প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

হলি আর্টিজানে হামলা
মাস্টারমাইন্ডদের পরিচয় দৃশ্যমান

মাহফুজ উদ্দিন খান: একটি ভয়াল দিন। যেদিনটি ছিল কিছু মানুষের কাছে অকল্পনীয় এক অভিজ্ঞতা। কিছুক্ষণ আগেও যারা প্রাণের সঞ্চারে পৃথিবীকে মোহিত করেছেন তাদের নিথর দেহ পড়েছিল একটি অভিজাত রেস্টুরেন্টে। ২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলায় নিরপরাধ সেই মানুষগুলোকে নির্মমভাবে হত্যা করা হয়। এই ভয়াবহ জঙ্গি হামলায় জড়িত ২১ জনকে চিহ্নিত করে আটজনের বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দিয়েছে পুলিশ। হামলার দুই বছর পর দেশ-বিদেশে বহুল আলোচিত এ ঘটনার অভিযোগপত্র দেয়া হলো।

সূত্রমতে, দুই বছর ২২ দিন তদন্ত শেষে হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার ঘটনায় দায়ের করা মামলার চার্জশিট (অভিযোগপত্র) আদালতে জমা দিয়েছে তদন্তকারী সংস্থা পুলিশের কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্স ন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। সোমবার বিকাল পৌনে ৪টার দিকে আদালতের জিআর শাখায় চার্জশিটটি দাখিল করেন মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশের কাউন্টার টেররিজম ইউনিটের পরিদর্শক হুমায়ুন কবীর।

জীবিত আট জনের বিরুদ্ধে এই চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। চার্জশিটে অন্য অভিযুক্ত ১৩ জন ২০১৬ সালের ১ জুলাই থেকে পরবর্তী সময় পর্যন্ত বিভিন্ন অভিযানে নিহত হয়েছেন। জঙ্গি হামলার অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে নর্থ সাউথ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষক রেজাউল হাসনাত করিমকে। একই ঘটনায় আটক কানাডার টরেন্টো ইউনিভার্সিটির ছাত্র তাহমিদ হাসিব খানকে এক বছর আগে এই মামলার অভিযোগ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

হামলার কারণ হিসেবে যেসব বিষয় তুলে ধরা হয়েছে- দেশকে অস্থিতিশীল করা, বাংলাদেশকে জঙ্গি-রাষ্ট্র বানানো, সরকারকে কোণঠাসা করে দেশের অর্থনীতিকে বিপর্যস্ত করা, সরকার যাতে চাপে পড়ে, বিনিয়োগকারীরা যাতে দেশ ছেড়ে চলে যায় বা না আসে, সরকার যাতে বিব্রত হয়, সরকার যাতে আসল জঙ্গিদের ধরতে না পেরে নিরীহ মানুষকে নির্যাতন-নিপীড়ন করে, মানুষ যাতে অতিষ্ঠ হয়ে পড়ে সরকারের ওপর, সাধারণ মানুষ যেন সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ করে ও আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা।

মামলায় জীবিত আট জঙ্গির বিরুদ্ধে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। এদের মধ্যে ৬ জন গ্রেফতার রয়েছে। এরা হলেন- রাজীব গান্ধী, মিজানুর রহমান ওরফে বড় মিজান, হাতকাটা সোহেল মাহফুজ, রাকিবুল হাসান রিগ্যান, হাদিসুর রহমান সাগর, রাশেদ ইসলাম ওরফে আবু জাররা ওরফে র্যাশ। পলাতক দুই জঙ্গি হলেন- শরিফুল ইসলাম ওরফে খালিদ ও মামুনুর রশীদ ওরফে রিপন। এরা ভারতে আত্মগোপন করে আছেন বলে গোয়েন্দাদের ধারণা। এই মামলার চার্জশিটে আরো ১৩ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হলেও তারা বিভিন্ন অভিযানে নিহত হওয়ায় তাদেরকে মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়।

মামলাটির চার্জশিট প্রদান করতে ২১১ জনের সাক্ষ্য গ্রহণ করা হয়েছে। চার্জশিট প্রদানের পাশাপাশি মামলার ৭৫ টি আলামত আদালতে উপস্থাপন করা হয়েছে। গতকাল ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানিয়েছেন ডিএমপির অতিরিক্ত কমিশনার ও সিটিটিসির প্রধান মনিরুল ইসলাম।

মূল পরিকল্পনাকারী

হামলার উদ্দেশ্য সম্পর্কে চার্জশিটে বলা হয়, এই হামলার মূল পরিকল্পনাকারী হলেন বাংলাদেশি বংশোদ্ভূত কানাডিয়ান নাগরিক তামিম আহমেদ চৌধুরী। ভয়াবহ এই হামলায়  চিহ্নিত ২১ জনের মধ্যে পাঁচজন সরাসরি অংশ নেন। বাকিরা হামলার পরিকল্পনা, সমন্বয়, প্রশিক্ষণ এবং অস্ত্র-বোমা সংগ্রহসহ বিভিন্ন পর্যায়ে জড়িত ছিলেন। হামলার মূল প্রশিক্ষক (মাস্টার ট্রেইনার) মেজর জাহিদ কিংবা তানভির কাদেরি, নূরুল ইসলাম মারজান ছিলেন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আসামি। গুলশান হামলার জন্য বগুড়ার দুই জঙ্গিকে নিয়োগ করেন রাজীব আর বসুন্ধরায় বাসা ভাড়া ও জঙ্গিদের উদ্বুদ্ধও করেন তিনি। জঙ্গি সাগর সীমান্তের ওপার থকে আনা অস্ত্র ঢাকায় মারজানের কাছে পৌঁছান। বাশারুজ্জামান মধ্যপ্রাচ্যের একটি দেশ থেকে দুই দফা হুন্ডির মাধ্যমে আসা ২০ লাখ টাকা গ্রহণ করেন এবং সেই টাকা গুলশান হামলায় ব্যবহৃত হয়।  যারা এই হামলা চালিয়েছিলেন তারা ৫ থেকে ৬ মাস ধরে পরিকল্পনা করেছিলেন। সেখানে হামলা চালানো জঙ্গিদের উদ্দেশ্য ছিল  আন্তর্জাতিক জঙ্গিগোষ্ঠীগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করা। বিশ্বের বড় বড় জঙ্গি সংগঠনের অনেক অস্ত্রশস্ত্র আছে। তাই তাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করলে এসব অস্ত্রশস্ত্র এবং প্রযুক্তিগত ও আর্থিক সহায়তা পাওয়া যাবে এমন ধারণা ছিল জঙ্গিদের।  আর সরকারকে বেকায়দায় ফেলতেও জঙ্গিরা এই হামলা চালিয়েছিলেন। এতে বিদেশি বিনিয়োগকারীরা এদেশ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিবে। এতে সরকার আরও বিপদে পড়বে।

সংবাদ সম্মেলনে সিটিটিসি প্রধান মনিরুল ইসলাম বলেন, অভিযানে নিহত হলি আর্টিজানের পাচক সাইফুল ইসলামকে শুরুতে সন্দেহের তালিকায় রাখা হলেও তার সম্পৃক্ততার কোনো প্রমাণ তদন্তকারীরা পাননি। এমনকি জঙ্গি হামলার পর আটক হলি আর্টিজানের ডিশ ক্লিনার জাকির হোসেন শাওনের কোনো সম্পৃক্ততা পাওয়া যায়নি। হামলায় অংশ নেওয়া নব্য জেএমবির পাঁচ জঙ্গি নিবরাজ ইসলাম, মীর সামেহ মোবাশ্বের, রোহান ইবনে ইমতিয়াজ, খায়রুল ইসলাম পায়েল ও শফিকুল ইসলাম উজ্জ্বল নিহত হন ওই অভিযানে। আর পরে জঙ্গিবিরোধী বিভিন্ন অভিযানে হামলার মূল পরিকল্পনাকারী তামিম চৌধুরী, জাহিদুল ইসলাম, তানভীর কাদেরী, নূরুল ইসলাম মারজান, আবু রায়হান তারেক, সারোয়ার জাহান, বাসারুজ্জামান চকলেট ও ছোট মিজান নিহত হন।

মনিরুল ইসলাম বলেন, হামলার ওই রাতে সারা পৃথিবীর নজর ছিল ঢাকার অভিজাত গুলশান এলাকায় অবস্থিত হলি আর্টিজান বেকারির দিকে। জঙ্গিরা আরো কয়েকটি স্থান রেকি করেছিল। কিন্তু হলি আর্টিজানের নিজস্ব তেমন কোনো নিরাপত্তা ব্যবস্থা না থাকার কারণে সেটিকেই বেছে নেওয়া হয়। সেইসঙ্গে হলি আর্টিজানকে বেছে নেওয়ার পেছনে আরো যেসব কারণ ছিল সেগুলো হলো-পালানোর সুবিধা ও সর্বোচ্চ সংখ্যক বিদেশিকে একসঙ্গে পাওয়া। ২৭ রমজান ছিল এ ঘটনার দিন। তারা মনে করেছে, এই জঘন্য কাজে তারা বেশি সওয়াব পাবে। রেহান ইমতিয়াজ এবং খায়রুল ইসলাম পায়েল ওই হামলায় নেতৃত্ব দিয়েছিল বলেও জানান মনিরুল ইসলাম।

এই মামলার তদন্ত করতে দুই বছর লাগল কেন- এমন প্রশ্নের জবাবে মনিরুল বলেন, এ ঘটনায় সরাসরি যারা অংশগ্রহণ করেছিল, তারা ঘটনাস্থলেই নিহত হয়। জীবিত কাউকে ধরা যায়নি। ফলে আলামত পরীক্ষা ও প্রাপ্ত ফলাফল পর্যালোচনা করতে সময় লেগে যায়। অভিযানকালেও বেশ কয়েকজন নিহত হয়েছে, যাদের জীবিত ধরতে পারলে আরো বেশকিছু তথ্য পেতে পারতাম, আরো দ্রুত তদন্ত শেষ হতো। এ ছাড়া তদন্ত যাতে নির্ভুল হয়, এ কারণে আমাদের কিছু সময় লেগেছে। মনিরুল ইসলাম বলেন,এ ঘটনায় ১৭ জন সার্ভাইভার যারা ভেতরে ছিলেন, তাদের জবানবন্দি রেকর্ড করিয়েছি, ৭৫টি আলামত আদালতে পাঠিয়েছি। নিহত ব্যক্তিদের সঙ্গে থাকা বিভিন্ন জিনিসপত্র স্বজনদের কাছে ফেরত দিয়েছি। তদন্তে সাক্ষী কতজন ছিল? উত্তরে মনিরুল বলেন, এ মামলার সব মিলে মোট সাক্ষীর সংখ্যা ২১১ জন। এদের মধ্যে ১৪৯ জন ঘটনা সম্পর্কে জানে কিংবা ঘটনা দেখেছে, প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে জানে।

মামলায় আগে গ্রেফতারকৃত নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটির সাবেক শিক্ষক হাসনাত রেজাউল করিম ও শাওনের অভিযোগ পত্রে নাম নেই কেন প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, মামলার এজাহারের কলামে  কোনো আসামির নাম ছিল না। বডিতে নাম ছিল। যাদের জীবিত উদ্ধার করেছি, এমন ১৭ জনের জবানবন্দি আদালতে দেওয়া হয়েছে, পাশাপাশি যে আসামি জীবিত উদ্ধার হয়েছে, তাদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি এবং আলামত যাচাই-বাছাই করে যাদের সম্পৃক্ততার নিশ্চিত তথ্য পাওয়া গেছে, তাদের নাম চার্জশিটে দেওয়া হয়েছে।

ওই হামলা নিয়ে হাসনাত করিম পুলিশকে কী বলেছে প্রশ্ন করা হলে মনিরুল ইসলাম বলেন, যারা জীবিত উদ্ধার হয়েছে, তাদের দেওয়া তথ্যের পাশাপাশি আমরা আরো জানতে পেরেছি, নব্য জেএমবির একটি সাংগঠনিক পরিকল্পনা নিয়ে এ হামলা করা হয়েছে। তাদের এই পরিকল্পনার কোথাও আমরা হাসনাত করিমের সম্পৃক্ততা পাইনি। এ ছাড়া যারা জীবিত গ্রেপ্তার হয়েছে, তাদেরও কোনো কথায়ও হাসনাত করিমের নাম আসেনি। সুতরাং হাসনাত করিমের দেওয়া ব্যাখ্যার চেয়েও অন্য যারা প্রত্যক্ষদর্শী ছিল, তাদের জবানবন্দির ওপর আমরা ডিপেন্ড করেছি এবং চার্জশিটে আদালতকে ব্যাখ্যা করেছি। জঙ্গি হামলার হাসনাত করিমের ছবিগুলো আমরা ব্যাখ্যা করেছি।

গুলশানের হামলায় আন্তর্জাতিক কোনো গোষ্ঠীর সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে কী-না প্রশ্ন করা হলে তিনি জানান, নব্য জেএমবির কোনো শীর্ষ নেতাকে আমরা জীবিত ধরতে পারিনি। অন্য যাদেরকে ধরা হয়েছে তাদের কাছে আন্তর্জাতিক যোগাযোগের কোনো যোগসূত্র পাইনি। তামিম ছিল এ ঘটনার মূল পরিকল্পনাকারী। আন্তর্জাতিকভাবে কারো সঙ্গে তারই যোগাযোগ থাকার কথা ছিল। তামিমকে ধরার সময় তার ইলেকট্রনিক ডিভাইসগুলো অভিযানের আগেই ধ্বংস করে পুড়িয়ে দিয়েছে। তাই বিদেশি কোনো সংগঠন, আইএস কিংবা আল-কায়েদা, হিযবুত তাহ্?রীর কিংবা অন্য কোনো সংগঠনের সঙ্গে যোগাযোগের তথ্য আমরা পাইনি।

২০১৬ সালের ১ জুলাই রাতে গুলশান-২ এর ৭৯ নম্বর সড়কে হলি আর্টিজান বেকারিতে থাকা বিদেশিসহ সব অতিথিকে জিম্মি করে জঙ্গিরা। এরপর ১৭ বিদেশি ও তিন বাংলাদেশিসহ ২০ জন জিম্মিকে ধারালো অস্ত্র দিয়ে হত্যা করা হয়। রাতে পুলিশ-র্যাবের যৌথ অভিযানে জঙ্গিদের গুলি ও গ্রেনেড হামলায় ৩৩ পুলিশ, আনসার ও র্যাব সদস্য আহত হন। এদের মধ্যে সহকারী কমিশনার রবিউল করিম ও বনানী থানার ওসি সালেহ উদ্দিন রাতেই মারা যান। পরদিন সকালে সেনাবাহিনীর নেতৃত্বে যৌথ অপারেশনে (অপারেশন থান্ডার বোল্ড) ৫ জঙ্গিসহ ৬ নিহত হয়। আইএসপিআরের এক সংবাদ সম্মেলনে অভিযানে তিন বিদেশিসহ ১৩ জনকে জীবিত উদ্ধারের কথা বলা হয়। ঘটনার পর ৪ জুলাই গুলশান থানায় মামলা দায়ের হয়।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ