প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

উধাও কয়লায় ‘মন’ কালা!

রবিন আকরাম : দিনাজপুরের বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিতে ১ লাখ ৪৪ হাজার মেট্রিক টন কয়লা গায়েব হওয়ার ঘটনায় তোলপাড় সারা দেশে। বিষয়টি নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন প্রধানমন্ত্রীও। কয়লা গায়েব হওয়ার ঘটনায় প্রাথমিক তদন্তে খনির চার ব্যবস্থাপনা পরিচালকের সংশ্লিষ্টতা পেয়েছে পেট্রোবাংলা গঠিত তদন্ত কমিটি।

তারা হলেন, খনির সদ্য সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক হাবীব উদ্দিন আহমেদ, সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক আওরঙ্গজেব, আমিনুজ্জামান ও কামরুজ্জামান। বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের একজন কর্মকর্তা এই তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

তদন্ত প্রতিবেদন বলা হয়েছে, ২০০৫ সাল অর্থাৎ কয়লা খনি থেকে কয়লা উত্তোলনের সময় থেকে যারা ব্যবস্থাপনা পরিচালক ছিলেন, তারা সবাই কম-বেশি এই কয়লা চুরির সঙ্গে জড়িত। বিশেষ করে এই চারজন। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি সময় ছিলেন আমিনুজ্জামান।

পেট্রোবাংলা একজন কর্মকর্তা বলেন, চুরি করে ২৩০ কোটি টাকার কয়লা বিক্রি করে দিয়েছেন বড়পুকুরিয়া খনির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। একদিনে এই চুরির ঘটনা ঘটেনি। পর্যায়ক্রমে বছরের পর বছর ধরে খোলা বাজারে বিক্রির সময় এই কয়লা সরিয়ে ফেলা হয়েছে। অবৈধভবে বিক্রির মাধ্যমে ঠিকাদার ও খনি কর্মকর্তারা লাভবান হয়েছেন বলে তদন্ত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। খনির কাজ শুরু হওয়ার পর থেকেই এই চুরি শুরু হতে পারে বলে তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন।

দুদক বলছে, কাগজে-কলমে যে পরিমাণ কয়লা থাকার কথা সেই পরিমাণ কয়লা বাস্তবে নেই। হিসেবের গরমিলেই এই দুর্নীতির প্রাথমিক সত্যতা মিলেছে।

বড়পুকুরিয়া কয়লা খনি সূত্রে জানা গেছে, গত ১৩ মে থেকে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির শ্রমিকরা ১৩ দফা দাবিতে কর্মবিরতি শুরু করেন। ফলে খনি থেকে কয়লার উত্তোলন বন্ধ হয়ে যায়। এর আগে এই খনির ১২১০ নম্বর ফেইজ থেকে দিনে প্রায় ৩ হাজার মেট্রিক টন কয়লা উত্তোলন হতো। কিন্তু শ্রমিকদের আন্দোলনের ফলে কয়লা উত্তোলন বন্ধ হয়ে যায়। এ সময় বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী হাবিব উদ্দিন আহমেদ সাংবাদিকদের জানান, কোল ইয়ার্ডে (কয়লা রাখার জায়গা) প্রায় ২ লাখ ৪০ হাজার মেট্রিক টন কয়লা রয়েছে। এই পরিমাণ দিয়ে বড়পুকুরিয়া কয়লাভিত্তিক তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র চালু রাখতে কোনও সমস্যা হবে না।

দাবি দাওয়া মেনে নেওয়ার আশ্বাসে ২১ দিন কয়লা উত্তোলন বন্ধ রাখার পর গত ৩ জুন কাজে যোগদান করেন শ্রমিকরা। কিন্তু ওই ফেইজে উত্তোলনযোগ্য কয়লার মজুদ শেষ হয়ে যাওয়ায় গত ১৬ জুন থেকে কয়লা উত্তোলন বন্ধ হয়ে যায়। গত ২০ জুনও কয়লা খনি কর্তৃপক্ষ জানায়, কোল ইয়ার্ডে ১ লাখ ৮০ হাজার টন কয়লা রয়েছে। কিন্তু গত ১৬ জুলাই কর্তৃপক্ষ ফের জানায়, কয়লার মজুত শেষের দিকে। তাপ বিদ্যুৎ কেন্দ্র কর্তৃপক্ষ বিষয়টি পিডিবিকে জানালে তারা এটি পেট্রোবাংলাকে অবহিত করে। এরপরই বের হয়ে আসে কয়লার ঘাপলার বিষয়টি।

খনির কোল ইয়ার্ড থেকে বিপুল পরিমাণ কয়লা উধাও হয়ে যাওয়ার ঘটনায় ১৯ জুন খনির মহাব্যবস্থাপক (মাইন অপারেশন) নুরুজ্জামান চৌধুরী ও উপ-মহাব্যবস্থাপক (স্টোর) খালেদুল ইসলামকে সাময়িক বরখাস্ত করে পেট্রোবাংলা। একই সঙ্গে খনির ব্যবস্থাপনা পরিচালক প্রকৌশলী হাবিব উদ্দিন আহমদকে অপসারণ করে পেট্রোবাংলায় সংযুক্ত ও মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন ও কোম্পানি সচিব) আবুল কাশেম প্রধানিয়াকে পশ্চিমাঞ্চল গ্যাস কোম্পানি লিমিটেড সিরাজগঞ্জে বদলি করা হয়। এই ঘটনায় পেট্রোবাংলার পরিচালক (মাইন অপারেশন) কামরুজ্জামানকে আহ্বায়ক করে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়।

এদিকে, কয়লা গায়েবের ঘটনায় খনির ১৯ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে তদন্ত শুরুর প্রস্তুতি নিচ্ছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)। পার্বতীপুর থানায় এই ১৯ জনের বিরুদ্ধে দায়ের করা মামলার নথি হাতে পেয়েছে দুদক। ফলে এখন তদন্তের প্রক্রিয়া শুরু হবে।

জানা জানায়, দিনাজপুরে কয়লা খনির সঙ্গে জড়িত ১৯ জনের বিরুদ্ধে করা মামলাটি পেট্রোবাংলার তদন্তে উঠে আসা তথ্য-প্রমাণের ভিত্তিতে করা হয়েছে। এজন্য প্রতিমন্ত্রী নির্দেশ দেওয়ার পরও মামলা করতে সময় নেওয়া হয়েছে। রবিবার থেকে মঙ্গলবার পর্যন্ত পেট্রোবাংলার তদন্ত দল যেসব তথ্য প্রমাণ পেয়েছে, তার ওপর ভিত্তি করেই বুধবার ১৯ জনের বিরুদ্ধে মামলা দায়ের করা হয়েছে।

দুর্নীতি দমন কমিশন দিনাজপুর জেলা সমন্বিত কার্যালয়ের উপ-পরিচালক বেনজীর আহম্মেদ এ তথ্য নিশ্চিত করে জানান, ‘মামলার নথিটি দুদকের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে। সেখান থেকেই মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা নিযুক্ত হবে। মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তার নিয়োগের পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন, কাগজপত্র যাচাই ও জব্দ এবং জড়িতদের গ্রেফতারের বিষয়ে পরবর্তী কার্যক্রম শুরু হবে।’

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত