প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

খানজাহান আলী বিমানবন্দর নির্মাণ প্রকল্প : জমি না পেয়ে নদীতে রানওয়ে!

ডেস্ক রিপোর্ট:  ভূমি অধিগ্রহণ জটিলতায় কাজ শুরুর আগেই শেষ হয়েছে খানজাহান আলী বিমানবন্দর নির্মাণ প্রকল্পের মেয়াদ। জমি না পেয়ে এবার নদীর ওপর রানওয়ে নির্মাণের বিকল্প প্রস্তাব নিয়ে হাজির হয়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক)। দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে ২২ বছর আগে এ বিমানবন্দরটি নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়েছিল। কিন্তু এখন পর্যন্ত তা আলোর মুখ দেখেনি। এদিকে বেবিচকের সর্বশেষ ‘অবাস্তব’ প্রস্তাবে বিমানবন্দর নির্মাণের বিষয়টি আরো জটিল হলো বলে আশঙ্কা করছেন অনেকে।

১৯৯৬ সালে শেখ হাসিনা সরকারের প্রথম মেয়াদে বাগেরহাট জেলায় একটি ‘শর্ট টেকঅফ এন্ড ল্যান্ডিং এয়ারপোর্ট’ হিসেবে খানজাহান আলী বিমানবন্দর নির্মাণের উদ্যোগ নেয়া হয়। এ জন্য ফয়লাহাট এলাকায় ৯৭ দশমিক ৫৫ একর জমি অধিগ্রহণ করে ভূমি উন্নয়নের কাজ শুরু হয়। পরে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারের আমলে ওই কাজ বন্ধ হয়ে যায়। ২০১১ সালের ৫ মার্চ খুলনা সফরে গিয়ে খানজাহান আলী বিমানবন্দরটি পূর্ণাঙ্গ বিমানবন্দরে উন্নীত করার প্রতিশ্রæতি দেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। ফলে আবারো নড়েচড়ে বসে বেবিচক। ২০১৫ সালের ৫ মে একনেক বৈঠকে পূর্ণাঙ্গ বিমানবন্দর হিসেবে খানজাহান আলী বিমানবন্দর নির্মাণের অনুমোদন দেয়া হয়। এ জন্য নতুন করে ৪০৩ একর জমি অধিগ্রহণের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। প্রকল্পের মোট ব্যয় ধরা হয় ৫৪৪ কোটি ৭৪ লাখ টাকা। ওই বছরের ১ জুলাই থেকে ২০১৮ সালের ৩০ জুনের মধ্যে প্রকল্প বাস্তবায়নের সময় নির্ধারণ করা হয়। তবে এরই মধ্যে আলোচনায় আসে বিমানবন্দরের রানওয়েকে ভবিষ্যতের জন্য আরো উপযুক্ত করার বিষয়টি। অন্তত ১০ হাজার ফুট রানওয়ে নির্মাণের জন্য আরো ১৩৩ একর জমি বাড়িয়ে মোট ৫৩৬ একর জমি অধিগ্রহণের জন্য ২০১৬ সালের ১১ জানুয়ারি প্রশাসনিক অনুমোদন দেয়া হয়।

এদিকে এ পরিমাণ জমি অধিগ্রহণ নিয়ে দেখা দেয় জটিলতা। বাগেরহাটের জেলা প্রশাসক ২০১৬ সালের ১৮ মে এক চিঠিতে বেবিচককে জানান, নির্ধারিত ওই জমির কদমদী, সোনাতুনিয়া ও বড় নবাবপুর অংশে খুলনা-মোংলা মহাসড়ক ও নির্মাণাধীন খুলনা-মোংলা রেল লাইন প্রকল্প রয়েছে। এ ছাড়া ফয়লাহাট এলাকাটি ঘনবসতিপূর্ণ। এখানে বাজার, স্কুল, মাদ্রাসা ও সরকারি আশ্রায়ণ প্রকল্পসহ বিভিন্ন স্থাপনা রয়েছে। তাই বিমানবন্দরের জন্য ১৯৯৬ সালে অধিগ্রহণ করা জমি থেকে পূর্ব দিকে সরে গিয়ে লম্বালম্বিভাবে নতুন করে জমি অধিগ্রহণের পরামর্শ দেন জেলা প্রশাসক।

জেলা প্রশাসকের এ পরামর্শের পর নতুন করে দুটি প্রস্তাবনা প্রস্তুত করে বেবিচক। বিকল্প প্রস্তাব-১ ও ২ নামে এসব প্রস্তাবে মহাসড়ক, রেললাইন ও ঘনবসতিপূর্ণ এলাকাগুলো বাদ দেয়া হয় ঠিকই, কিন্তু নকশাটি চলে আসে একেবারে পার্শ্ববর্তী ফয়লা নদীর উপর। গত মে মাসে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ে জমা দেয়া ওই প্রস্তাবনায় দেখা যায়, ৪০৩ একর জমি নিয়ে বিকল্প প্রস্তাব-১ ও ৫৩৬ একর জমি নিয়ে বিকল্প প্রস্তাব-২ তৈরি করা হয়েছে। দুটি নকশাতেই ৮ হাজার ৬০০ থেকে ৯ হাজার ফুট দৈর্ঘ্যরে রানওয়ে স্ট্রিপের মাঝ বরাবর রয়েছে ফয়লা নদী। এর দক্ষিণে রয়েছে ফয়লা-তাত খানপুর সড়ক ও ফয়লা ওয়াপদা সড়ক। উত্তরে চন্দ্রমহল ইকোপার্ক ও রঞ্জিতপুর স্কুল। এ ছাড়া রানওয়ের পাশে যে প্রিসিশন এপ্রোচ ডিজাইন করা হয়েছে সেটিও নদীর একটি বিশাল অংশে পড়েছে। জানা গেছে, প্রস্তাবনাটি এখন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের অপেক্ষায় আছে।

প্রস্তাবের সুবিধা-অসুবিধার মধ্যে বলা হয়েছে, এতে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকা অধিগ্রহণের আওতার বাইরে থাকবে, র‌্যাপিড এক্সিট ট্যাক্সিওয়ে নির্মাণ সম্ভব হবে, দৃষ্টিনন্দন টার্মিনাল ভবন ও কারপার্কিং, ভবিষ্যৎ ফ্লাইং একাডেমি ইত্যাদি নির্মাণ সম্ভব হবে। কিন্তু নদীর উপর বিমানবন্দরটি নির্মাণের কারিগরি জটিলতা, নির্মাণ ব্যয় বেড়ে যাওয়া, পরিবেশ ও প্রতিবেশের ক্ষতি, স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকা, কৃষিকাজে কী ধরনের বিরূপ প্রভাব পড়বে ইত্যাদি বিষয় উল্লেখ করা হয়নি কোথাও।

এ প্রসঙ্গে জানতে বেবিচকের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মো. নাইম হাসানকে ফোন করা হলে তিনি ব্যস্ততার কথা বলে পরে দেখা করতে বলেন। তবে সংস্থাটির প্রধান প্রকৌশলী সুধেন্দু বিকাশ গোস্বামীর বরাত দিয়ে জনসংযোগ কর্মকর্তা রেজাউল করিম জানান, পরামর্শক প্রতিষ্ঠানের পরামর্শ অনুযায়ীই ওই নকশা করা হয়েছে। ওই নদীটি একটি ‘মরা’ নদী উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেখানে বিমানবন্দর নির্মাণে কোনো সমস্যা হবে না।

পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের ৭২ নম্বর নদীর নাম ‘মোংলা’, যার অন্যতম একটি ধারা হচ্ছে বাগেরহাট জেলার ফয়লা নদী। এ নদীর জলধারা রামপাল উপজেলার পেরিখালী ইউনিয়নের কাছে একত্রিত হয়ে মোংলা নাম ধারণ করেছে। নদীটি আরো দক্ষিণে অগ্রসর হয়ে পশুর নদীতে পড়েছে। মোংলা নদী বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌপরিবহন কর্তৃপক্ষের প্রথম শ্রেণির নৌপথ হিসেবে স্বীকৃত।

স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, ফয়লা নদীটি এক সময়ে তীব্রভাবে প্রবাহমান থাকলেও আশির দশকের পর তা ক্রমে খারাপ হতে থাকে। প্রভাবশালীরা চিংড়ি চাষের জন্য এ নদীর বিভিন্ন স্থানে বাঁধ দিয়ে নদীর প্রবাহ সংকীর্ণ করে ফেলে। পানি উন্নয়ন বোর্ডও বন্যা নিয়ন্ত্রণের নামে সøুইচ গেট বসিয়ে নদীর প্রবাহকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। তবে কয়েক বছর আগে মোংলা-ঘাষিয়াখালী নৌরুটকে সচল করতে গিয়ে আশপাশের নদী ও খালগুলোর মুখের সøুইসগেট অপসারণের সিদ্ধান্ত হয়। এরপর থেকে ফয়লা নদীতে আবারো পানি প্রবাহ বাড়তে শুরু করেছে বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে পেরিখালী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান রফিকুল ইসলাম বাবুল জানান, এক সময় ফয়লা নদীতে বড় বড় নৌকা চলতে দেখেছেন তারা। এখানকার মানুষের কৃষি ও জীবন-জীবিকার ক্ষেত্রে এ নদীর অবদান ছিল অনেক। মৃতপ্রায় এ নদীটি আবার নতুন করে জীবন ফিরে পাচ্ছে বলে জানান তিনি।

নদী ভরাট করে বিমানবন্দর করার প্রস্তাবনায় বিস্ময় প্রকাশ করে বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলনের (বাপা) যুগ্ম সম্পাদক স্থপতি ইকবাল হাবিব বলেন, যেখানে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নদী রক্ষাকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিচ্ছেন সেখানে বেবিচক কীভাবে এ ধরনের প্রকল্প প্রস্তাব প্রস্তুত করে তা বোধগম্য নয়। তিনি বলেন, নদীটি যদি শুকিয়েও গিয়ে থাকে তবে সেটাকে পুনোরোজ্জীবিত করতে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার কাজ করার কথা। ফলে নদীর ওপর বিমানবন্দর নির্মাণের ধারণাটি একটা কাণ্ডজ্ঞানহীন উদ্যোগ, এতে পুরো প্রকল্পটিই ঝুলে যেতে পারে। তা ছাড়া প্রযুক্তিগতভাবেও এ দেশে তা সম্ভব নয় মন্তব্য করে তিনি বলেন, উন্নত বিশ্ব চাইলে সমুদ্রের মধ্যেও রানওয়ে করতে পারে। কিন্তু বাংলাদেশের আর্থিক বিবেচনায় তা যথার্থ হবে না। অবাস্তব ধারণার ওপর প্রকল্প প্রস্তাবনা তৈরি করে অর্থ হাতিয়ে নেয়ার কোনো অসৎ উদ্দেশ্য এতে থাকতে পারে বলেও সন্দেহ প্রকাশ করেন তিনি। ভোরের কাগজ।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত