Skip to main content

কয়লা চুরির নাটের গুরু!

রবিন আকরাম : বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি থেকে ২২৭ কোটি টাকা মূল্যের এক লাখ ৪৪ হাজার টন কয়লা উধাওয়ের ঘটনায় দেশঝুড়ে সমালোচনায় তুঙ্গে। কিভাবে এই কয়লা চুরি হলো, কারা এর সাথে ঝড়িত এ নিয়ে চলছে মাতামতি! স্থানীয়রা মনে বলছেন, কয়লা গায়েবের যে তথ্য প্রকাশিত হয়েছে, চুরির পরিমাণ তার চেয়ে অনেক বেশি। বিশিষ্টজনেরা মনে করছেন- সুষ্ঠু তদন্ত করলে কয়লা চুরির আরও ঘটনা বেরিয়ে আসবে। এদিকে এই চুরির ঘটনায় ১৯ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে পার্বতীপুর থানায় করা মামলার নথি হাতে পেয়েছে দুদক। এ সংস্থার দিনাজপুর জেলা সমন্বিত কার্যালয়ের উপ-পরিচালক বেনজীর আহম্মেদ জানান, বুধবার রাতে মামলার নথিটি পার্বতীপুর মডেল থানা থেকে পাওয়ার পর বৃহস্পতিবার তা দুদকের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকেই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নিযুক্ত হবেন। তিনি আরও জানান, মামলার তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগের পর পরবর্তী কার্যক্রম শুরু হবে। বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিতে মজুদ ছিল মাত্র ৩ হাজার টন কয়লা। অর্থাৎ ১ লাখ ৪৪ হাজার ৬৪৪ দশমিক ৪০ টন ঘাটতি রয়েছে যার আনুমানিক মূল্য প্রায় ২৩০ কোটি টাকা। ২৩ জুলাই সোমবার বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি এলাকা পরিদর্শন করে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) দিনাজপুর সমন্বিত কার্যালয়ের উপ-পরিচালক বেনজীর আহম্মেদও জানান, কাগজে-কলমে রয়েছে ১ লাখ ৪৬ হাজার টন অথচ বাস্তবে রয়েছে ২ হাজার টন কয়লা। যাতে করে প্রায় ১ লাখ ৪৪ হাজার টন কয়লার কোনো হদিস নেই। স্থানীয় অধিবাসী রফিকুল ইসলাম দাবি করেন- খনিতে কয়লা চুরি নতুন নয় বা একদিনে হয়নি। দীর্ঘদিন ধরেই এ কয়লা চুরি করে আসছেন কর্মকর্তারা। এদের মধ্যে খনির একজন মহাব্যবস্থাপক। তিনিই মূলত নাটের গুরু। দীর্ঘদিন ধরে চাকরির সুবাধে তিনি বিভিন্ন লোকজনের সঙ্গে আঁতাত করে দুর্নীতির পাহাড় গড়ে তুলেছেন। বেশিরভাগ সময় অবস্থান করেন ঢাকায়ই। পেট্রোবাংলায়ই তার ব্যাপক প্রভাব ও প্রতাপ। দৈনিক একটি পত্রিকার তথ্য মতে, কয়লা উধাওয়ের নাটের গুরু বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানির (বিসিএমসিএল) সদ্য সাবেক জিএম (প্রশাসন) ও কোম্পানি সচিব আবুল কাশেম প্রধানিয়া। পেট্রোবাংলার তিন সদস্যের তদন্ত কমিটির জমা দেয়া রিপোর্ট এবং জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে এর সত্যতা মিলেছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন জানান, ২০১৭ সালে খনি থেকে ৩০০ টন কয়লা চুরি হয়েছিল। পরে বিষয়টি ফাঁস হলে খনির কর্মকর্তারা রাতারাতি সেই ৩শ’ টন কয়লার টাকা ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমা দিয়ে সমন্বয় করেন। কয়লা খনি থেকে প্রতিবছরই ইটভাটা মালিকদের কাছে ১০০ টন করে কয়লা বিক্রি করা হয়। কিন্তু এ বিক্রিতেও দুর্নীতি করা হয়। কাউকে হাজার হাজার টন কয়লা দেয়া হয়েছে। আবার কারও ভাগ্যে জোটেনি এক ছটাক কয়লাও। দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের যোগসাজশেই এটি হয়েছে বলে দাবি তার। ভুগর্ভস্থ কয়লা খনি থেকে অনবরত পাম্পের মাধ্যমে পানি নিষ্কাশন করা হয়। এই পানি এসে জমা হয় কয়লা খনির ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টে। সেখানে কয়লার ডাস্ট (ক্ষুদ্রাকৃতি কয়লা) জমা হয়। এ কয়লা পুনরায় শুকিয়ে আবার জমা করা হয় কোল ইয়ার্ডে। কিন্তু যে পরিমাণ ডাস্ট কয়লা কোল ইয়ার্ডে জমা হয় তার কোনো হিসাব রাখা হয় না। এ কয়লা অবৈধভাবে বিক্রি করে দেয়া হয়। কয়লা ব্যবসায়ী আনোয়ার হোসেন বলেন, ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টে যে কয়লা জমা হয় তা ঠিকাদারের মাধ্যমে শুকিয়ে কোল ইয়ার্ডে জমা করা হয়। এ প্লান্ট থেকে বছরে প্রায় ১৬ থেকে ২০ হাজার টন কয়লা উৎপাদন করা হয়। কিন্তু এ হিসাব কাগজে-কলমে রাখা হয় না। কোল ইয়ার্ড থেকে অবৈধভাবে এসব কয়লা বিক্রি করেন কর্মকর্তারা। তিনি জানান, বর্তমানে অভিযোগ করা হচ্ছে কয়লা চুরি হয়েছে এক লাখ ৪৪ হাজার টন। কিন্তু ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টে জমা হওয়া কয়লার হিসাব করলে দেখা যাবে এ কয়লা চুরির পরিমাণ অনেক বেশি। একই কথা জানান, কয়লা খনির ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টে জমা হওয়া কয়লা শুকিয়ে সরবরাহ করা সাবেক ঠিকাদার মিজানুর রহমান। তিনি জানান, গত প্রায় ৭-৮ বছর ধরে ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্লান্টে কয়লা জমা করা হচ্ছে। এ সময়ের মধ্যে জমাকৃত ডাস্ট কয়লার পরিমাণ প্রায় সোয়া লাখ থেকে দেড় লাখ টন হবে। এ হিসাব উধাও হওয়া ১ লাখ ৪৪ হাজার টন কয়লার বাইরে। প্রসঙ্গত, চলতি মাসের ২২ জুলাই দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি থেকে উত্তোলন করে রাখা ১ লাখ ৪২ হাজার টন কয়লা গায়েব হয়ে গেছে। বর্তমান বাজার মূল্যে এই কয়লার দাম ২২৭ কোটি টাকার ওপরে।

অন্যান্য সংবাদ