প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

পাকিস্তানের নির্বাচন: ভোটাররা কেবল পার্শ্ব চরিত্র

মঞ্জুরুল আলম পান্না: যেমনটা হওয়ার কথা ছিল, ঠিক তাই-ই হলো পাকিস্তানের জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে। বিভিন্ন জরিপ আর রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের হিসেব কানায় কানায় পূর্ণ করে নির্বাচনের ফলাফল সেদিকেই গেছে। দেশটির সেনাবাহিনীর ম্যাচ ফিক্সিংয়ে পিটিআই-এর নেতৃত্বে একটা কোয়ালিশন সরকার গঠন হতে চলেছে এ সময়ের ক্রিকেট তারকা থেকে রাজনীতিক বনে যাওয়া ইমরান খানের তেহরিক-ই ইনসাফ। সেই সরকার গঠনের জন্য পাকিস্তান পিপল্স পার্টিকেও একটা গুরুত্বপূর্ণ সংখ্যার আসন দেওয়া হচ্ছে, বিশ্লেষকদের সেই হিসেবটাও এখন দৃশ্যমান। চরম সাম্প্রদায়িক মনোভাব আর জঙ্গি সংগঠনগুলোর পৃষ্ঠপোষকতায় ইমরান যে পাকিস্তানের পরবর্তী প্রধানমন্ত্রীর পদে বসতে যাচ্ছেন তা বেশ স্পষ্টই ছিল। এবারও এই দৃশ্যপটের রচয়িতা দেশটির অর্ধেকেরও বেশি সময়কালের সরাসরি শাসনকর্তা ক্ষমতালোভী সেনাবাহিনী। দীর্ঘদিন ধরে সব ধরনের আয়োজন তারা একের পর এক সম্পন্ন করে আসছিল আদালতের কাঁধে বন্দুক রেখে।

প্রথমত, আদালত সাবেক প্রধানমন্ত্রী নওয়াজ শরিফসহ বেছে বেছে বিদায়ী সরকারের বিশেষ কয়েকজনকে অভিযুক্ত করে তাদেরকে জেলে পুরে রাখার সব ব্যবস্থা করে রেখেছে। ইসলামাবাদ হাইকোর্টের বিচারপতি শওকত আজিজ সিদ্দিকী নির্বাচনের আগে স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআই বিচার বিভাগে হস্তক্ষেপের চেষ্টা করছে। নওয়াজ শরিফকে যেন মুক্তি দেওয়া না হয় সেজন্য সংস্থাটি চাপ সৃষ্টি করে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

দ্বিতীয়ত, এবার নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠনগুলোকে নির্বাচনি প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়ার সুযোগ দেওয়া হয়েছে কোনো রাখঢাক না রেখে। জাতিসংঘের সন্ত্রাসের তালিকায় নাম থাকা জামাতুত দাওয়ার নেতা হাফিজ সাঈদ, সেনাদের তত্ত্বাবধানে সদ্য কারাগার থেকে মুক্ত করা লস্কর-ই-জাংভির নেতা মাওলানা আহমাদ লুদিয়ানভি কিংবা দীর্ঘদিনের আত্মগোপন থেকে বেরিয়ে আসা জঙ্গি সংগঠন হরকাতুল মুজাহিদিনের প্রতিষ্ঠাতা ফজলুর রেহমান খলিলের মতো চরমপন্থীদের কেউ কেউ ভিন্ন দলের নামে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন, কেউ বা সরাসরি ইমরান খানের পিটিআই-এর প্রতি সমর্থন দিয়েছেন। নওয়াজের মুসলিম লীগের অনেক প্রার্থীকে দল ছেড়ে ইমরান খানের দলে যোগ দিতে অথবা স্বতন্ত্র প্রার্থী হতে বাধ্য করা হয়েছে। পাশাপাশি প্রয়াত প্রধানমন্ত্রী বেনজির ভুট্টোর দল পিপিপিকে রাখা হয়েছিল বেশ চাপে। দলটির সিনিয়র কয়েকজন সদস্যের বিরুদ্ধে অর্থ পাচারের অভিযোগ নতুন করে তোলা হয় নির্বাচনের মাত্র কদিন আগে। ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী একাধিক প্রার্থীকে বোমা হামলায় হত্যা করা হয়েছে, কাউকে বা রাখা হয়েছে গৃহবন্দি। আর ভোট কার্যক্রম পরিচালনার জন্য ব্যাপক ক্ষমতা নিজেদের কব্জায় রাখে সেনাবাহিনী। সর্বোপরি গণমাধ্যমকে রাখা হয় চাপের মধ্যে। নির্বাচনের বাছাই করা কিছু খবর প্রচারে তাদের বাধ্য করা হয়েছে অদৃশ্য শক্তির মাধ্যমে।

দেশটির মানবিধকার কমিশনতো বলেই রেখেছিল ‘পাকিস্তানের ইতিহাসে সবচেয়ে কলঙ্কিত ও পাতানো নির্বাচন হতে যাচ্ছে এবার।’ সেখানকার রাজনৈতিক বিশ্লেষক আর সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা মন্তব্য করে রেখেছেন, ‘ভোট কারচুপির কাজ নির্বাচনের অনেক আগেই সারা হয়ে গেছে। চুরি যা হওয়ার তা অনেক আগেই হয়ে গেছে। ক্ষমতায় বসবেন কে, তা আগেই ঠিক করা আছে।’

এই কথাগুলো নতুন করে বলার কারণ হচ্ছে- আমাদের মনে রাখতে হবে পাকিস্তানে একটা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনেই নির্বাচন হয়েছে, সেখানে একটা কথিত নিরপেক্ষ নির্বাচন কমিশনও ছিল যা সরকারি দল এবং প্রধান বিরোধী দল মিলেই গঠন করেছে। নির্বাচনে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক মানুষ যে ভোট দিতে যাননি তাও কিন্তু নয়। দল বিবেচনায় অংশগ্রহণমূলক নির্বাচনও হয়েছে বটে। তবে সেখানে যে জনরায় প্রতিফলিত হয়নি তাতো ভয়ানকভাবে প্রমাণিত সত্য এবং সেই সত্য দিনের উজ্জ্বল আলোর মতোই স্বচ্ছ, স্পষ্ট। তাতে গণতন্ত্রের মূল নিয়ামক শক্তি সাধারণ ভোটাররা কেবল পার্শ্বচরিত্র।
লেখক : সাংবাদিক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ