প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আরও লক্ষাধিক টন কয়লা গায়েবের অভিযোগ
‘সত্যিকার অর্থে কয়লা ঘাটতি হলে তার দায়-দায়িত্ব কর্মকর্তাদের’

উম্মুল ওয়ারা সুইটি ও দিনাজপুর প্রতিনিধি: প্রথম দফায় দেড় লাখ মেট্রিক টনের পর বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি থেকে আরো দেড় লাখ মেট্রিক টন কয়লা গায়েবের অভিযোগ উঠেছে। এদিকে গতকাল সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের শীর্ষ পর্যায়ের নেতৃবৃন্দ কয়লা খনি সরেজমিন পরিদর্শন করে বলেছেন, সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহ থেকে বিকল্প যে কোন উপায়ে তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালু করা হবে। পরিদর্শক টিম বলেছে, বড়পুকুরিয়া খনি থেকে বিপুল পরিমাণ কয়লা উধাও হয়ে যাওয়ার ঘটনায় প্রাথমিকভাবে মজুতের তথ্যগত ভুল থাকার প্রমাণ পাওয়া গেছে।

শুক্রবার সকালে বন্ধ হওয়া তাপ বিদ্যুত কেন্দ্র ও বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি পরিদর্শনে যান জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব ড.আহম্মেদ কালকাউস, বিদ্যুৎ সচিব আবু হেনা মোঃ রহমাতুল মুনিম, পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আবুল মনসুর মোঃ ফয়জুল্লাহ ও পিডিবির চেয়ারম্যান খালেদুল ইসলাম।  সকাল ৯টা থেকে প্রায় আড়াই ঘন্টা তারা তাপ বিদ্যুত কেন্দ্র  ও বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি এলাকা ঘুরে দেখে কর্মকর্তাদের সাথে কথা বলেন। এ সময় তাপ বিদ্যুত কেন্দ্রের প্রধান প্রকৌশলী আঃ হাকিম সরকার ছাড়াও বিদ্যুত বিভাগের উর্ধতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

জ্বালানি সচিব ড.আহম্মেদ কালকাউস বলেছেন, কোল ইয়ার্ডে কয়লা না থাকায় বাধ্য হয়ে বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি। আগামী সেপ্টেম্বর মাসের প্রথম সপ্তাহের দিকে তাপ বিদ্যুত কেন্দ্রটি চালু করা সম্ভব হবে। এর মধ্যে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির নতুন ফেজে কয়লা  উত্তোলন শুরু হয়ে যাবে। বিকল্প উপায়ে যেকোনও সময় দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়ার তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্র চালু হতে পারে। এছাড়া বিদ্যুৎকেন্দ্রের সবার ঈদের ছুটি বাতিল করেছেন তিনি।

জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের  সচিব আবু হেনা রহমাতুল মুনিম বলেন, রংপুর বিভাগের পিক আওয়ারে বর্তমানে ১০০ থেকে ১৫০ মেগাওয়াট বিদ্যুত ঘাটতি রয়েছে। তার পরেও দূর্ভোগ মোকাবেলায় সরকার অন্য বিদ্যুত কেন্দ্র গুলোর উৎপাদন বাড়িয়ে দিয়ে রংপুর অঞ্চলে সরবরাহ করছে। তিনি বলেন, বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির ইয়ার্ড থেকে ১লাখ ৪৪ হাজার মেট্রিক টন কয়লা উধাও ঘটনায় ১৯ জনকে আসামী করে পার্বতীপুর থানায় দায়ের হওয়া মামলাটি দুদক তদন্ত করছে।

এছাড়াও পেট্রোবাংলারও একটি টিম তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিয়েছে। প্রাথমিক তদন্তে ঘটনার সত্যতা পাওয়া গেছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এর আগে তারা বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির কোল ইয়ার্ড পরিদর্শন করেন।

বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির মহাব্যবস্থাপক এবিএম কামরুজ্জামান বলেন, পূর্বের ফেজে কয়লা শেষ হওয়ায় গত ১৯ জুন থেকে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিতে উৎপাদন বন্ধ রয়েছে। নতুন ফেজে মেরামত কাজ শেষ হলে আগামী সেপ্টেম্বর থেকে পুনরায় কয়লা উৎপাদন শুরু হলে তাপ বিদ্যুত কেন্দ্রে সরববরাহ করা হবে।

পেট্রোবাংলার চেয়ারম্যান আবুল মনসুর ফয়জুল্লাহ বলেন, যারা এই ঘটনায় যারা জড়িত তাদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। কয়লায় ঘাপলা করে যারা লোকজনকে কষ্টে ফেলেছেন তাদের বিষয়টি কোনোভাবেই হালকা করে দেখার কোনও উপায় নেই। চীনের ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এক্সএমসি/সিএমসি কর্মকর্তাদের জানানো হয়েছে যাতে করে দ্রুত কয়লা উৎপাদন শুরু হয়। দ্রুত কয়লা উৎপাদনে যেতে তারা রাজি হয়েছে এবং দ্রুত কাজ করার কথা জানিয়েছে। একইসঙ্গে চীনের ও স্থানীয় শ্রমিকরা তাদের ছুটি নেবে না বলে জানিয়েছেন।

জ্বালানি বিভাগের সচিব আবু হেনা রহমতুল মুনিম জানান, খনিতে কয়লা ঘাটতির ব্যাপারে কর্মকর্তারা কী বলছেন এবং বাস্তবে কয়লার বিষয়টি  দেখেছেন তারা। তাপ বিদ্যুৎকেন্দ্রে চাহিদা মোতাবেক কয়লা সরবরাহ কবে নাগাদ দেওয়া সম্ভব এবং কয়লা খনির উৎপাদন কবে শুরু করা সম্ভব সেটিও পরিদর্শনের বিষয় ছিল। সত্যিকার অর্থে কয়লা ঘাটতি হলে তার দায়-দায়িত্ব কর্মকর্তাদের এবং তাদেরকে শাস্তির আওতায় নিয়ে আসা হবে বলে জানান তিনি। জ্বালানি সচিব বলেন, বড়পুকুরিয়া খনির দায়িত্বশীল কর্মকর্তারা বাস্তবে মজুত কম থাকার পরও বেশি মজুত দেখিয়েছিল, যা একটা অপরাধ। কাগজে কলমে যে পরিমাণ কয়লার মজুত উল্লেখ করা হয়েছে বাস্তবে তা দেখাতে পারেনি খনির কর্মকর্তারা। যদি কয়লা চুরি হওয়ার ঘটনা ঘটে থাকে তবে তা প্রতিষ্ঠানের লোকজনের মাধ্যমেই ঘটেছে। তদন্তের মাধ্যমে সবই বেরিয়ে আসবে। তবে তদন্তে যদি চুরি প্রমাণিত হয় তার দায় প্রতিষ্ঠানের সবাইকে নিতে হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বড়পুকুরিয়া কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের কয়েকটি ইউনিটের সাম্প্রতিক কয়লা সংকট দূরীকরণের জন্য আমদানি বা সংগ্রহ ও পরিবহনের পদ্ধতি নিরূপনের জন্য বিদ্যুৎ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব (উন্নয়ন)কে আহ্বায়ক করে ১২ সদস্যের একটি কমিটি গঠন করেছে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগ। পিডিবি সূত্র বলছে, কয়লাচালিত বিদ্যুৎ কেন্দ্রর তিনটি ইউনিট একসঙ্গে চালানো হলে প্রতিদিন পাঁচ হাজার মেট্রিকটন কয়লার দরকার হয়। এখন একটি ইউনিট সংস্কারের জন্য বন্ধ থাকায় প্রতিদিন চার হাজার মেট্রিক টন কয়লার প্রয়োজন হচ্ছে। নতুন করে কয়লা তোলা আরম্ভ হলে প্রতিদিন অন্তত ৫ হাজার টন কয়লা তুলতে হবে বিদ্যুৎকেন্দ্রটি চালু রাখার জন্য। তা কয়লা খনির নতুন শিফট শুরুর পরে সম্ভব হবে কিনা সে বিষয়েও উদ্বেগ রয়েছে জ্বালানি মন্ত্রণালয়ের। এ কারণে এই সংকট দূর করতেও কয়লা আমদানি করা জরুরি বলে মনে করছে পিডিবি।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পিডিবি চেয়ারম্যান খালেদ মাহমুদ বলেন, আমরা ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করছি। আগামীতে এ ধরনের সংকট তৈরি হওয়ার আগেই সমাধানের জন্য কমিটি কাজ করবে।

বিদ্যুৎ বিভাগ সূত্র জানায়, কমিটির সদস্যরা বড়পুকুরিয়া কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের সাম্প্রতিক কয়লা সংকট নিরসনে কয়লা আমদানির পদ্ধতি ঠিক করবে। এই আমদানির করা কয়লা কীভাবে কেনা যায় এবং তা পরিবহন করার বিষয়ে সুপারিশ করবে কমিটির সদস্যরা। পাশাপাশি কয়লা আমদানির বিষয় তদারকি করা এবং এরসঙ্গে সংশ্লিষ্ট সব বিষয়ে কাজ করবে কমিটির সদস্যরা।

 

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ

সর্বাধিক পঠিত