প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ইমাম-মুয়াজ্জিনদের ভাগ্য বদলায় না

ডেস্ক রিপোর্ট : সমাজে ইমাম-মুয়াজ্জিন সম্মানী ব্যক্তি। কিন্তু সময়ের পরিক্রমায় সবকিছু পরিবর্তন হলেও বদলাচ্ছে না দেশের প্রায় ১০ লাখ ইমাম-মুয়াজ্জিনের ভাগ্য। পরিবার-পরিজন নিয়ে অভাব অনটনে দিনাতিপাত করছেন বেশির ভাগ মসজিদের ইমাম-মুয়াজ্জিন। এটাকে ভাগ্যের স্বাভাবিক ফয়সালা বলেই নীরবে সয়ে যাচ্ছেন সব ধরনের যন্ত্রণা। দেশের শহর ও গ্রামের মসজিদগুলোতে খোঁজ নিয়ে দেখা যায়, ফ্রি খাওয়া ও থাকার ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিন ধরে মসজিদে চাকরি করছেন সব এলাকার ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমরা। থাকা-খাওয়া ফ্রি হলেও বেতনের পরিমাণ অত্যন্ত কম।
বেতন কমের পাশাপাশি দিন-রাত মসজিদে ডিউটি করেও নেই মানসিক স্বস্তি। প্রচণ্ড চাপের মুখে থাকতে হয় মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকে। আর্থিক ও মানসিক অসহায়ত্বের কারণে ধর্মীয় এ দায়িত্ব পালনে পূর্ণ একাগ্রতা হারিয়ে ফেলার কথা বলছেন ইমাম-মুয়াজ্জিনরা।

বায়তুল মোকাররমের সিনিয়র ইমাম মাওলানা মুহিব্বুল্লাহ বাক্বী বলেন, যদি ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের সার্বিকভাবে উপযুক্ত সম্মানী দেয়া হয় তবে তারা মানসিক অস্থিরতা ও আর্থিক দুর্বলতা কাটিয়ে উঠতে পারবেন। ইমামদের যথাযথ সম্মান দিলে দেশ ও জাতি সবাই উপকৃত হবে। তাদের সম্মানী কম হওয়ায় একদিকে ইমামগণ জাতীয় কোনো ইস্যুতে কথা বলতে ভয় পান বা চুপ থাকেন এবং এ দুর্বলতার কারণেই অনেকে বিভ্রান্ত হন।

গ্রামাঞ্চলের মসজিদগুলোতে দেখা যায়, প্রায় মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিনের বেতন কাঠামো গড়ে ১০ হাজার টাকার অনেক নিচে। যা দিয়ে নুন আনতে পান্তা ফুরায়। এর মধ্যে সন্তানদের লেখাপড়া করানো খুবই কষ্টকর হয়ে পড়ে। স্বাভাবিকভাবে পরিবার নিয়ে চলতে হিমশিম খেতে হয়। ছোট থেকেই মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব পালন করছেন ৪৫ বছর বয়সী টাঙ্গাইল কালিহাতী থানাধীন আউলিয়াবাদ তকেয়া জামে মসজিদের মুয়াজ্জিন ক্বারী মো. ইউসুফ খান। দীর্ঘদিনের মুয়াজ্জিন জীবনের কষ্টের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, সমাজে খুব সম্মানিত পেশায় নিযুক্ত হয়েও অন্যান্য যেকোনো পেশার মানুষের চেয়েও জীবন খুব কষ্টে যাচ্ছে। খেয়ে না খেয়ে পরিবারের সন্তান সন্তুতি নিয়ে দিনাতিপাত করছি। এই মুয়াজ্জিন বলেন, দিন-রাত ২৪ ঘণ্টা মসজিদের খেদমতে থাকি। মাসিক বেতন পাই মাত্র ৫ থেকে ৭ হাজার টাকা। রমজান মাসে বেতন বাদে কিছু অতিরিক্ত হাদিয়া পেলেও মসজিদের পক্ষ থেকে সারা বছর কোনো বোনাস পাই না। তা দিয়ে আল্লাহ কোনোমতে বাঁচিয়ে রাখছেন। বেতনের পাশাপাশি মসজিদ কমিটির পক্ষ থেকেও নানা মানসিক চাপ সহ্য করতে হয় বলে জানান ক্বারী ইউসুফ। তিনি বলেন, অধিকাংশ মসজিদ কমিটির অনেক সদস্য আছে যারা ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের সঙ্গে ভালো ব্যবহার করে না। সব সময় ভুল ধরার পেছনে লেগে থাকে। সামান্য বিষয় নিয়ে অনেক ইমাম-মুয়াজ্জিনকে চাকরি হারাতে হয় বলে অভিযোগ করেন এই মুয়াজ্জিন।

ইসলামিক ফাউন্ডেশনের ইমাম প্রশিক্ষণ একাডেমির (২০০৯-১০ অর্থবছরে) চালানো এক জরিপে দেখা যায়, সারা দেশে জামে মসজিদের সংখ্যা ২ লাখ ৫০ হাজার ৩৯৯টি। ২০১৭ সালে এসে জামে মসজিদের এ সংখ্যা বেড়ে হয়েছে সাড়ে ৩ লাখ। আর এসব মসজিদে একজন ইমামের পাশাপাশি কোনো কোনো মসজিদে একাধিক ইমামও (সানি ইমাম) রয়েছেন। মসজিদগুলোতে রয়েছেন একজন করে মুয়াজ্জিন। ফলে সারা দেশে ইমাম, মুয়াজ্জিন, খতিব আর খাদেমের সংখ্যা প্রায় দশ লাখের কাছাকাছি হবে বলে ধারণা দিয়েছে ইসলামিক ফাউন্ডেশন।

ইসলামিক ফাউন্ডেশন সূত্রে জানা যায়, এসব মসজিদ পরিচালনা, পরিচালনা নীতি, কমিটি, মসজিদের পদবিসহ বেতন কাঠামো নির্ধারণ করা হয় ২০০৬ সালের ১৫ই নভেম্বর ধর্ম মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে। প্রজ্ঞাপন অনুযায়ী, নীতিমালায় মসজিদের আটটি পদের মধ্যে সর্বোচ্চ সিনিয়র পেশ ইমামের বেতন স্কেল নির্ধারণ হয়েছে ১৩৭৫০-৫৫০-১৯২৫০ টাকা আর প্রধান মুয়াজ্জিনের বেতন ৫১০০-২৮০-৫৮৫০-ইবি-৩০০-১০৩৬০ টাকা।
তবে প্রজ্ঞাপন প্রকাশের ১১ বছর হলেও আজ পর্যন্ত সরকারের তরফ থেকে মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিনের ভাগ্য বদলানোর কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়নি। এছাড়া সারা দেশে ৪টি সরকারি মসজিদসহ হাতেগোনা কয়েকটি মসজিদ বাদে বাকি সব মসজিদ এলাকার মানুষদের দানে কমিটির মাধ্যমে বেসরকারিভাবে পরিচালিত হয়ে থাকে। মসজিদ কমিটিই মসজিদের বেতন কাঠামো ঠিক করে দেয়। ইমাম-মুয়াজ্জিন নিয়োগ দিয়ে থাকে। গোটা মসজিদের কার্যক্রম তাদের হাতেই নিয়ন্ত্রিত।

তবে অধিকাংশ ইমাম বিশ্বাস করেন ইমামতি ও মুয়াজ্জিন কোনো গতানুগতিক চাকরি না। তারা এই পেশাটাকে ইসলামের খেদমত হিসেবে গ্রহণ করছেন। এক্ষেত্রে যদিও অভাব-অনটনে জীবন কাটে। এমনটাই মনে করেন তেজতুরি বাজার জামে মসজিদের প্রধান মুয়াজ্জিন হাফেজ মো. হারুনুর রশীদ। তিনি জানান, আগে এ পেশার মানুষদের বেতন খুব কম ছিল। আজ থেকে ৯ বছর আগে ৩ হাজার টাকা দিয়ে এ পেশার যাত্রা হারুনুর রশীদের। পাবনার বাসিন্দা এ মুয়াজ্জিন জানান, গ্রামের চেয়ে শহরে সুযোগ-সুবিধা একটু বেশি। এখন তার বেতন ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা। এছাড়া আরো কিছু হাদিয়া পেয়ে থাকেন তিনি। তা দিয়েই কোনো মতে তার পরিবারের খরচ চালিয়ে যাচ্ছেন। তবে যোগ্যতা হিসেবে কিছু সংখ্যক ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের বেতন একটু বেশি হলেও অনেকের বেতন ১৫ হাজারের নিচে বলে জানান তেজতুরি বাজার জামে মসজিদের এ মুয়াজ্জিন। এদিকে একই মসজিদের পেশ ইমাম জানান, ইমামতি ও মুয়াজ্জিন পেশাকে চাকরি বললে মারাত্মক ভুল হবে। এটা আল্লাহর খেদমত। কষ্ট হলেও খেদমত করতে এসে টাকা পয়সার হিসাব করা ঠিক না। এই কষ্টের কথা একমাত্র আল্লাহকেই বলা উচিত। দেশের বেশির ভাগ মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিনরা অসহায় জীবনযাপন করলেও এ বিষয়ে কোনো ধরনের কথা বলতে রাজি নন পশ্চিম তেজতুরি বাজার জামে মসজিদের অধিক বেতনভুক্ত এই ইমাম সাহেব।

তবে এই পেশ ইমামের তীব্র বিরোধিতা করে ভিন্নমত পোষণ করেন দাওরায়ে হাদিস (মাস্টার্স) ও এরাবিকে মাস্টার্স (রাবি) সম্পন্নকারী মাওলানা মো. সুহাইল আহমেদ। তিনি জানান, ইসলামী খেলাফতের যুগে বেতনে ও মানে ইমামদের সম্মান ছিল সর্বোচ্চ। রাষ্ট্রীয়ভাবে তারা ছিল স্বীকৃত ও নিয়োগকৃত। এখন সবদিক থেকেই তারা বঞ্চিত। ইমাম-মুয়াজ্জিনদের তাদের মৌলিক পাওনা আদায় করতে সোচ্চার হতে হবে। আর্থিক ও মানসিকভাবে স্বাধীন ও নিরাপদ না থাকলে ধর্মীয় এ গুরুদায়িত্ব সঠিক ও নির্ভয়ে পালন করা সম্ভব নয় বলে মত দেন এই ইসলামী বিশেষজ্ঞ।
রাজধানী ও রাজধানীর বাইরের অনেক মসজিদের ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মসজিদ কমিটির মাধ্যমে নিয়োগপ্রাপ্ত ইমাম ও মুয়াজ্জিনরা টানা ২৪ ঘণ্টা মসজিদের খেদমতে নিয়োজিত থাকেন। গ্রামের মসজিদে হাদিয়া দেয়া হয় গড়ে ৫ হাজার থেকে ৮ হাজার টাকা। অন্যদিকে শহরে দেয়া হয় সর্বোচ্চ ১০ থেকে ২০ হাজার টাকা। শহরের ইমাম-মুয়াজ্জিনদের জীবনমান একটু ভালো হলেও পরিবার নিয়ে এই বেতনে জীবন নির্বাহ করা খুব কঠিন বলে জানান গ্রামের ইমাম-মুয়াজ্জিনরা। এমনকি তাদের সব সময় মানসিক চাপের মধ্যে থাকতে হয়। বিষয়টি জানা যায়, রাজধানীর দক্ষিণখান এলাকার চেয়ারম্যান বাড়ি জামে মসজিদের মুয়াজ্জিনের সঙ্গে কথা বলে। তিনি জানান, মসজিদ কমিটিতে রয়েছে অনেক রাজনৈতিক দলের সদস্য। তারা তাদের মতের লোককে সমর্থন করে থাকেন। সব সময় সব এলাকার মসজিদে তাদের মন জুগিয়ে চলতে হয়। মতের বিরুদ্ধে গেলে চাকরি নিয়ে টানাটানি শুরু হয়। চাকরি হারানোর ভয়ে থাকতে হয় সব সময়।

বিষয়টি জানতে বিভিন্ন মসজিদে খোঁজ নিয়ে জানা যায়, অধিকাংশ ইমাম ও মুয়াজ্জিনদের থাকার ব্যবস্থা রয়েছে মসজিদের ভেতরে। তাদের খাবারের ব্যবস্থা হয়ে থাকে মুসল্লিদের বাড়ি থেকে। থাকা আর খাবার ফ্রি হওয়ায় তাদের বেতন কম বলে মসজিদ কমিটির অনেক সদস্য জানান। তারা জানান, ইমাম-মুয়াজ্জিনদের বেতন মসজিদ কমিটিই নির্ধারণ করে। মসজিদ যেহেতু দানের টাকায় চলে তাই বেতন একটু কম।

এসব ভাগ্য বিড়ম্বিত ইমাম-মুয়াজ্জিনদের দুঃখ ঘোচাতে প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় মোট ৫৬০টি মডেল মসজিদ কমপ্লেক্স নির্মাণের ঘোষণা দিয়েছে সরকার। এসব মসজিদে জাতীয় স্কেলে খতিব, ইমাম, মুয়াজ্জিন ও খাদেমদের বেতনের কথা বলা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে দেশের কয়েক লাখ মসজিদকে এই কার্যক্রমের আওতায় আনার উদ্যোগের কথা জানায় ইসলামিক ফাউন্ডেশন। তবে কার্যক্রমটি বাস্তবায়নের দীর্ঘসূত্রতায় হতাশা ব্যক্ত করেছেন লাখ লাখ ইমাম-মুয়াজ্জিন।
সূত্র : মানবজমিন

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত