প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মোবাইল ট্র্যাকিং নিয়ে আতঙ্কে বিএনপি

ডেস্ক রিপোর্ট:  আপদ-বিপদ যেন পিছু ছাড়ছে না বিএনপি নেতাদের। হামলা, মামলা, গ্রেপ্তার, গুম, অপহরণ তো আছেই। এবার মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দাঁড়িয়েছে ব্যক্তিগত ফোনালাপ ফাঁস। মোবাইল ট্যাকিংয়ের মাধ্যমে ফাঁস হয়ে যাওয়া এসব ফোনালাপে হুমকির মুখে পড়ছে নেতাদের রাজনৈতিক ক্যারিয়ার। কাউকে কাউকে যেতে হয়েছে কারাগারেও। লঙ্ঘন হচ্ছে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা। প্রকাশ পাচ্ছে দলীয় দুর্বলতা। একই সঙ্গে তথ্য ফাঁস হওয়ার কারণে রাজনৈতিক কৌশলেও মার খাচ্ছেন তারা। এমনকি বিএনপির রাজনৈতিক অঙ্গনে উসকে দিচ্ছে নতুন বিতর্ক।

সম্প্রতি মোবাইল ট্যাকিংয়ের মাধ্যমে ফাঁস হয়ে যাওয়া কিছু দলীয় পরিকল্পনা ফাঁস হয়ে যাওয়ায় বেকায়দায় রয়েছেন বিএনপির নেতাকর্মীরা। গত ১৭ জুলাই সকালে রাজশাহী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে মোসাদ্দেক হোসেন বুলবুলের ধানের শীষ প্রতীকের পক্ষে গণসংযোগকালে নগরের সাগরপাড়া বটতলার মোড়ে বোমা হামলার ঘটনা ঘটে। পরে ২১ জুলাই ইন্টারনেটে রাজশাহী জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মতিউর রহমান মন্টু ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা তাইফুল ইসলামের একটি ফোনালাপ ফাঁস হয়।

সেই ফোনালাপে বেরিয়ে আসে চাঞ্চল্যকর সব তথ্য। যেখানে দুজনের কথায় স্পষ্ট আভাস পাওয়া যায়, দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের কাছ থেকে ক্রেডিট ও আওয়ামী লীগের ওপর দোষ চাপানোর জন্য শান্ত মনোরম গণসংযোগে এ বোমা হামলা চালানো হয়। পরে ওই ফোনালাপের সূত্র ধরেই মন্টুকে আটক করে জিজ্ঞাসাবাদ করে পুলিশ। যেখানে উঠে আসে দলীয় একাধিক নেতার নাম।

অবশ্য দলীয় নেতার নিজস্ব স্বীকারোক্তি উড়িয়ে দিয়ে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেছেন, পথসভায় হাত বোমা বিস্ফোরণ ঘটিয়ে সরকার বিএনপির ওপর দোষ চাপাচ্ছে। তিনি বলেন, দুই নেতার যে অডিও বের হয়েছে ওটা এডিট করা। আপনারা নিজেরাই দেখতে পারেন কার কত রকম ছবি বের হয়, এর ঘাড়ে ওর মাথা। এর আগে ফোনালাপের জের ধরেই ফাঁস হয়ে যায় গাজীপুর সিটি নির্বাচনে আ.লীগের ব্যাচ পরে বিএনপির ‘নাশকতার’ পরিকল্পনা। ধরা পড়েন বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মিজানুর রহমান। বিএনপি নেতাদের এমন ফোনালাপ ফাঁসের ঘটনা নতুন নয়। এর আগের বছর তারেক রহমান ও শমসের মবিন চৌধুরীরও ফোনালাপ প্রকাশিত হয়। স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান ও যুবদল কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য এডভোকেট রইস উদ্দিন রইসের কথোপকথন ফাঁস হয়। যেখানে উঠে এসেছিল ভারতের প্রেসিডেন্ট প্রণব মুখার্জির সঙ্গে খালেদা জিয়ার সাক্ষাৎ না করা, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সাক্ষাৎ নিয়ে অনিশ্চয়তাসহ দলের বিভিন্ন দুর্বল দিকসহ নানা প্রসঙ্গ।

ফাঁস হয় স্থায়ী কমিটির সদস্য নজররুল ইসলাম খানের ফোনালাপ। যেখানে সিটি করপোরেসন নির্বাচন বর্জন সংক্রান্ত কথা হয় দলটির এক কর্মীর সঙ্গে। এ ছাড়া ছাত্রদলের সাবেক সিনিয়র সহসভাপতি বজলুল করিম চৌধুরী আবেদের সঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমেদের এক ফোনালাপ ফাঁস হয়। ফাঁস হওয়া ফোনালাপের এক পর্যায়ে মওদুদ আহমেদ বলেন, শোনো (আবেদ) এই বিএনপিকে দিয়ে হবে না। এর আগে সাদেক হোসেন খোকা ও মাহমুদুর রহমান মান্নার একটি ফোনালাপে তোলপাড় হয় রাজনৈতিক অঙ্গন।

সূত্র জানায়, পর পর এসব ঘটনায় বেশ বিব্রত দলটির সিনিয়র নেতারা। মুঠোফোনে ফেসবুক-ম্যাসেঞ্জার-হোয়াটস্ অ্যাপ ব্যবহার করে তারা একে অপরের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করছে। গ্রেপ্তার আতঙ্কে আত্মগোপানে থাকা নেতারা মোবাইল হ্যাকিংয়ের ভয়ে পরিবার পরিজনদের সঙ্গেও যোগাযোগ রাখছেন না। তাদের ধারণা- তাদের নিজস্ব নম্বর ছাড়াও পরিবারের সব সদস্যদের নম্বর মনিটরিং করা হচ্ছে। যার ফলে বিভ্রান্ত হচ্ছেন নেতাকর্মীরা। জানতে চাইলে লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান বলেন, টেলিফোনে আঁড়িপাতা ও ফোনালাপ ফাঁস করা বাথরুমের ছিদ্র দিয়ে দেখার মতো অত্যন্ত সংকীর্ণ মনোভাবের পরিচায়ক। এটি ব্যক্তির গোপনীয়তা লঙ্ঘন, এটি শাস্তিযোগ্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত হওয়া উচিত।

সিনিয়র নেতাদের অভিযোগ, আবার কোনো কোনো বিশেষ নেতার ও পরিবারের মুঠোফোন ট্র্যাকিং করা ছাড়াও তার ভয়েজের টোন দিয়ে রাখা হয়েছে। ওই টোন দিয়েই তিনি যে কোনো মোবাইলেই কথা বললেই সেটা মনিটিরিংয়ের মাধ্যমে বের করা সম্ভব হবে। বিএনপির কয়েকজন নেতার ভয়েজ সফটওয়ারে দিয়ে মনিটরিং করা হচ্ছে বলে জানতে পেরেছেন তারা। এমনকি ড্রাইভার ও বাড়ির কেয়াটেকারেরও মোবাইল নম্বরও ট্র্যাক করা হচ্ছে। তাদের মতে, দলের সফলতা-ব্যর্থতা নিয়ে অনেক নেতাই ফোনে নিজেদের মধ্যে আত্মসমালোচনা করেন। কিন্তু সরকার অত্যন্ত সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনার অংশ হিসেবে সংস্থাগুলোকে দিয়ে ইচ্ছেমত ‘এডিট’ করে এগুলো ফাঁস করছে। এ সূত্র ধরেই বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের ব্যক্তিগত ব্যবহৃত মোবাইল নম্বরটি হ্যাকড করা হয়। এ ছাড়াও ভুয়া ফেইসবুক আইডি খুলেও একবাধিকবার বিব্রত করা হয় তাকে।

এ বিষয়ে বিএনপির অনেক নেতার অভিযোগ সরকার আন্দোলন ঠেকাতে কৌশলে এসব কাজ করছে। তারা বলছেন, বেছে বেছে তারা এমন রেকর্ড ফাঁস করছেন যেগুলো কোনো না কোনোভাবে দলের বিপক্ষে যায়। তারা বলেন, এসব আতঙ্কে নেতাকর্মীরা ভিন্ন ভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে ভিন্ন মাধ্যমে যোগাযোগ রক্ষা করছেন। যেটা খুব একটা সুবিধাজনক উপায় নয়। নেতাদের দাবি- নজরদারি ও ফোন ট্র্যাকিং না করা হলে বিএনপি এর অঙ্গসংগঠনের নেতারা ও কর্মীদের মধ্যে যোগাযোগ আরো বাড়তো। সেই ক্ষেত্রে আন্দোলনে সাফল্য আসাও সম্ভব ছিল। কিন্তু নেতাকর্মীরা ভয়ে থাকার কারণে সঠিকভাবে মাঠে নেতাদের মধ্যে সমন্বয় করতে না পারায় ও দিকনির্দেশনা না দেয়ার কারণেও অনেক কাজ হচ্ছে না। ভোরের কাগজ।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ