প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

শুধুই চুমু বিষয়!

রেজানুর রহমান : টিপ টিপ বৃষ্টি পড়ছে। সেদিকে খেয়াল নেই ওদের। বরং বৃষ্টিতে ভিজে ফুটপাতের উপর বসে প্রকাশ্যে চুমু খাচ্ছে দু’জন। একজন তরুণ, অন্যজন তরুণী। তাদের পাশেই একটু দূরে ছাতার নীচে বসে মোবাইলে আঙ্গুল চালাচ্ছে অন্য একজন তরুণ। তার পাশে চায়ের দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে আছে দোকানের দুই কর্মচারি। এরকম একটা খোলা প্রান্তরে প্রকাশ্যে চুমু খাওয়ার দৃশ্য দেখে চমকে উঠলাম। ওদের চুমু খাওয়ার দৃশ্য ক্যামেরা বন্দী হয়ে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নিমিষেই ভাইরাল হয়ে যায়। আগ্রহ নিয়ে বিভিন্নজনের মন্তব্য পড়তে শুরু করি। কারণ আমার জানার ইচ্ছে প্রকাশ্যে চুমু খাওয়ার এই ঘটনাকে কে কিভাবে গ্রহণ করছে তা দেখা।

প্রথমেই চোখ আটকে গেল বিপুল হাসানের দেওয়া একটি পোস্টের ওপর। দুই তরুণ-তরুণীর প্রকাশ্যে চুমু খাওয়ার ছবিটি পোস্ট করে তিনি লিখেছেন, এ কোন প্রজন্ম? এই দুপুরের মুষল বৃষ্টিতে ছবিটি কই তোলা বলা নিস্প্রোয়জন। বলা বাহুল্য ছবিতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র-শিক্ষক কেন্দ্রের নাম ফলকের কিছু অংশ দৃশ্যমান। কাজেই এটি যে ছাত্র শিক্ষক কেন্দ্রের সামনের একটি দৃশ্য তা সহজেই বোঝা যায়।

বিপুল হাসানের স্ট্যাটাসের ওপর অনেকেই মন্তব্য করেছেন। পার্থ সরকার লিখেছেন, প্রেম তো করতেছে ভাই। মারামারি তো আর না… মৃধা আলাউদ্দিন লিখেছেন, কুপ্রজন্ম। আশিক বন্ধ লিখেছেন, মারাত্মক প্রজন্ম। আর এ রাহুল লিখেছেন, ওনারা বহিরাগত না নিশ্চয়ই? তাহলে সমস্যা নাই। সাগর খান লিখেছেন হাতুড়ীলীগরে খবর দে। হাত ধরলেই নাকি মারে। তাহলে তো এদের অবস্থা ভয়াবহ হবে। কাজী রতনা লিখেছেন, ভাল্লাগছে ব্যাপারটা। এই দেশে মানুষের ভালোবাসা বোধ কমছে। এজন্যই প্রজন্ম নষ্ট হয়। বৃষ্টিতে প্রেম করবে না তো মারামারি করবে? মুরাদ নূর লিখেছেন, তাদের জন্যই আমাদের প্রজন্ম আজ অস্থির। রবিউল ইসলাম রবি লিখেছেন, ভাই মারামারির চেয়ে অন্তত ভালো। উজ্জ্বল কবির হিমু লিখেছেন, সমস্যা কি? ওরা তো প্রেম করছে…
এবার সোহেল অটল নামের একজনের স্ট্যাটাস এবং বিভিন্ন জনের মন্তব্য উল্লেখ করছি। দুই তরুণ-তরুণীর প্রকাশ্য চুমু খাওয়ার ছবিটি পোস্ট করে সোহেল অটল লিখেছেন, “আজকের ছবি। বৃষ্টিস্নাত দিনে প্রেমিক-প্রেমিকার চুম্বনরত এই ছবি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে টিএসসি থেকে তোলা। বহুদিন এমন চমৎকার দৃশ্য দেখি না। ক্ষুধা, দারিদ্র আর মৌলবাদের এই দেশে এই দৃশ্য বেমানান। এতো সুন্দর দৃশ্য গ্রহণ করার মানসিকতা আমাদের তৈরি হয়নি। কেউ তৈরি করে দেয়নি…
সোহেল অটলের স্ট্যাটাসের প্রেক্ষিতে মাহবুবুল আলম রিপন কৌতুকের সুরে লিখেছেন, ‘আমি কি ঠিকঠাক দেখতে পাচ্ছি। নাকি চোখের সমস্যা হইল আমার?’ আরিফা সুলতানা লিখেছেন, প্রকাশ্যে ভালোবাসা হোক, হত্যা, সহিংসতা নয়… এ মিজান লিখেছেন, কয়েকদিন ধরে আমি প্রেমের মাঝে ছিলাম না। কেউ আমার ভিতরে এক ফোটা প্রেম জাগাতে পারেনি, মাইরি বলছি… ছবিটা দেখে প্রেমের মাঝে ডুবে গেলো আমার ভেতর, বাহির… অমিত কর লিখেছেন, নোংরা মনের মানুষ ছাড়া কেউ এই ছবির মধ্যে খারাপ কিছু পাবে না। সালমান ফারসি লিখেছেন, ভালই এই চুমাচুমির দৃশ্য। কে না চুমু দেয়? সবাইকে ওরা দেখাচ্ছে চুমু দিতে পারে। প্রমাণ করেছে তারা সাহসি। উভয়েই খালি গায়ে হলে টাইটানিক ছবিতে ল্যাংটা হয়ে পোজ দেওয়ার মতো একটা ক্লাসিক পিকচার হতো… লিটু হাসান লিখেছেন, ভালোবাসার বৃষ্টি। রবিউল ইসলাম জীবন লিখেছেন, প্রথা ভাঙ্গুক। তরুণেরা মনভরে ভালোবাসুক… তারুণ্য তাপস লিখেছেন, সন্দেহ হচ্ছে… উনারা কি ছাত্র-ছাত্রী? নাকি প্রেমিক যুগল? নাকি বর্তমান সময়ের লাভ জিহাদ? আলোচনায় আসার জন্য এই ধরনের নোংরা কৌশল…
রাজিব আহমেদ নামে অন্য একজন ছবিটি পৃথকভাবে পোস্ট করে লিখেছেন, ফেসবুকে শুধু ধর্ষনই ভাইরাল হয় না, ভালোবাসাও হয়। আমি প্রেমিক মানুষ। ভালোবাসার লোক। দারুণ হয়েছে ছবিটা…

রাজিবের স্ট্যাটাসের প্রেক্ষিতে এস আই সুমন লিখেছেন, দেশটা বিকশিত হয়ে গেছে। আব্দুল্লাহ আল সুমন লিখেছেন, লা হাওলা ওয়ালা কুয়াতা… রুনা লিখেছেন, এ বছরের সেরা ভালোবাসার ছবি। বুলবুল বিশ্বাস লিখেছেন, বর্ষাস্নাত কদমফুল অথবা একটি চুম্বনের গল্প। আহা জীবন! বেঁচে থাকো নিষ্পাপতা! সাদ্দাম হোসেন লিখেছেন, হায়রে ভালোসা! এম এ রাজা লিখেছেন, প্রেমিক মানুষের চোখেই প্রেম ধরা খায়। আহারে, কি ভালো লাগছে?
প্রকাশ্যে চুমু খাওয়ার ঘটনায় এ ধরনের আরও অনেকের মন্তব্যে সয়লাব হয়ে গেছে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম। কেউ সাধুবাদ জানিয়েছেন। কেউ আবার চরম বিরোধীতা করেছেন। এই লেখাটি যখন লিখছি তখন আমার এক বন্ধুর টেলিফোন পেলাম। সে খুব ক্ষুদ্ধ। রাগত স্বরে বলল, ‘আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে এসব কি হচ্ছে বলোতো! আন্দাজে ধরে নিয়েছি সে বোধকরি প্রকাশ্যে চুমু খাওয়ার ঘটনারই ইঙ্গিত করছে। তবুও জিজ্ঞেস করলাম, ক্যাম্পাসে আবার কি হলো?
বন্ধু রাগত স্বরে বলল, কি আশ্চার্য্য ঘটনা সম্পর্কে তুমি কি কিছুই জাননা? টিএসসিতে প্রকাশ্য দিবালোকে চুমু খাওয়ার দৃশ্য কি এখনও তোমার চোখে পড়ে নাই? খুব একটা আগ্রহ না দেখিয়ে বললাম, ও এই ঘটনা। দেখেছি… সমস্যা কোথায়?

আমার প্রশ্ন শুনে বন্ধু রেগে বলল, সমস্যা কোথায় মানে? তুমি এইসব কি বলতেছ? বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস কি প্রকাশ্যে চুমু খাওয়ার জায়গা? বন্ধুর কথায় অবাক হয়ে পাল্টা প্রশ্ন করলাম প্রকাশ্যে চুমু খেলে ক্ষতি কি? ওরা তো মারামারি করছে না। প্রেম করছে। ভালোবাসা ছড়িয়ে দিচ্ছে… এতে তো দোষের কিছু দেখছি না।
বন্ধুটি এবার আমার উপর চরম বিরক্ত হয়ে বলল, শোনো রেজানুর আমি প্রেমের বিপক্ষে নই। কিন্তু তোমরা প্রকাশ্য চুমুকে যেভাবে সাপোর্ট করছো আমি তা করতে পারছি না। আমি আগামীর দিনগুলোতে ভয়াবহ অন্ধকারের আভাস পাচ্ছি। আমাদের দেশে সাধারনত কি হয়? যা কিছু নেতিবাচক তাকেই আমরা সাদরে গ্রহণ করি। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কথাই ধরা যাক। প্রাচ্যের অক্সফোর্ড নামে যার খ্যাতি ছিল। এখন বিশ্বের হাজার বিশ্ববিদ্যালয়ের নামের তালিকাতেও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নাম নাই। পড়াশুনায় অনেক পিছিয়ে গেছে। এ নিয়ে কারও কোনো মাথা ব্যাথা নাই। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে কি কোনো ভালো খবরের জন্ম হয় না? হয়। কিন্তু ভালো খবরের প্রচার সেভাবে হয় না। এই যে প্রকাশ্যে চুমু খাওয়ার দৃশ্যটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ভাইরাল হয়ে গেল, এখন যদি সবাই ভাবে যে এই বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রকাশ্যে চুমু খেতে আপত্তি নাই। প্রকাশ্যে চুমু খাওয়া আমার অধিকার। যে যেখানে পারছে প্রকাশে চুমু খাচ্ছে… তখন পরিস্থিতিটা কোথায় গিয়ে দাড়াবে? বলেই আমার সেই বন্ধুটি ফোন কেটে দিল।

বন্ধুর কথাগুলো ভেবে কেন যেন নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিএসসিতে প্রেমিক যুগলের প্রকাশ্যে চুমু খাওয়ার ঘটনার পাশাপাশি আরও অনেক ঘটনাই চোখের সামনে ভেসে উঠলো। বিশ্বকাপ ফুটবলে চমক দেখিয়েছে ক্রোয়েশিয়া। আমাদের দেশে ক্রোয়েশিয়ার মহিলা প্রেসিডেন্ট যতনা তার দেশের ভালো ফুটবল খেলার জন্য জনপ্রিয় তার চেয়ে জনপ্রিয় তার খোলোমেলা ছবির জন্য। রাশিয়া বিশ্বকাপ ফুটবলের সেমিফাইনালে উঠে যাওয়ার পর ওই দেশের একজন সুন্দরী মডেল তারকা খেলোয়াড়দের উদ্দেশে তার নগ্ন ছবি উপহার দিয়েছিলেন। ওই সব দেশে নারীর শরীর প্রদর্শন করা হয়তো আপত্তিকর কোনো ইস্যু নয়। আশংকা হচ্ছে, আমরা অচলায়তন ভাঙ্গার কথা বলে যথেচ্ছ যৌনাচারের চর্চায় কারও দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছি নাতো? প্রকাশ্যে চুমু খাওয়া যৌনাচার নয়। তবে এর প্রভাব যদি যত্রতত্র বাড়তে থাকে তাহলে সেটাই হবে বিপদের কারণ। প্রিয় পাঠক, আশাকরি আমার বক্তব্য ধরতে পেরেছেন। কথায় বলে, আকাল মান্দ কে লিয়ে ইশারাই কাফি হে…

রেজানুর রহমান: কথাসাহিত্যিক, নাট্যকার, সম্পাদক আনন্দ আলো।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত