প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত ২০০ ছাড়িয়েছে

ডেস্ক রিপোর্ট : দেশব্যাপী চলমান মাদকবিরোধী সাঁড়াশি অভিযানে নিহতের সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। প্রায় প্রতিদিনই এমন অভিযানে দেশের কোথাও না কোথাও মাদক ব্যবসায়ীদের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’র ঘটনা ঘটছে। সর্বশেষ বুধবার রাতে চট্টগ্রামে র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ তিনজন নিহত হয়েছে। আগের দিন মঙ্গলবার ভোরে খুলনা মহানগরীর দৌলতপুর থানার মহেশ্বরপাশা এলাকায় ‘বন্দুকযুদ্ধে’ ইমরান ওরফে রকি (৩৮) নামে অপর এক মাদক ব্যবসায়ী নিহত হয়েছে বলে জানিয়েছে র‌্যাব। এ নিয়ে গত ৪ঠা মে থেকে শুরু হওয়া মাদকবিরোধী সাঁড়াশি অভিযানের ৮৩ দিনে নিহত হয়েছে অন্তত ২০৩ জন।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক (গোয়েন্দা) মো. নজরুল ইসলাম সিকদার বলেন, মাদক পরিস্থিতিতে আমরা যে খারাপ অবস্থায় পৌঁছেছি তাতে সরকারের ‘মাদকবিরোধী জিরো টলারেন্স’ অবস্থান যথার্থ। সরকারের নির্দেশে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, র‌্যাব ও পুলিশ পৃথকভাবে মাদক ব্যবসায়ীদের তালিকা তৈরি করে।
তালিকাগুলো স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে সমন্বয় করা হয়। গত ৩রা মে র‌্যাবের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার মাদকবিরোধী জিরো টলারেন্স ঘোষণার পর যুগপৎ সাঁড়াশি অভিযান শুরু হয়েছে। মাদকবিরোধী অভিযানে গেলে অনেক ক্ষেত্রেই মাদক ব্যবসায়ীরা পালিয়ে যাওয়ার জন্য গুলি ছোড়ে। আমরা প্রায় সময় অভিযানে এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হই। আত্মরক্ষার্থে এমন পরিস্থিতিতে র‌্যাব-পুলিশও গুলি ছুড়তে বাধ্য হচ্ছে। এতে মাদক ব্যবসায়ীরা মারা যাচ্ছে। তিনি বলেন, সপ্তাহখানেক আগে দেখেছি যে, নিহত ১৬৬ জন মাদক ব্যবসায়ীর মধ্যে ২২জন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের তালিকাভুক্ত। তবে পরিস্থিতি বদলালেও মাদক এখনো নিয়ন্ত্রণে আসেনি বলে জানান তিনি।

মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, পুলিশ ও র‌্যাব সূত্র জানায়, দেশে অন্তত ৭০ লাখ লোক মাদকাসক্ত। মরণ নেশা ইয়াবা, হেরোইন, কোকেন, আফিম, কোডিন, ফেন্সিডিল, মদ, গাঁজাসহ বিভিন্ন মাদকে আসক্তি দিন দিন বাড়ছে। ছাত্রসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার শিশু, কিশোর, যুবক, তরুণ-তরুণী থেকে প্রৌঢ় বা বৃদ্ধরাও এতে আসক্ত হয়ে পড়ছে। ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে নারীদের মাদকাসক্তিও। আর এসব মাদকের জোগান আসছে পাশের দেশ মিয়ানমার ও ভারত থেকে। সীমান্ত পার হয়ে এদেশে ঢুকলেই মাদকের মূল্য বেড়ে কয়েকগুণে দাঁড়াচ্ছে। সীমান্ত থেকে ক্রমান্বয়ে রাজধানীর দিকে দূরত্ব কমানো গেলেই হু হু করে বাড়ছে মাদকের অবৈধ বাজার মূল্য। অভিনব কায়দায় বহন বা পাচার হচ্ছে মাদক। এক্ষেত্রে ইয়াবাই অগ্রগামী। তাতে ভাগ বসিয়ে আঙ্গুল ফুলে কলাগাছ বনে যেতে মরিয়া মাদক ব্যবসায়ীরা। গড়ে উঠেছে বিশাল মাদক সাম্রাজ্য। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অসাধু কর্মকর্তাদের গোপন সহযোগিতা ও আইনের ফাঁক গলিয়ে পার পেয়ে যাওয়ার সুযোগের কারণে দীর্ঘদিন ধরে কোনভাবেই মাদকের লাগাম টানা যাচ্ছিল না। এমন এক পরিস্থিতিতেই মাদকবিরোধী সাঁড়াশি অভিযানের ঘোষণা আসে।

৪ঠা মে র‌্যাব প্রথম অভিযান শুরু করে। তারপর থেকে পুলিশ ও মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলো যুগপৎ অভিযানে নামে। প্রায় প্রতি রাতে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহতের খবর আসতে থাকে। অভিযান শুরুর কয়েকদিন পর ৭ই মে বগুড়ায় নিহত পাঁচজনের সবাই মাদকব্যবসায়ী এবং নিজেদের সহিংসতায় প্রাণ গেছে বলে জানিয়েছে পুলিশ। এরপর গত ১৫ই মে নিহত হয়েছে দু’জন। তারপর থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রায় প্রতিরাতেই এক বা একাধিক লোক নিহত হচ্ছে। ওই মাসের শেষের দিক থেকে কোন কোন দিন ১০ থেকে ১২টি লাশও পড়েছে। তবে গত ২৬শে মে রাতে ৩ বার নির্বাচিত টেকনাফের পৌর কাউন্সিলর একরামুল হক র‌্যাবের ‘বন্দুকযুদ্ধে’ মারা গেলে সৃষ্ট বিতর্কের পর নিহতের হার কিছুটা কমে।

এসব নিহতের ঘটনাকে বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড উল্লেখ করে দেশি-বিদেশি মানবাধিকার সংস্থাগুলোও বিরোধিতা করে আসছিল। তবে একরাম হত্যার ঘটনায় তদন্ত কমিটি গঠনের পর ইস্যুটি কিছুটা চাপা পড়লেও সম্প্রতি আবার ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহতের সংখ্যা বাড়তে শুরু করেছে। বুধবার খুলনায় ১ জন নিহত হওয়ার আগের দিন মঙ্গলবার রাতে নিহত হয়েছে আরো ৩ জন। তার আগের দু’দিন নিহতের খবর না এলেও গত শুক্রবার রাতে নিহত হয়েছে আরো ৪ জন। সর্বশেষ পড়লো তিন লাশ। এ নিয়ে গত ৮৩ দিনে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ সারা দেশে অন্তত ২০৩ জন নিহতের খবর পাওয়া গেছে। এর মধ্যে পুলিশের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ১০৫, র‌্যাবের সঙ্গে বন্দুকযুদ্ধে ৫৪ ও মাদক ব্যবসায়ীদের নিজেদের গুলাগুলি ও হানাহানিতে ৪৪ জনের প্রাণহানি ঘটেছে বলে দাবি করেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী।

ঘটনার পরে পুলিশ তাদের লাশ উদ্ধার করেছে বলে জানানো হয়। তবে নিহতদের সবাই চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী এবং তাদের বিরুদ্ধে কয়েকটি থেকে শুরু করে এক-দু’ডজন মামলাও রয়েছে বলে দাবি করা হয়। এছাড়া নিহত প্রায় প্রত্যেক লাশের সঙ্গে ইয়াবাসহ নিষিদ্ধ মাদকদ্রব্য ও আগ্নেয়াস্ত্র বা ধারালো অস্ত্র পাওয়া গেছে বলে উল্লেখ করে আসছে র‌্যাব-পুলিশ।

এ বিষয়ে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (অপারেশনস) সহকারী পরিচালক মো. বজলুর রহমান বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা যখন মাদকবিরোধী অভিযানে মাঠে যাচ্ছে তখন মাদকব্যবসায়ীরা পালানোর সুযোগ নিতে বা তাদের ঘায়েল করতে প্রথমে গুলি ছুড়ছে। স্বাভাবিকভাবেই আত্মরক্ষার্থে র‌্যাব-পুলিশ সদস্যদেরও পাল্টা গুলি ছুড়তে হচ্ছে। এতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কেউ মারা পড়ছে না। মরছে শুধু মাদক ব্যবসায়ীরা। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা আহত হচ্ছে। দেখা যাচ্ছে নিহতদের বিরুদ্ধে অন্তত ১০ থেকে ১৫টি করে মামলা রয়েছে। তারা চিহ্নিত মাদক ব্যবসায়ী।
সূত্র : মানবজমিন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত