প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মেয়রের ৩ বছর, আরও ডুবেছে চট্টগ্রাম!

ডেস্ক রিপোর্ট : ২০১০ সালে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনের ভোটগ্রহণের দিনকয়েক আগে তুমুল বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতার কবলে পড়ে বন্দরনগরীর বিভিন্ন এলাকা। সে সময় চট্টগ্রামকে সিঙ্গাপুর বানানোর স্বপ্ন দেখিয়ে ভোটযুদ্ধে নেমেছিলেন বর্ষীয়ান রাজনীতিক এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। তাতে স্লোগান উঠেছিল, ‘পানির নিচে মুরাদপুর, কেমনে হবে সিঙ্গাপুর’।

আর সেই স্লোগানকে পুঁজি করে মহিউদ্দিন চৌধুরীকে হারিয়ে মেয়র হন তারই রাজনৈতিক শিষ্য এম মনজুর আলম। কিন্তু চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা পরিস্থিতির কোন উন্নতি তিনি পাঁচ বছরে করতে পারেননি।

এরপর জলাবদ্ধতা নিরসনকে এক নম্বর অগ্রাধিকার ঘোষণা করে ২০১৫ সালে মেয়রের চেয়ারে বসেন আ জ ম নাছির উদ্দীন। বুধবার (২৫ জুলাই) তিনি মেয়াদের তিন বছর পার করেছেন। ২০১০ সালে চট্টগ্রাম নগরীর হাতেগোণা কয়েকটি এলাকা পানিতে ডুবে যাওয়া ত্বরান্বিত করেছিল মহিউদ্দিনের পরাজয়। মাত্র আট বছরের মাথায় এসে পুরো নগরীই এখন হালকা-মাঝারি বৃষ্টিতে পানির নিচে চলে যাচ্ছে। কর্ণফুলী নদীর পাড়ে গড়ে ওঠা চট্টগ্রাম শহরকে বৃষ্টি পড়লে নদীর সঙ্গে আলাদা করা যায় না। বৃষ্টি পড়লে এই শহরের সড়কে এখন গাড়ি আর নৌকা পাশাপাশি চলে।

নগর পরিকল্পনাবিদদের মতে- কর্ণফুলীর মোহনা ভরাট হয়ে যাওয়া, নগরীর চারপাশে থাকা খালগুলো তাদের কার্যকারিতা হারিয়ে ফেলা, অপরিকল্পিতভাবে দ্রুত নগরায়ন এবং পাহাড় কাটার কারণে চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতা এখন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে।

নগর পরিকল্পনাবিদ ও ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশন, চট্টগ্রাম কেন্দ্রের সাবেক সভাপতি দেলোয়ার মজুমদার সারাবাংলাকে বলছিলেন, চট্টগ্রাম শহরের অবস্থা এখন এমন হয়েছে শুধু বৃষ্টি নয়, জোয়ারের পানিতেও তলিয়ে যাচ্ছে। এটা আমরা অতীতে দেখিনি।

এখন সামান্য ভারি বৃষ্টি হলেই নগরীর ৪০ শতাংশ অর্থাৎ এক-তৃতীয়াংশেরও বেশি এলাকা তলিয়ে যাচ্ছে। আগে নগরীর কিছু সংখ্যক নিচু এলাকার বাসিন্দাদের দুর্ভোগ পোহাতে হত। এখন পুরো নগরবাসীই দুর্ভোগের মধ্যে পড়ছেন। কেউ অফিসে, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে যাবার সময় দুর্ভোগে পড়ছেন। আর কারও বাসা-দোকানে, অফিসে পানি ঢুকে দুর্ভোগে পড়ছেন, যোগ করেন এই নগর পরিকল্পনাবিদ।

অভিযোগ আছে, জলাবদ্ধতা নিরসনকে প্রথম অগ্রাধিকার দিয়ে মেয়র নির্বাচিত হলেও দায়িত্ব পালনের তিন বছরে এই বিষয়ে কার্যকর কোন পদক্ষেপ নগরবাসীর সামনে দেখাতে পারেননি আ জ ম নাছির উদ্দিন। বরং খাল-নালা নিয়মিত পরিস্কার করার যে রুটিন ওয়ার্ক সেটাও শিথিল হয়ে পড়েছে। পুঞ্জীভূত এসব সমস্যা এখন মারাত্মক আকার ধারণ করে ভয়াবহ জলাবদ্ধতায় রূপ নিয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে চট্টগ্রামের মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিন বলেন, আমি নির্বাচনের সময় জলাবদ্ধতা নিরসনের অঙ্গীকার করেছিলাম। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে আমি সেটাকেই এক নম্বর অগ্রাধিকার হিসেবে রেখেছি। দেশি-বিদেশি অনেকের সঙ্গে আমি এই বিষয়ে পরামর্শ করে কাজ শুরু করেছিলাম। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, চট্টগ্রাম শহরের মতো একটি দ্রুত অগ্রসরমান নগরে যে পরিমাণ পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থা থাকা দরকার তার অর্ধেকও নেই। বিদ্যমান ড্রেনগুলো দিয়ে নগরের এত বিপুল পরিমাণ ময়লা- আবর্জনা, পানি প্রবাহের মাধ্যমে খালে নিয়ে যাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। আমরা নতুন করে প্রশস্ত ড্রেন নির্মাণের কাজে হাত দিয়েছি। অনেক এলাকায় আমরা প্রশস্ত ড্রেন নির্মাণ সম্পন্ন করেছি।’

মেয়র আরও বলেন, ‘এছাড়াও নগরীতে আছে প্রায় ৪৭ শতাংশ পাহাড়। বালিযুক্ত এই পাহাড়ের ক্ষয় একটা মারাত্মক সমস্যা। এটা রোধ করার জন্য থাইল্যাণ্ড থেকে একটা বিশেষ ধরনের ঘাস লাগানোর পরীক্ষানিরীক্ষা চলছে। এটা একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে আছে। পরিবেশ মন্ত্রণালয় দুই কোটি টাকা দেবে বলে আমাদের জানিয়েছে।’

জলাবদ্ধতার যন্ত্রণা থেকে নগরবাসীকে মুক্তি দেওয়াটা এখনও তার কাজের ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার পাচ্ছে বলে জানালেন মেয়র।

সূত্রমতে, এম মনজুর আলম মেয়র হিসেবে দায়িত্ব নেওয়ার পর নগরীর প্রায় ৭০ কিলোমিটার নিচু সড়ককে উঁচু করেন। এতে আশপাশের এলাকাগুলো আরও নিচু হয়ে গেছে।

প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার বলেন, অপরিকল্পিতভাবে রাস্তা উঁচু করার কারণে আশপাশের এলাকাগুলো যেন পুকুরে পরিণত হয়েছে। এজন্য বৃষ্টি কিংবা জোয়ারের পানি গড়িয়ে খালে যাবার পথ সংকুচিত হয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই উঁচু সড়ক থেকে এসব পানি গড়িয়ে পুকুরে পড়ছে আর নিচু এলাকাগুলো জলমগ্ন হয়ে থাকছে।

তিনি আরও বলেন, নগরীতে মানুষ বাড়ছে, ভবন বাড়ছে। বর্জ্যের পরিমাণও বেড়েছে। সেই বর্জ্যগুলো নালায় পড়ছে। অপরিকল্পিতভাবে পাহাড় কাটা হচ্ছে। এতে পাহাড়ের বালিযুক্ত মাটি ক্ষয় হয়ে নালায় গিয়ে পড়ছে। নালা ভরাট হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু সমস্যা যেখানে, সেই নালাগুলো নিয়মিত সংস্কার করে পানি খালে যাবার পথ তৈরি করে দেওয়ার ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ কিংবা সক্ষমতা সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের নেই। আর দখলের ফলে খালও সংকুচিত হয়ে গেছে। নগরীতে ১৩টি খালের কার্যকারিতা একেবারে নেই বললেই চলে।

‘কর্ণফুলী নদী ও চাক্তাই খালের মোহনা ভরাট হয়ে গেছে। নদীতে পিলার ব্রিজও এটার জন্য দায়ী। সুতরাং পথ সংকুচিত হয়ে যাওয়ায় ময়লা-আবর্জনা নদীতে যেতে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। খালের ময়লা খালেই থাকছে। নালার ময়লা নালাতেই পড়ে থাকছে,’ বলেন দেলোয়ার মজুমদার।

তবে আশার কথা, চট্টগ্রাম নগরীর জলাবদ্ধতা দূর করতে প্রধানমন্ত্রীর অগ্রাধিকার প্রকল্প হিসেবে ৫ হাজার ৬১৬ কোটি টাকার একটি মেগাপ্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। সেনাবাহিনীর তত্ত্বাবধানে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এই প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে।

চট্টগ্রাম শহরের জলাবদ্ধতা নিরসনকল্পে খাল পুনঃখনন, সম্প্রসারণ, সংস্কার ও উন্নয়ন প্রকল্পটি একনেকে অনুমোদন হয়েছে ২০১৭ সালের ৯ আগস্ট। ২০২০ সালের ৩০ জুন পর্যন্ত প্রকল্পের মেয়াদকাল ধরা হয়েছে।
গত মে মাসে এই প্রকল্পের কাজ শুরু হয়েছে। তবে বর্ষা শুরুর পর থেকে খাল ও ড্রেন থেকে মাটি-আর্জনা উত্তোলনের গতি শ্লথ হয়ে এসেছে বলে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের কয়েকজন কাউন্সিলরের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে।

প্রকল্প পরিচালক ও চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (সিডিএ) নির্বাহী প্রকৌশলী আহমেদ মঈনউদ্দিন বলেন, কাজ চলছে। আমরা যেসব মাটি তুলছি সেগুলো খাল বা নালার পাড়ে রেখে দিচ্ছি না। সাথে সাথেই নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। সেজন্য বর্ষার মধ্যেও আমাদের কাজে ব্যাঘাত ঘটছে না।

এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, খাল-নালাগুলোতে দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা ময়লা-আবর্জনা তুলতে আমাদের যথেষ্ট বেগ পেতে হচ্ছে। সেগুলো যদি নিয়মিত অপসারণ করা হত তাহলে আমাদের এই সমস্যায় পড়তে হত না। কিন্তু নিয়মিত অপসারণের কাজটি সিডিএ’র নয়। এটি সিটি করপোরেশনের দায়িত্ব।

তবে মেগাপ্রকল্পটির সঠিক বাস্তবায়ন এবং জলাবদ্ধতা দূর হওয়া নিয়ে সংশয় আছে নগর পরিকল্পনাবিদদের মধ্যে।

প্রকৌশলী দেলোয়ার মজুমদার বলেন, প্রধানমন্ত্রী জলাবদ্ধতা নিরসনে এতবড় একটি প্রকল্প নিয়ে চট্টগ্রামবাসীর প্রতি আন্তরিকতার পরিচয় দিয়েছেন। কিন্তু সব সংস্থা বিশেষ করে সিডিএ, সিটি করপোরেশন, ওয়াসা, পানি উন্নয়ন বোর্ড যদি সমন্বিতভাবে কাজ না করলে এর সুফল আসবে না।

তিনি বলেন, আশা করি, যারা দায়িত্বে আছেন প্রধানমন্ত্রীর সদিচ্ছার অবমাননা করবেন না। হাজার হাজার কোটি টাকা অপচয়ও করবেন না।

প্রকল্পের কাজ শুরুর এক বছরে কোন সুফল না আসায় হতাশার কথা বললেন মেয়র আ জ ম নাছির উদ্দিনও।

মেয়র বলেন, গত বছরের আগস্টে প্রকল্পের কাজ শুরু হল। এক বছরে তো কোন সুফল নগরবাসী দেখতে পায়নি। বরং যেসব এলাকায় কাজ চলছে সেখানে তো দিনদিন জলাবদ্ধতা আরও বাড়ছে। স্লুইচ গেইটের কথা বলা হচ্ছে। এটা দিলে আদৌ সুফল আসবে কি না, পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কি হবে সেগুলো চিন্তা করে কাজ করতে হবে।

‘মাননীয় প্রধানমন্ত্রী হাজার হাজার কোটি টাকা বরাদ্দ দিলেন। কিন্তু কাজ শেষে চট্টগ্রামবাসী যদি কোন সুফল না পায়, তার দায় অবশ্যই বাস্তবায়নকারী সংস্থাকে নিতে হবে,’ বলেন মেয়র। সূত্র : সারাবাংলা

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ