প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

প্রশাসনের অপকর্মের দায়ও সরকারের

মাসুদা ভাট্টি: বড় পুকুরিয়া কয়লা বিদ্যুৎ কেন্দ্র বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে। কারণ হিসেবে বলা হয়েছে যে, পর্যাপ্ত কয়লা না থাকায় বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি সাময়িক বন্ধ রাখা হয়েছে। এর ফলে জাতীয় গ্রিডে গতকাল থেকে ৩০০ মেগাওয়াটেরও বেশি বিদ্যুৎ কম যোগ হবে এবং এর প্রভাব পড়বে উত্তরবঙ্গের কৃষির ওপর। প্রশ্ন হলো, কয়লা নিঃশেষ হয়ে যাওয়া এবং বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ হওয়ার এই ঝুঁকির বিষয়টি আগাম কেন জানা গেলো না? যারা ওখানে দায়িত্বশীল পদে রয়েছেন তারা কেন বিদ্যুৎ কেন্দ্রটি বন্ধ হওয়ার পর্যায়ে নিয়ে এলেন? এসব প্রশ্ন নিয়ে এখন বিদ্যুৎ বিভাগে তোলপাড় চললেও ক্ষতিটা যে সরকারেরই হলো সে কথা নতুন করে বলার প্রয়োজন নেই।

প্রকাশিত সংবাদ থেকে হঠাৎই জানা যায় যে, বড় পুকুরিয়া কয়লা খনি থেকে উত্তোলিত কয়লা যা মূলত বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্রে ব্যবহৃত হয়ে থাকে তা চুরি হয়ে গেছে। গায়েব হওয়া কয়লার পরিমাণ ১ লাখ ৪২ হাজার টন। যে কয়লা রাখা ছিল উন্মুক্ত স্থানে। এতো কয়লা গায়েব হতে কতোদিন সময় লাগতে পারে? নিঃশ্চয়ই সেটা একদিনে গায়েব হয়নি? খোঁজ নিয়ে জানা যায় যে, বড় পুকুরিয়া কয়লা খনি থেকে উত্তোলিত কয়লা নিয়মিতই পাচার বা চুরি হতো। টনকে টন কয়লা সেখান থেকে প্রতিদিন সরিয়ে ফেলার ক্ষেত্রে বিদ্যুৎ কেন্দ্র, খনির কর্মকর্তাবৃন্দসহ কারো দায়-দায়িত্বই কম নয়। যেহেতু প্রতিদিন কয়লা খনি থেকে কয়লা উত্তোলিত হচ্ছে, সেহেতু চুরি ধরা পড়তো না এতোদিন। কিন্তু গত মাস কয়েক যাবত বড় পুকুরিয়া কয়লাখনিতে শ্রমিকরা আন্দোলন করছেন এবং কয়লা উত্তোলন বন্ধ রয়েছে। ফলে জমাকৃত কয়লা ধীরে ধীরে গায়েব হয়ে গেছে। যার বাজার মূল্য আড়াইশ কোটি টাকার মতো। কিন্তু তার চেয়েও বড় ক্ষতি হলো এই কয়লা গায়েব হয়ে যাওয়ার ফলে বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ হয়ে গেলো।

নির্বাচনের বছর চলছে। সরকারকে ভেতরে ও বাইরে বহুবিধ শত্রুর মোকাবিলা করতে হচ্ছে। ঠিক সেই সময় গণমাধ্যমে প্রতিদিন যদি সরকারের বিরুদ্ধে যায়, এমন চুরি ও অদক্ষতার খবর প্রকাশিত হয় তাহলে সেটা কোনোভাবেই ভালো লক্ষণ নয়।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে রাখা স্বর্ণ কমে গেছে, মিশ্র ধাতু হয়ে গেছে বলে প্রকাশিত খবর আসলে সরকারেরই একটি গোয়েন্দা সংস্থার তৈরি রিপোর্টের ভিত্তিতে করা হয়েছে। মজার ব্যাপার হলো, রিপোর্টটি প্রকাশিত হয়েছে একটি বিশেষ পত্রিকায়, যার সঙ্গে সরকারের রয়েছে প্রকাশ্য দ্বন্দ্ব। প্রশ্ন উঠতেই পারে যে, এই খবর অন্যত্রও প্রকাশিত হতে পারতো, কিন্তু কেন ওই বিশেষ পত্রিকাতেই হলো? পত্রিকাটি এক্ষেত্রে প্রশংসার দাবি রাখে, কিন্তু গোয়েন্দা সংস্থার পক্ষ থেকে যারা রিপোর্টটি ‘লিক’ করেছেন তাদের ভূমিকা নিয়ে নিঃসন্দেহে প্রশ্ন তোলা যেতে পারে। একই কথা প্রযোজ্য বড় পুকুরিয়া কয়লা খনি প্রসঙ্গেও। রাষ্ট্রের এতো বড় ক্ষতির সংবাদ প্রকাশ করে গণমাধ্যম যে প্রশংসার দাবিদার তা তাদেরকে দিতে হবে। কিন্তু যারা এই ডাকাতির সঙ্গে যুক্ত তাদেরকে কেবল অদক্ষতার দায়ে চাকুরিচ্যুতই নয়, তাদেরকে আইনের আওতায় এনে উপযুক্ত শাস্তির ব্যবস্থা অবিলম্বে জরুরী। নাহলে নির্বাচনের বছরে সরকারকে আরো বড় বিপদের সম্মুখীন হতে হবে, তাতে কোনোই সন্দেহ নেই। বাংলাদেশ ব্যাংকের ভল্টে অনিয়মের জন্য যেমন অর্থমন্ত্রীসহ তার দফতর, বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা ও কর্মচারীবৃন্দকে জবাব দিতে হবে তেমনই বিদ্যুৎ ও জ্বালানী মন্ত্রণালয়ের অধীন বড় পুকুরিয়ায় কয়লা চুরির জন্য বিদ্যুৎ উৎপাদন বন্ধ হওয়ার জন্যও এই মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা, প্রতিমন্ত্রী, সচিব সহ সকলেই জবাবদিহিতার আওতায় আসবেন। কানাঘুঁষা শোনা যাচ্ছে যে, এই মন্ত্রণালয়ে আরো অনেক অনিয়মের ঘটনা ঘটেছে এবং সামনে সে জন্য বিদ্যুৎ ব্যবস্থায় মহা বিপর্যয়ের আশঙ্কা রয়েছে। সময় থাকতে এসবের দিকে নজর না দিলে আখেরে ক্ষতিটা যে সরকারেরই হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

আমরা জানি না আরো কী বিস্ময়কর চুরি, ডাকাতি, অনিয়ম, অদক্ষতার খবর সামনে অপেক্ষা করছে আমাদের। ধারণা করতে অসুবিধে হয় না যে, প্রশাসনের ভেতর ঘাপটি মেরে থাকা সুযোগসন্ধানীর দল এতোদিন চুরি-ডাকাতি করে এখন আবার সেসবই সরকারের বিরুদ্ধে কাজে লাগানোর জন্য উন্মুখ হয়ে আছে। আমরা জানি যে, রাজনৈতিক সরকারের আমলে যতো দোষ রাজনীতিবিদদেরই হয়, সরকারী কর্মকর্তারা যতো দোষই করেন না কেন, তারা হাঁসের মতো পরিচ্ছন্ন থাকার সুযোগ পেয়ে যান। এখনও সেরকম ঘটনাই ঘটছে। কিন্তু তাই বলে সরকারী কর্মচারীদের নিয়ন্ত্রণ যাদের হাতে সেই রাজনৈতিক নেতৃত্বও কোনোভাবে দোষ এড়াতে পারবেন না।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ