প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মোহমুক্তির রাজনীতির নায়ক ইমরান খানকে অভিনন্দন

মোহাম্মদ আলী বোখারী, টরন্টো থেকে
প্রায় দুই দশাধিক সময়ের চড়াই-উৎরাইয়ের রাজনীতির ময়দানে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শিগগিরই শপথ নেবেন বিশ্বের কিংবদন্তি ক্রিকেট তারকা ইমরান খান। এক ভূমিধ্বস বিজয়ে তার দল ‘পাকিস্তান তেহরিক-এ-ইনসাফ’ পার্লামেন্টে প্রথমবারের মতো সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেয়েছে; যদিও সমালোচকরা বলছেন সামরিক বাহিনীর সহযোগিতায় তার এ উত্থান ঘটেছে।
ইমরান খান ইতোমধ্যে জাতীয় ঐক্যের পটভূমি রচনায় বলেছেন, দেশের প্রচলিত দুর্নীতি সর্বাত্মকভাবে নির্মূল করবেন, চীনের সঙ্গে সম্পর্কোন্নয়ন করবেন, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে স্বার্থ পরিপূরণপূর্ণ সম্পর্ক গড়বেন, মধ্যপ্রাচ্যের ঐক্যবদ্ধতা গড়তে নিয়ামক ভূমিকা রাখবেন, আফগানিস্তান ও ইরানের সঙ্গে উত্তরোত্তর সম্পর্কের বিকাশ ঘটাবেন এবং ভারতের সঙ্গে তাদের এক কদমের বিনিময়ে দুই কদম এগিয়ে বাণিজ্য ও সৌহার্দ্যরে সম্পর্ক গড়বেন। পাশাপাশি মহানবী মোহাম্মদ (সা.)-এর অনুসৃত কল্যাণরাষ্ট্রের আলোকে সাধারণ মানুষের জীবন-মান উন্নয়নে উদ্যোগী হবেন। কর ব্যবস্থার সংস্কার, প্রবাসী বিনিয়োগ, যুব কর্মসংস্থানের উদ্যোগ, এমনকী রাষ্ট্রায়ত্ব প্রাসাদ ভাড়ায় দিয়ে রাষ্ট্রের অর্থপ্রবাহ ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করবেন। আর এ সকল ওয়াদা বাস্তবায়নে নিজের প্রতিশ্রুত ক্যান্সার হাসপাতাল ও বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠার উদাহরণ টেনে জাতিকে সে বিষয়ে আশ্বস্ত করেন। একইসঙ্গে আপন অবস্থান থেকে অপরাপরদের মাঝে জবাবদিহিতাপূর্ণ কাঠামোয় ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার গুরুত্বারোপ করে বলেন, ‘আমরা পাকিস্তানে এমন এক শাসনব্যবস্থা গড়বো যা আগে কখনো ঘটেনি’। তিনি প্রধানমন্ত্রীর প্রাসাদে থাকবেন না, কারণ আপামর মানুষের দারিদ্র্য বিবেচনায় তা হবে তার জন্য ‘অস্বস্তিকর’।
নিঃসন্দেহে এ এক চমৎকার দায়বদ্ধপূর্ণ ঘোষণা এবং জনগণের কল্যাণে সেবাব্রতী অঙ্গীকার! তাতে যেমন কেউ দ্বিমত করবেন না, তেমনি জনগণের মাঝে প্রাণসঞ্চারপূর্ণ সাড়া জাগানোও দুরূহ নয়। তবু রাজনীতি বলে কথা! সেজন্য কথা উঠেছে, তার উত্থানের পেছনে রয়েছে সামরিক বাহিনী। এতে গণসচেতনতামুখী ‘ডিজিটাল রাইটস ফাউন্ডেশন’-এর নির্বাহী পরিচালক নিগাদ দাদ গণমাধ্যমকে বলেছেন, ‘দ্য ওয়ে দিস স্টেজ হ্যাজ বিন সেট, ইট উড হ্যাভ বিন এ সারপ্রাইজ ইফ হি ডিড নট উইন’। অর্থাৎ যেভাবে নাটক মঞ্চস্থ হয়েছে, তাতে তার বিজয় না ঘটলে বিস্ময় জাগতো। আসলেই কী নাটক হয়েছে? ইমরান খানের দাবি, এই নির্বাচন সবচেয়ে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ হয়েছে; কেননা নির্বাচন পরিচালনাকারী তত্ত্বাবধায়ক সরকার ছিল সকলের সমর্থিত। অন্যদিকে, নির্বাচনের অনেক আগেই খবরাখবরে তার দল জনপ্রিয়তার মানদ-ে এগিয়ে ছিল; যদিও তা রক্তপাতহীন হয়নি, বরং অনাকাক্সিক্ষত রক্ত ও প্রাণ বিসর্জন ঘটেছে। লক্ষণীয় দিকটি হচ্ছে, এমন এক সময়ে তার এ উত্থান, যখন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পাকিস্তানকে ‘তালেবান, আল কায়েদা এবং আফগানিস্তান ও পাকিস্তানে অন্য জঙ্গি’ বিষয়ে মিথ্যার দায়টি চাপিয়েছেন। ইমরান খান সে অভিযোগ অস্বীকার করে বরং তার দেশে যুক্তরাষ্ট্রের নির্বিচার ড্রোন হামলা বন্ধের দাবিটি তুলেছেন। আর পশ্চিমা মিডিয়ায় ইমরান খানের পরিচিতি, ৬৫ বছর বয়সী এ মানুষটি প্রাণবন্ত ও চিত্তাকর্ষক, তবু তর্জনগর্জনপূর্ণ ও ভাবীকথকহীন। তথাপি দেখা যাচ্ছে, রাজনীতি ও অর্থনীতিতে অক্সফোর্ডের এই গ্র্যাজুয়েট ওয়েস্ট ইয়র্কশায়ারে ব্রিটেনের চল্লিশতম বিশ্ববিদ্যালয় ইউনিভার্সিটি অব ব্র্যাডফোর্ডের সাবেক চ্যান্সেলর, নিজের প্রয়াত মায়ের নামে প্রতিষ্ঠিত অত্যাধুনিক শওকত খানম মেমোরিয়াল ক্যান্সার হসপিটাল অ্যান্ড রিসার্চ সেন্টারের চেয়ারম্যান এবং নিজের দল পাকিস্তান তেহরিক-এ-ইনসাফের চেয়ারম্যান। একমাত্র তিনিই পাকিস্তানের রাজনীতিতে প্রথমবারের মতো মিডিয়ায় একাত্তরে বাংলাদেশে সংঘটিত গণহত্যার বিষয়ে সোচ্চার অভিমত ব্যক্ত করেছেন। ২০০২ সালের ১৪ জানুয়ারি মধ্যপ্রাচ্যের দৈনিক পত্রিকা আরব নিউজে ‘হোয়াই দ্য ওয়েস্ট ক্র্যাভস ম্যাটারিয়ালিজম অ্যান্ড হোয়াই দ্য ইস্ট স্টিকস টু রিলিজিয়ন’ অর্থাৎ পাশ্চাত্য কেন বস্তুবাদে এবং প্রাচ্য কেন ধর্মে অনুরক্ত’ শিরোনামে নিবন্ধ লিখেন; যা এখনও ইন্টানেটে রয়েছে। এতে তিনি লিখেছেন, তিনি যে প্রজšে§র সেসময়ে ব্রিটিশ ঔপনিবেশিকতার প্রভাব ছিল তুঙ্গে। আগের প্রজš§ ছিল তাদের দাস; ব্রিটিশদের প্রতি তারা ছিল হীনমন্য। ফলে দেশ স্বাধীন হলেও স্কুল থেকে প্রকৃত পাকিস্তানি হয়ে কেউ বেরোয়নি। বলেছেন, আমি শেকসপিয়ার পড়েছি, কিন্তু আল্লামা ইকবাল পড়িনি। ইসলাম শিক্ষাকে গুরুত্ব দেয়া হয়নি। স্কুল যখন শেষ করেছি তখন ‘এলিট’ হিসেবে সমাজে বিবেচিত হয়েছি, কেননা ইংরেজি বলতে পারি এবং পাশ্চাত্যের পোশাক পড়ি। এভাবে ওই নিবন্ধে সম্বিত জাগিয়ে ইউরোপ-আমেরিকার জীবনধারায় ইসলামের নানা দিক তুলে ধরেছেন। সবশেষে ইসলামের মহীমা নিয়ে বলেছেন, পাকিস্তানের পাশ্চাত্য জীবনযাত্রার মানুষেরা ইসলামকে অনুশীলন করলে তারা শুধু সমাজকে উপকৃত করবে না, বরং দ্বিধাবিভক্তি ও মৌলবাদের বিরুদ্ধে লড়তে পারবে, একই সাথে ইসলামের প্রগতিশীল অবস্থানকে উপলব্ধি করবে। পাশ্চাত্য বিশ্বের কাছেও ইসলামের ধারণাকে তুলে ধরতে পারবে। সবশেষে, তার ওই বিজয় ভাষনে তদানীন্তন পূর্ব পাকিস্তান অর্থাৎ বর্তমান বাংলাদেশে বসবাসের কথাটি উচ্চারণ করেছেন। উপরন্তু, ১৯৮৯ সালের ২৭ সেপ্টেম্বর ইমরান খান ইউনিসেফ-এর ক্রীড়াবিষয়ক বিশেষ প্রতিনিধি হিসেবে ঢাকায় অনুষ্ঠিত ‘আপনার শিশুকে টিকা দিন’ কর্মসূচীর প্রচারণায় রোটারি আন্তর্জাতিকের যুবসংগঠন রোটার‌্যাক্ট ক্লাবসমূহের একমাত্র জনসমক্ষে আয়োজিত ‘রোটাস্পোর্টস এইড’ ম্যারাথনের অংশগ্রহণকারীদের উৎসাহ জুগিয়েছেন, যা ব্যাপকভাবে মিডিয়ায় সমাদৃত হয়। এতে ডিস্ট্রিক্ট রোটার‌্যাক্ট রিপ্রেজেন্টিটিভ হিসেবে এই নিবন্ধকার ওই কর্মসূচীর নেতৃত্বদানসহ সোনার গাঁও হোটেলে উদ্যোক্তাদের নিয়ে তার সঙ্গে মিলিত হন। সে সময় সেখানে বাংলাদেশে নিযুক্ত ইউনিসেফ কান্ট্রি রিপ্রেজেন্টিটিভ কোল পি ডজ উপস্থিত ছিলেন। সেই দৃষ্টিকোণ থেকে তার ২২ বছরের রাজনীতির সার্থকতার প্রতি জানাই উষ্ণ অভিনন্দন!
ই-মেইল: নঁশযধৎর.ঃড়ৎড়হঃড়@মসধরষ.পড়স

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ