধি করা। আন্তঃবাহনী র‌্যাব-পুলিশসহ অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বয়ে জেলা ও মেট্রো ভিত্তিক মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকা তৈরি করা। তালিকা ধরে একযোগে জেলা ভিত্তিক টাস্কফোর্সের অভিযান চালানো, তালিকার সকল মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার না হওয়া পর্যন্ত অভিযান অব্যাহত রাখা, অভিযানকালে যেসব কর্মকর্তাদের পারফরমেন্স খারাপ হবে তাদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ, টাস্কফোর্সের প্রতিদিনের অভিযানের ফলাফল পরদিন প্রেস রিলিজের মাধ্যমে প্রকাশ, প্রতি ২ মাস পর এনফোর্সমেন্ট কমিটির সভায় অপারেশনাল কার্যক্রম মূল্যায়ন করে পরবর্তী পদক্ষেপ গ্রহণ করা। ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনা করতে হবে। আদালত পরিচালনার সুবিধার্থে ডিএনসির সহকারী পরিচালক বা উপ-পরিচালকের শূন্য পদে প্রশাসন ক্যাডার কর্মকর্তা নিয়োগ করে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে ম্যাজিস্ট্রেরিয়াল ক্ষমতা প্রদান, প্রত্যেক জেলায় ২ জন নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটকে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে ভ্রাম্যমান আদালত পরিচালনার জন্য এসাইন করা। মাদকের বিরুদ্ধে সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য ঢাকা শহরে এক মিনিট স্ব স্ব অবস্থান থেকে দাড়িয়ে মাদকের বিরুদ্ধে না বলা এবং এজন্য ঢাকায় একটি সমন্বয় কমিটি গঠণ, আধুনিক ও আকর্ষনীয় টিভি ফিলার তৈরি করে বিজ্ঞাপণ আকারে বেসরকারী চ্যানেলে পিক আওয়ারে প্রচার, প্রতিটি জেলা শহরে মাদক বিরোধী গ্রান্ড র‌্যালীর আয়োজন, তথ্য মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে দ্বি-পাক্ষিক সভা করে প্রচার কার্যক্রম সমন্বয় করা, দেশের সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে মাদক বিরোধী কমিটি গঠণ করা এবং কমিটির কার্যক্রম সম্পর্কে মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা অধিদফতরের প্রতিবেদন সংগ্রহ করে মাধ্যমিক উচ্চ শিক্ষা বিভাগ ও সুরক্ষা সেবা বিভাগে দাখিল করা, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে গঠিত মাদকবিরোধী কমিটির কর্মপরিধি এবং সুনির্দিষ্ট একটি বার্ষিক কর্মপরিকল্পনা তৈরি করা, কমিটিকে প্রয়োজিনীয় বরাদ্দ দিয়ে জেলা প্রশাসনকে অবহিত করা, শিক্ষক প্রশিক্ষণে মাদক সংক্রান্ত সেশনের জন্য কনটেন্ট বা মডিউল তৈরি, মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ের পাঠ্যপুস্তকে মাদকের অপব্যবহারের কুফল সম্পর্কে বিদ্যমান ট্রপিক্সসমূহ আরো উন্নত ও তথ্য নির্ভর করা, ডিপিপি প্রস্তুত করে সুরক্ষা সেবা বিভাগে পাঠানো এবং সেখান থেকে পরিকল্পনা কমিশনে পাঠানো, মর্ডানাইজেশন অব ডিএনসি প্রকল্পের ডিপিপি প্রস্তুত করে সুরক্ষা সেবা হয়ে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো। জনবল ও লজিস্টিক সাপোর্ট বৃদ্ধি, প্রচার ও উদ্ধুদ্ধকরণ কার্যক্রম, ডোপটেস্ট চালু, চিকিৎসা ও পূর্নবাসন, জেলা ও উপজেলায় মাদকমুক্ত ঘোষণার কার্যক্রম গ্রহণসহ প্রশিক্ষণের কথা বলা হয়েছে।

মধ্য মেয়াদী পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে- সীমান্ত পথে মাদকের প্রবেশ রোধে বাংলাদেশ-মায়ানমারের মধ্যে সীমানা প্রাচীর নির্মাণ, অ্যালকোহল ও সরকারী-বেসরকারী নিরাময় কেন্দ্র পরিচালনা এবং কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগ ও পদন্নতি বিধিমালার খসড়া চূড়ান্ত করে মন্ত্রণালয়ে পাঠানোসহ ডিএনসির বিভিন্ন অবকাঠামো উন্নয়ন করা।

দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনার মধ্যে রয়েছে- রংপুর, খুলনা ও ময়মনসিংহ বিভাগীয় শহরে কার্যালয় নির্মাণ প্রকল্প বাস্তবায়ন, ডিএনসির প্রশিক্ষণ একাডেমি স্থাপন, ৪টি বিভাগীয় শহরে রাসায়নিক পরীক্ষাগার স্থাপন, ৭টি বিভাগীয় শহরে ২০০ শয্যা বিশিষ্ট নিরাময় কেন্দ্র স্থাপন, জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কার্যালয় নির্মাণ, মর্ডানাইজেশন অব ডিএনসি প্রকল্প বাস্তবায়ন,  প্রতিটি সরকারী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ৫০ ও বেসরকারী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ১০ শয্যা বিশিষ্ট মাদকাসক্তি চিকিৎসা ওয়ার্ড চালু, জাতীয় মানসিক রোগ ইনস্টিটিউট হাসপাতালে ৫০ শয্যার স্থানে ১০০ শয্যা চালু, পাবনা মানসিক হাসপাতালে ৩০ শয্যার স্থানে ৫০ শয্যা মাদকাসক্ত ওযার্ড চালু করা।

এ বিষয়ে ডিএনসির সহকারী পরিচালক (উত্তর) খুরশিদ আলম বলেন, এ্যাকশন প্ল্যানটি বাস্তবায়ন হলে মাদক অপরাধ দমনে ডিএনসি অধিকতর কার্যকরী প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিতি লাভ করবে। এছাড়া মাদক নিয়ন্ত্রণও সম্ভব হবে।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ