প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

বিজ্ঞানী যখন যোদ্ধা

মোস্তফা হোসেইন: মুজিবনগরে প্রতিষ্ঠিত বাংলাদেশ সরকারের প্রথম সচিব মোহাম্মদ নুরুল কাদেরের যুদ্ধস্মৃতি গ্রন্থিত করার কাজ করছিলাম ২৫ বছর আগে। নিয়মিত তার বাসায় যেতাম রেকর্ডার নিয়ে। আমার প্রশ্নের আলোকে তিনি জবাব দেওয়ার মতো স্মৃতিচারণ করতেন। একবার এমনি প্রশ্ন করেছিলাম- একাত্তরের রাজনীতিবিদ ও প্রশাসনের লোকজন নিয়ে নানা কথা শুনি।

এটুকু বলার পরই তিনি নড়েচড়ে বসেন। পাল্টা প্রশ্ন করেন- কী শুনেছো?
বললাম- তারা কলকাতায় হোটেলে…।

পুরো কথা শেষ করতে পারিনি। সুদর্শন মানুষটির মুখ লালচে হয়ে যায়। তিনি অকল্পনীয়ভাবে উত্তেজিত হয়ে বলতে থাকেন, ‘একটা দেশের প্রধানমন্ত্রী ছোট একটা রুমে অফিস করেন। আরও রয়েছেন রুমের দরজার দুই পাশে দুইজন সিনিয়র কর্মকর্তা। একজন সাধারণ বিভাগের সচিব, অন্যজন প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব, যিনি আবার বিজ্ঞানীও।… প্রধানমন্ত্রী বাথরুমে নিজের পরিধেয় একমাত্র শার্টে বাংলা সাবান ঘষছেন…।’

ওই দিন কৌতূহল হয়েছিল প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব ড. ফারুক আজীজ খান সম্পর্কে জানার। ফারুক আজীজ খানের সঙ্গে দুয়েকবার কথা বলার সুযোগ হয়েছিল মাত্র। কিন্তু তাকে তখনও জানতাম মজনু দুলাভাইয়ের বড় ভাই এবং একজন খ্যাতিমান বিজ্ঞানী হিসেবে। জানতাম, খুব ভালো গান গাইতে পারেন। কিন্তু একাত্তরে তার ভূমিকা নিয়ে কখনও জিজ্ঞেস করা হয়নি।

তিনি বড়মাপের মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন- তা যখন জানতে পারি, তখন এই দেশে মুক্তিযুদ্ধ প্রায় নির্বাসিত। এটা ১৯৭৭ সালের অক্টোবর মাসের কথা। ড. ফারুক আজীজ খানের গাড়ি নিয়ে আমি ও আমার চাচা গ্রামে গিয়েছিলাম আমার অসুস্থ দাদিকে আনতে। ফেরার পথে দাউদকান্দি ফেরিঘাটে আসতেই জানলাম, ঢাকায় গোলযোগ চলছে। বিমানবন্দরে জাপানের বিমান ছিনতাই ও বাংলাদেশ বিমানবাহিনীর এয়ার কমডোর রাজ মাসুদসহ অনেককে হত্যা করা হয়েছে। এমন অস্বাভাবিক ও দুশ্চিন্তার সময়েও ফরিদ কাক্কু বলছিলেন ফারুক আজীজ খান সম্পর্কে। বলছিলেন, দুঃসাহসী এই বিজ্ঞানী একাত্তরে অস্ত্র হাতে লড়াই করেছেন এবং তিনি ছিলেন মুজিবনগরে প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব।

পরে স্বাধীনতার ঘোষণা সম্পর্কে দালিলিক প্রমাণ সংগ্রহকালে তার লেখা ‘স্প্রিং নাইনটিন সেভেনটি ওয়ান’ বইটি সংগ্রহ করি। একাত্তরের মার্চ মাসে তিনি ছিলেন কাপ্তাইয়ে সুইডিশ-পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজির পরিচালক। ২৫ মার্চ রাত ১১টার দিকে কাপ্তাই টেলিফোন এক্সচেঞ্জ থেকে মজিবুল হক তাকে জানিয়েছিলেন, ‘চট্টগ্রাম থেকে টেলিফোনে এইমাত্র খবর এসেছে যে, শেখ মুজিব স্বাধীনতার ঘোষণা করেছেন। যুদ্ধ শুরু হয়েছে। ঢাকায় ভীষণ লড়াই চলছে।’ (বসন্ত ১৯৭১, পৃষ্ঠা ৪২)।

এই সংবাদ পাওয়ার পর তিনি নির্লিপ্ত থাকতে পারতেন। এমনকি তিনি পাকিস্তানি বাহিনীর সঙ্গে হাত মেলাতে পারতেন; সেই সুযোগও ছিল। স্থানীয় ইপিআর কোম্পানি কমান্ডার মেজর পীর মোহাম্মদের সঙ্গেও তার জানাশোনা ছিল। কিন্তু সেকেন্ড ইন কমান্ড ও বাঙালি ক্যাপ্টেন হারুণকেও জানতেন ভালো। যিনি নাকি শেখ মুজিবের স্বাধীনতা ঘোষণার খবর পেয়ে বিদ্রোহ করেছিলেন। ক্যাপ্টেন হারুণ যে সময় বিদ্রোহ করেন, তার পরপরই রাত ২টায় ফারুক আজীজ খান মাস্টার ওয়াজিউল্লাহকে নিয়ে অস্ত্রসহ বেরিয়ে পড়েন। আর এই অস্ত্রটি ছিল অবাঙালি শাহাবুদ্দিনের। তার লেখাতে সোয়াত জাহাজ থেকে অস্ত্র নামানোর বিষয়টি আছে। ঠিক তেমনি আছে জিয়াউর রহমান কীভাবে নিখোঁজ হয়ে যান।

মেজর জিয়াউর রহমানের তৎকালীন ভূমিকা সম্পর্কে তিনি লিখেছেন- ‘তিনি তাঁর বাহিনীকে পরিত্যাগ করে যান, যার মধ্যে ৫০০ জনের সশস্ত্র একটি দল ছিলো। পাহাড় ও জঙ্গলে পরিপূর্ণ রাঙামাটি, কাপ্তাই ও সংলগ্ন এলাকার জন্য এটা অত্যন্ত সহায়ক বাহিনী ছিল। যদি আমরা কয়েকটি পাহাড় নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারতাম, তাহলে গেরিলা যুদ্ধ চালানো অনেক সহজ হতো। সে ক্ষেত্রে মুক্তিযুদ্ধ একটি ভিন্ন মাত্রা পেত।… পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর জন্য হালদা বেয়ে কর্ণফুলীর দক্ষিণাঞ্চল দখল করা শতগুণ কঠিন হতো। দৃশ্যপট থেকে মেজর জিয়ার দ্রুত অন্তর্ধান লড়াইরত মানুষজনের নৈতিক মনোবল অনেকটাই দুর্বল করে দেয়।’

মেজর জিয়া একাত্তরেই ভিন্নচিন্তা শুরু করেন। কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে জিয়াউর রহমান যে বাংলাদেশের ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা দিয়েছিলেন- শুধু তাই নয়, তিনি যুদ্ধ চলাকালেও সরকার ও সরকারি দল সম্পর্কে ভালো ধারণা পোষণ করতেন না। সে রকম একটি তথ্যও পাওয়া যায় ফারুক আজীজ খানের স্মৃতিতে। বলেছেন, “পরবর্তী কয়েক মাস কলকাতায় মেজর জিয়ার সঙ্গে আমার কয়েকবারই দেখা হয়েছে। একদিন ৮ নম্বর থিয়েটার রোডে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের ছোট্ট অফিসকক্ষে চা পান করতে করতে অনেকক্ষণ কথা হয়। সেই সময় তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ নেতৃত্ব তাঁকে ভালোভাবে নিতে পারেনি। তাঁর ভাষায়, ‘তাঁরা মনে করছেন যে, আমি যথেষ্ট লড়াই করিনি।’ আমি তার এই ধারণা দূর করার চেষ্টা করেও সফল হলাম না। জানতে চাইলাম, কেন তিনি তড়িঘড়ি করে কালুরঘাট ত্যাগ করলেন, আর বান্দরবানের দিকে অগ্রসর হলেন। বিশেষত যখন চট্টগ্রামে পরিস্থিতি গুরুতর আর তাঁর উপস্থিতিও জরুরি ছিল। তিনি বললেন, তাঁর কাছে খবর এসেছিল মার্কিন নৌবহর কক্সবাজার উপকূলের দিকে আসছে। … মেজর জিয়া স্বাভাবিকভাবেই ঢাকায় ফেলে আসা তাঁর স্ত্রী-সন্তানদের জন্য উদ্বিগ্ন ছিলেন। তিনি ইংরেজিতে বললেন, ‘আমি ওদের বলে দিয়েছি যে ওরা যদি তার (মেজর জিয়ার স্ত্রী) সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে, তাহলে আমরাও একই রকম আচরণ করব।”

এটা পরে জানা গেছে, মেজর জিয়ার স্ত্রীর সঙ্গে পাকিস্তানি বাহিনী ভালো আচরণ করেছে। সোয়াত জাহাজ থেকে অস্ত্র খালাস এবং ২৭ মার্চ কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠে জিয়ার ভূমিকা নিয়ে চরম সত্য প্রকাশ করেছেন ড. ফারুক আজীজ খান।

অন্যদিকে মুক্তিযুদ্ধকালে অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু পরিস্থিতি বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ ও শেখ ফজলুল হক মনির মধ্যে ঠাণ্ডা লড়াই, খন্দকার মুশতাক আহমদ ও তার সহযোগী মাহবুব আলম চাষীর মুক্তিযুদ্ধবিরোধী ভূমিকা অকপটে তিনি বলে গেছেন। তাজউদ্দীন আহমদের অবদানকে খাটো করে দেখার মানসিকতা যাদের আছে, তাদের অবশ্যই ফারুক আজীজ খানের এসব তথ্যকে ভালো চোখে দেখার কথা নয়।

তার এই একাকিত্বকে অনুধাবন করেছিলাম তাকে শেষ দেখার সময়। ওই সময়ের পরিবেশ বিবেচনায় কেউ অন্য কিছু ভাবলেও আজকে আমার মনে হয়, ফারুক আজীজ খানের ওই চেহারাটা ছিল তার সামগ্রিক ভাবনার প্রকাশ।

কয়েক বছর আগে তার ছোট ভাইয়ের স্ত্রী সুরাইয়া খানম বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয় হাসপাতালে চিকিৎসকদের চরম অবহেলায় মৃত্যুবরণ করেন। সুরাইয়া খানমের দুই ছেলে এর আগে তাদের বাবাকে হারিয়েছে। মা হারিয়ে ছোট ছেলে সিহান শিশুর মতো হয়ে যায়। হাসপাতালের করিডোরে চাচার পা জড়িয়ে ধরে কাঁদতে থাকে।

মুক্তিযোদ্ধা, সংগ্রামে অভ্যস্ত মানুষটিকে মনে হয়েছিল, পাথরের মূর্তি। তার চোখের দৃষ্টি সামনের দিকে। সেই দৃষ্টিতে আমি দেখছিলাম- সিহানের চেয়েও বেশি অসহায় তিনি। কারণ একাত্তরে ফারুক আজীজ খানের পরিবারকে আগলে ধরার মানুষটি, পরবর্তী সময় তাকেও যিনি বাবার জায়গায় স্থান করে দিয়েছিলেন, সেই মানুষটির বিদায় তাকে বড়ই একা করে দেয়।

তার মৃত্যুর পর মুক্তিযুদ্ধ মন্ত্রণালয়, মুক্তিযোদ্ধা সংসদ কিংবা সরকারের পক্ষ থেকে শোক প্রকাশের কোনো সংবাদ দেখিনি। বিশাল মাপের মানুষটির বিদায়ে গণমাধ্যমে সংবাদ হয়নি ওইভাবে। কোনো কোনো পত্রিকা অসম্পূর্ণ সংবাদ প্রকাশ করেছে মাত্র। স্পষ্ট হয়ে যায়, তিনি সত্যিই একাকিত্বকে সঙ্গে করেই বিদায় নিলেন। আমরা কি অকৃতজ্ঞ? যদি এখনও বেঁচে থাকা ফারুক আজীজ খানদের প্রতি আমরা স্বাভাবিক কৃতজ্ঞতা জানাতে পারি, তখনই দায় শোধ হতে পারে। তবু বলি, ওপারে ভালো থাকুন।

সাংবাদিক, শিশুসাহিত্যিক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ে গবেষক।-সমকাল

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ