প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ফুটবলে ৬৫ লাখ টাকা পাওয়া ইমনের গল্প

স্পোর্টস ডেস্ক : নতুন মৌসুমে ৬৫ লাখ টাকায় আবাহনী লিমিটেড ছেড়ে বসুন্ধরা কিংসে নাম লিখিয়েছেন মিডফিল্ডার ইমন। বিকেএসপিতে বসে ৬৫ লাখ টাকা অর্জনের পেছনের কষ্টের গল্পটা শোনালেন তিনি।
‘বাহ, বসার পরিবেশটা তো খুবই সুন্দর’—বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের (বিকেএসপি) ক্যাফেটেরিয়ার বারান্দায় বসে তাঁর গলায় মুগ্ধতা ঝরল। দেশের বয়সভিত্তিক জাতীয় দল এবং ক্লাবের হয়ে অনুশীলন ক্যাম্পের জন্য সেই ২০০৪ সাল থেকে তাঁর বিকেএসপিতে আসা-যাওয়া। ট্রেনিজ হোস্টেল (থাকার জায়গা) থেকে দুই মিনিট হাঁটা দূরত্বে ক্যাফেটেরিয়ার অবস্থান। অথচ এত বছরে কখনোই ক্যাফেটেরিয়ায় এসে বসা হয়নি! জাতীয় দলের মিডফিল্ডার ইমন বাবু এমনই, মাঠের বাইরে তাঁর জীবনের পরিধিটা খুবই ছোট।

২০০৯ সাল থেকে জাতীয় দলে খেললেও কখনোই পাদপ্রদীপের আলোয় আসা হয়নি ইমনের। অথচ প্রায় কয়েক বছর ধরে বাংলাদেশের সেরা ফুটবলার কে? এই প্রশ্ন উঠলে তাঁর নামটাই আসবে সবার আগে। কিন্তু একেবারেই আড়ালে থাকতে পছন্দ করেন বলে প্রচারের আলোটা তাঁর গায়ে লাগে না। অবশ্য এবারের প্রেক্ষাপট একেবারেই ভিন্ন। দেশীয় ফুটবলার হিসেবে রেকর্ড পরিমাণ টাকায় আবাহনী লিমিটেড ছেড়ে নবাগত বসুন্ধরা কিংসে নাম লিখিয়েছেন এই মিডফিল্ডার। টাকার অঙ্কটা ৬৫ লাখ।
ইমনের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তাই স্বাভাবিকভাবে প্রশ্নটি এসে গেল, বাংলাদেশে ফুটবল খেলে এত টাকা পাবেন, কখনো আশা করেছিলেন? হাসিমাখা কণ্ঠে তাঁর জবাব, ‘আমি তো বন্দুক ঠেকিয়ে ৬৫ লাখ টাকা নেইনি। ফুটবল খেলেই তো ৬৫ লাখ টাকা পাওয়া উচিত। আর টাকাটা তো ক্লাব আমাকে হাসিমুখেই দিচ্ছে।’

বাংলাদেশের ফুটবলার ৬৫ লাখ টাকা পাওয়ার যোগ্য কি না, সে তর্কে যাচ্ছি না। কিন্তু খেলোয়াড় হিসেবে মিডফিল্ডার ইমন কেমন? জবাব পেতে ফিরে যান বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে দুবছর আগের এক সন্ধ্যায়। ২০১৫-১৬ মৌসুমে আবাহনী লিগ শিরোপা জয়ের পর অস্ট্রিয়ান কোচ জর্জ কোটানকে জিজ্ঞাসা করা হয়েছিল, আপনার দলের শিরোপা জয়ের পেছনে কার অবদান সবচেয়ে বেশি? বাংলাদেশের জাতীয় ফুটবল দলের ইতিহাসে সেরা এই কোচের সাফ জবাব, ‘অবশ্যই ইমন। সে-ই আমার দলের সেরা খেলোয়াড়।’ অথচ কোটানের সে দলে ইংলিশ লি টাকের মতো খেলোয়াড়ও ছিলেন।

আসলে কুশলী মিডফিল্ডার বলতে যা বোঝায়, তা-ই হলেন ইমন। দর্শকের মন কেড়ে নেওয়ার মতো পায়ে কারিকুরি দেখা যায় না। কিন্তু তাঁর পা থেকে মিস পাস দেখলে চোখ কচলে বিশ্বাস করতে হয়, মিস পাস দিয়েছেন ইমন! সবচেয়ে বড় যোগ্যতা, ক্ষুরধার পাসে প্রতিপক্ষের জমাট রক্ষণের তালা খুলে দিতে পারেন অনায়াসে। তাই দলের স্ট্রাইকারদের কাছে ইমনের কদরটা একটু বেশিই। বিশেষ করে বিদেশি স্ট্রাইকারদের কাছে। বিদেশি কোচদের পছন্দের তালিকাতেও থাকেন সব সময় শীর্ষে। যাঁর হাত ধরে ২০০৯ সালে জাতীয় দলে অভিষেক হয়েছিল ইমনের, সেই ব্রাজিলিয়ান কোচ এডসন সিলভা ডিডোর পক্ষ থেকে তাঁকে বাইরের দেশে লিগ খেলানোর চেষ্টাও করা হয়েছিল একবার।

সে যা-ই হোক, বাংলাদেশের ফুটবলের প্রেক্ষাপটে ৬৫ লাখ টাকার অঙ্কটা চমকের মতোই। ইমন তা নিজেও মানছেন। কিন্তু চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে আজকের এই দিনটা পাওয়ার আগে তাঁর সংগ্রামের কথাগুলোও শোনালেন। তিন বছর আবাহনী ও তার আগে এক বছর মোহামেডানে খেলার আগে এক নামী ক্লাবে ছিলেন তিনি। তাও আবার সে ক্লাবে ছিলেন টানা চার বছর। মোটা অঙ্কের চুক্তি থাকলেও ইনজুরির কারণে অনিয়মিত হওয়ায় টাকা পেয়েছেন হাতে গোনা। বরং অপারেশন ও যাবতীয় চিকিৎসা করাতে হয়েছিল নিজের টাকা দিয়েই। সুস্থ হয়ে মাঠে ফেরার পরেও ক্লাব কর্তাদের ভাষ্য ছিল, ‘আগে নিজেকে প্রমাণ করে দেখাও তুমি সুস্থ। এরপর টাকা চাইয়ো মিয়া।’

সেই কষ্টের দিনগুলোর কথা স্মরণ করিয়ে দিয়ে ক্যাফেটেরিয়ার সুন্দর পরিবেশ কিছুটা ভারী করে ফেললেন ইমন, ‘আজ আমাকে এত টাকা দিয়ে একটা ক্লাব নিয়েছে। অথচ কয়েক বছর আগে আমি টাকার অভাবে চিকিৎসা করাতে পারছিলাম না। ক্লাব কর্তাদের দ্বারে ঘুরেছি, কেউ পাত্তা দেয়নি। আমার সামনে সবাইকে বেতন-বোনাস দেওয়া হতো। আমি শুধু চেয়ে চেয়ে দেখে কষ্টই পেয়েছি। আসলে কষ্টের গল্প তো কেউ শুনতে চায় না।’ -শীর্ষন্উজ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত