প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বিএনপির পর্যবেক্ষণে ক্ষমতাসীনরা, ইতিবাচক শরিকরা

ডেস্ক রিপোর্ট : একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে কেন্দ্র করে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের আচরণ সতর্কভাবে পর্যবেক্ষণ করছে বিএনপি। বিশেষ করে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের সাম্প্রতিক কর্মকাণ্ডে বিএনপিতে নতুন চিন্তার সঞ্চার করেছে। তবে, ওবায়দুল কাদেরর সাম্প্রতিক বক্তব্য ও বিভিন্ন দলের সঙ্গে বৈঠকের বিষয়টিকে ইতিবাচকভাবে দেখছে বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শরিক। এসব দলের নেতাতেদর ভাষ্য, বিএনপি-জামায়াতের বাইরে বাকি নিবন্ধিত দলগুলোকে নির্বাচনে দেখতে চায় সরকার। আর এই চাওয়া যতটা বাস্তবায়িত হবে, বিএনপিকে আওয়ামী লীগ ততটা চাপে রাখতে পারবে বলেও মনে করছেন তারা।

এদিকে বিএনপির নীতি-নির্ধারকরা মনে করছেন, ওবায়দুল কাদের সংলাপের কথা বললেও তা সুনির্দিষ্ট নয়। তার ‘অনানুষ্ঠানিক বা টেলিফোনে’ কথা হতে পারে, এমন বক্তব্যের কারণে সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারছেন না নেতারা।

গত শুক্রবার (২৭ জুলাই ) ওবায়দুল কাদের বলেছেন, ‘নির্বাচন নিয়ে বিএনপির সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সংলাপের প্রয়োজন নেই। তবে অনানুষ্ঠানিক সংলাপ হতে পারে। চোখের দেখা-দেখি না হোক— টেলিফোনে তো অনানুষ্ঠানিক কথাবার্তা হতে পারে। এতে করে নিজেদের দূরত্ব কমে যায়। টেলিফোনে কথা বললে সমস্যা কোথায়।’

এরপর বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এর জবাব দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমরা অনেকবার আলোচনার জন্য বলেছি। আহ্বানও করেছি। আজকে আপনাদের মাধ্যমে আবারও আহ্বান করছি। আসুন আমরা কথা বলি। কোথায় বসবেন? কী করবেন? বলুন। আমরা সবসময় প্রস্তুত আছি। তারা (আওয়ামী লীগ) ফোন করলে আমরাও ফোন করবো।’

ওবায়দুল কাদেরের কথায় সমস্যা দেখছেন বিএনপির কোনও-কোনও নেতা। আবার কারও মতে, নির্বাচনের আগে বড় রাজনৈতিক দলগুলোর এ ধরনের আচরণ স্বাভাবিক। বিএনপির নেতারা এও বলছেন, ‘সংলাপের বিষয়ে রাজনৈতিক কৌশল থাকলে, তাও অপেক্ষা করলে পরিষ্কার হবে।’

বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘এখন পর্যন্ত তিনি কী বলতে চান, সেটাই তো বুঝতে পারছি না। তিনি তো একবার সংলাপ করার কথা বলছেন, আবার বলছেন টেলিফোনেও হতে পারে। তিনি তো অনেক কথাই বলছেন। এটা তারা আগে ঠিক করুক, কী চায় তারা। মাইন্ড মেকাপ করুক তারা।’

যদিও স্থায়ী কমিটির অন্যতম সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন মনে করছেন, ‘আগামী নির্বাচনকে সামনে রেখে নানা ধরনের রাজনৈতিক তৎপরতা দেখা যায়। ক্ষমতাসীনদের বর্তমান আচরণও এর অংশ। এটা সরকারের সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভর করছে। সরকার কী করবে, সেটা সরকারের নীতি-নির্ধারকরা ঠিক করবেন।’

খন্দকার মোশাররফ হোসেন আরও বলেন, ‘বিএনপি বেশকিছু দাবিকে কেন্দ্র করে গত ১০ বছর ধরে কাজ করছে। দাবি নিয়ে আন্দোলনে আছি। নির্দলীয় সরকারের অধীনে সংসদ ভেঙে দিয়ে নির্বাচন দিতে হবে। সরকার যদি এখানে কথা বলতে চায়, সেটা তাদের ওপরই নির্ভর করছে।’

শুধু সংলাপই নয়, ক্ষমতাসীন দলের সাধারণ সম্পাদক গত এক সপ্তাহে সিপিবি, কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের সঙ্গেও কথা বলেছেন। সিপিবি কার্যালয়ে তিনি গিয়ে কথা বলেন দলটির সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম ও সাধারণ সম্পাদক আবু জাফরের সঙ্গে। আর কাদের সিদ্দিকী সচিবালয়ে যান দেখা করতে। এই দেখাদেখি নিয়েও আলোচনা আছে অনেক।

বিএনপি নেতৃত্বাধীন ২০ দলীয় জোটের শরিকদের কোনও-কোনও গুরুত্বপূর্ণ নেতা ওবায়দুল কাদেরের সংলাপের বিষয়টিকে সাধুবাদ জানাচ্ছেন। তাদের কাছে অত্যন্ত ইতিবাচক মনে হয়েছে এই বক্তব্যকে। শরিক নেতাদের কারও কারও মতে, আগামী নির্বাচনে প্রায় সবাই অংশ নিতে আগ্রহী। নির্বাচনের বাইরে অন্য কোনও ইস্যুই কাজে দেবে না বলেও ভাবছেন কোনও-কোনও নেতা।

জোটের শরিক একটি দলের চেয়ারম্যানের ধারণা, ক্ষমতাসীনরা বিএনপি ও জামায়াতের বাইরে বাকি ৩৮টি দলের সঙ্গেই যোগাযোগ করবে। প্রত্যেক দলের ও নেতাদের ভার ও গুরুত্ব বুঝে সরকারি দল ডিল করবে বলেও তাদের ধারণা।

বিষয়টি জানতে চাইলে বাংলাদেশ ন্যাপের চেয়ারম্যান জেবেল রহমান গাণি  বলেন, ‘আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের সংলাপের ইচ্ছা অত্যন্ত ইতিবাচক। গণতন্ত্রের ভাষাই হলো সংলাপ। সমঝোতা করেই সামনের দিকে এগোতে হবে। সরকার পদক্ষেপ নিলে সবাই, সারা দেশের মানুষই সাধুবাদ জানাবে। একটি অংশগ্রহণমূলক ও কার্যকর সংসদ গঠনের লক্ষ্যে সংলাপ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। আর শুধু নির্বাচনই লক্ষ্য নয়, নির্বাচনের পর কার্যকর সংসদ গঠন উদ্দেশ্য থাকতে হবে।’

বাংলাদেশ জাতীয় পার্টি (বিজেপি) চেয়ারম্যান আন্দালিভ রহমান পার্থের ভাষ্য, ‘ক্ষমতাসীনদের সংলাপ নিয়ে বক্তব্য অনেক ভালো। গুড পলিটিক্যাল প্র্যাক্টিস। আমরা তো চাই না দমন নিপীড় হোক, আমরা চাই সংলাপ। সবাই সংলাপ চায়। তারা মুখে যাই বলুক, টেলিফোনে বা সরাসরি, এটাও ভালো। আমি তো মনে করি, রাজনীতিতে সংলাপই সবচেয়ে ইতিবাচক।’

বিএনপির দায়িত্বশীল একাধিক সূত্র জানায়, ওবায়দুল কাদের যেমন সংলাপের আমন্ত্রণ জানিয়েছেন, এই চর্চা বিএনপির মধ্যেও আছে। বিগত ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির নির্বাচনের আগেও তৎকালীন সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের সঙ্গে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের বৈঠক হয়েছিল।

ওই বৈঠক জাতিসংঘের তৎকালীন সহকারী মহাসচিব অস্কার ফার্নান্দেজ তারানকো’র মধ্যস্থতার হয়েছিল। সংলাপ ফলপ্রসূ হয়নি উল্লেখ করে বিএনপি অভিযোগ করে, আওয়ামী লীগ সংলাপের কথা রাখেনি।

এরপর ২০১৫ সালে খালেদা জিয়ার ছোট সন্তান আরাফাত রহমান কোকোর মৃত্যু হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গুলশানে গেলেও তাকে গেট থেকে ফিরিয়ে দেওয়ার মধ্য দিয়ে নতুন করে অসৌজন্যতা সৃষ্টি হয়। যদিও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ৯০ সালে ক্ষমতায় এসে ও ২০০১ সালে তারেক রহমান টুঙ্গিপাড়ায় বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের মাজার জিয়ারত করেন। এ বিষয়গুলো রাজনৈতিকভাবে ইতিবাচক দৃষ্টান্ত দৃষ্টি করে। সেক্ষেত্রে দু’দলের মধ্যেই যে সংস্কৃতি বিগত কয়েক বছরে সামনে এসেছে, সে পরিস্থিতিতে নতুন করে সংলাপের মতো আন্তরিক বৈঠক কতটা বাস্তবায়ন হবে, তা প্রশ্নসাপেক্ষ।

বিএনপির চেয়ারপারসন কার্যালয়ের প্রভাবশালী একটি সূত্রের ভাষ্য, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার উদ্যোগেই দেশের চলমান অসহিষ্ণুতা ও নির্বাচনকেন্দ্রিক জটিলতা দূর না হলে ভবিষ্যতে সমস্যা আরও চেপে বসবে। সেক্ষেত্রে বয়স ও বর্তমান সময় বিবেচনা করে দুই নেত্রীই নির্বাচনকালীন একটি সর্বজনীন গ্রহণযোগ্য পথ তৈরি করবেন, এমন প্রত্যাশার কথাও জানিয়ে রাখলো সূত্রটি।

বিএনপির স্থায়ী কমিটির একজন সদস্য মনে করছেন, গত ২৫ জুলাই জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ ভারতসফর করে আসার পরই সরকারের মধ্যে অস্বস্তি বেড়েছে। বিশেষ করে এরশাদের নিশ্চুপ অবস্থা এই অস্বস্তিকে বাড়িয়ে তুলছে বলেও মনে করেন এই নেতা। তিনি বলেন, ‘ভারত সফর নিয়ে এরশাদ কিছু বলছেন না বরং সংবাদ সম্মেলন করে তার দলের মহাসচিব জানিয়েছেন, ‘ভারত এদেশে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন দেখতে চায়।’

বিএনপি-জোটের নেতা জেবেল রহমান গাণি বলেন, ‘দেশের গণতন্ত্রের সংজ্ঞা কিন্তু অনেকটাই পরিবর্তিত। এখন গণতন্ত্র মানে অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন, কার্যকর সংসদ।’
সূত্র : বাংলা ট্রিবিউন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত