Skip to main content

হুমায়ূন আহমেদকে অধিকাংশ মানুষের মতো আমিও  চিনতাম পাঠক হিসেবে

ড. আসিফ নজরুল : হুমায়ূন আহমেদকে অন্য অধিকাংশ মানুষের মতো আমিও প্রথম চিনতাম পাঠক হিসেবে। পরে একটি লেখাকে কেন্দ্র করে সারা দেশে আইনজীবীরা তাঁর বিরুদ্ধে মামলা শুরু করলে তিনি একদিন বিচিত্রা অফিসে চলে আসেন। বিচিত্রায় তখন কাজ করতেন শাহাদত চৌধুরী, শাহরিয়ার কবির আর চিন্ময় মুৎসুদ্দীর মতো তাঁর ঘনিষ্ঠ মানুষেরা। সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো, তাঁর বিরুদ্ধে মামলাগুলোকে উপজীব্য করে একটি প্রচ্ছদকাহিনি রচনার। ‘সাহিত্য বনাম আদালত’ নামের সেই লেখাটি লিখতে গিয়ে তাঁর সঙ্গে আমার ঘনিষ্ঠতার সূচনা। ঘনিষ্ঠতা হয় তাঁর পরিবারের সঙ্গেও। লেখক হিসেবে উত্থানকাল থেকে মধ্যগগন পর্যন্ত হুমায়ূনকে সবচেয়ে অবিরামভাবে দেখেছেন তাঁর তখনকার জীবনসঙ্গী। তাঁর দৃষ্টিতে হুমায়ূন আহমেদ কেমন, এ রকম একটি প্রচ্ছদকাহিনি আমি বিচিত্রার জন্য লিখেছিলাম আজ থেকে ২৪ বছর আগে। মনে আছে, ‘গুলতেকিনের চোখে হুমায়ূন আহমেদ’ শিরোনামে এই লেখাটির ধারণা আমি দেওয়ামাত্র হুমায়ূন নিজেই আগ্রহী হয়ে উঠেছিলেন। তিনি গুলতেকিনকে ‘যা ইচ্ছে বলো’ এমন কথা বলে বলে সাক্ষাৎকারটি দিতে রাজি করান। সাক্ষাৎকার নেওয়ার ফাঁকে ফাঁকে ‘দু-একটা ভালো কথাও কি বলেছ,’ এ ধরনের রসিকতা করেছেন। চারপাশের মানুষজনকে ‘ভাই রে, গুলতেকিন বোধ হয় ডুবিয়ে দিচ্ছে আমাকে’ বলে নিজেই প্রচুর আনন্দ করেছেন। তখনকার সময়ে প্রবল সমাদৃত এই লেখার কিছু অংশ সংক্ষেপিতভাবে এখানে তুলে দিচ্ছি ব্যক্তি ও লেখক হুমায়ূন সম্পর্কে নতুন প্রজন্মের ভক্তদের জানার আগ্রহের কথা ভেবে। বিচিত্রা: হুমায়ূন আহমেদ লেখালেখি করার সময় আপনি কাছে থাকেন? গুলতেকিন: কাছাকাছি বসে থাকি। ও যখন এক পৃষ্ঠা লেখে, তখনই পড়ে ফেলি। বেশির ভাগ সময় অবশ্য শীলাই পড়ে। বিচিত্রা: তিনি যেভাবে লেখার পরিকল্পনা করেন, সেভাবে লিখতে পারেন? গুলতেকিন: মাঝে মাঝে পারে না। বিশেষ করে উপন্যাসের শেষের অংশগুলো। হুমায়ূন বলে কেউ একজন তাকে দিয়ে এভাবে উপন্যাসটা শেষ করিয়ে নেয়। তার কিছু করার থাকে না। বিচিত্রা: আপনি লেখার সমালোচনা করলে কী করেন তিনি? গুলতেকিন: রেগে যায়। বিচিত্রা: রেগে যায়? গুলতেকিন: হ্যাঁ। একেক সময় একেকভাবে রাগে। হয়তো আমি লেখা পড়ে কিছু বললাম না। ও জিজ্ঞেস করলে বললাম, ভালোই! ও রেগে বলে, ভালোই মানে কী? হ্রস্ব-ই কেন? তখন যদি বলি, এখনো তো লেখাটা শেষ করোনি। ক্যারেক্টার সেভাবে ডেভেলাপ হয়নি। সে বলে, ভাত তো একটা টিপে দেখলেই বোঝা যায়! আমি হয়তো বলি, এমন কাহিনি তো আগেও লিখেছ। সে কিছুক্ষণ তর্ক করে। তারপর চুপচাপ গম্ভীর হয়ে বসে থাকে। কিছুক্ষণ পর নিজেই লেখা চেঞ্জ করে। বা হয়তো দশ-বারো পৃষ্ঠা লেখা হলে ছিঁড়েই ফেলে। বিচিত্রা: সম্ভবত অনেক বেশি লেখেন বলে তাঁর লেখায় ঘটনার রিপিটেশন হয়, কিছু চরিত্রের বিন্যাস একই রকম? গুলতেকিন: ওকে আমি বলেছি। ও বলে, দেখো, লিমিটেশনের ঊর্ধ্বে কেউ না। বিভূতিভূষণও অপু ধরনের চরিত্রের বাইরে যেতে পারেননি। বিচিত্রা: কোনো কোনো সমালোচক বলেন, হুমায়ূনের লেখায় গভীরতা নেই। আপনার তা মনে হয়েছে? গুলতেকিন: হয়নি। গভীরতা আসলে কী? গভীরতা মানে কি কঠিন কঠিন কিছু কথা বলা? কঠিন করে বলা? আমি নিজে এর পক্ষপাতী নই। বিচিত্রা: হুমায়ূনের মধ্যে হিমু ও মিসির আলী বিপরীতমুখী এ দুজনকেই পান?গুলতেকিন: পাই। অনেক বইয়ের মধ্যেই তার ঘটনা, অভিজ্ঞতা তার কথা চলে আসে। আমার মনে হয়, নি ছাড়া তার পুরো কাল্পনিক কোনো উপন্যাস নেই। ও নিজে খুব বৈচিত্র্যপ্রেমী। এর ছায়া কোনো না কোনোভাবে উপন্যাসে আসে। বিচিত্রা: তাঁর মধ্যে একটা শিশুও আছে। তাই না? গুলতেকিন: হ্যাঁ আছে, কখনো এত সরল ও, নিজের পুরোনো বই পড়েই কাঁদতে থাকে। বলে, এত ভালো লিখেছি আমি! আনন্দে থাকলে যে কী করে। আমাদের ঘুরতে নিয়ে যায়, খাওয়াতে। আরও কত ছেলেমানুষি আছে ওর। খুব গভীরে একটা গুড সোল আছে ওর। পরিচিতি: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় / ফেসবুক থেকে

অন্যান্য সংবাদ