প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট দেবার আমি কেউই নই

কামরুল হাসান ভুঁইয়া: গায়ের রং ধবধবে ফর্সা, উচ্চতায় খাটো, একহারা গড়নের ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজর ক্লাস নাইনের ছাত্র মুহাম্মদ ইশতিয়াক ( পরবর্তীতে মেজর জেনারেল ও অবসরপ্রাপ্ত ) কলেজ টিমে হকি খেলে। যুদ্ধের আগে কলেজ বন্ধ যায়। ইশতিয়াক যোগ দেয় মানিকগঞ্জের ক্যাপ্টেন আবদুল হালিম চৌধুরীর বাহিনীতে। যতো না বয়স তার ছোট দেখায় ইশতিয়াককে। একটা রাইফেল তাকে দেয়া হয় না ছোট বলে। তাকে কাজ দেযা হয় বার্তাবহনকারীর। ক্যাপ্টেন হালিম তাকে কথা দিয়ছেন অস্ত্র দেবেন। একদিন অস্ত্র পাবে এই আশায় ইশতিয়াক বাতাশের গতিতে ছুটে চলে বার্তা নিয়ে, কখনো লিখিত, কখনো মৌখিক। হরিরামপুর থানার যুদ্ধের পর জেলেদের উদ্ধার করা মৃত পাকিস্তানি সৈনিকের ফুলে ওঠা লাশের সাথে লেপ্টে থাকা ৭.৬২ মি.মি.চীনা এসএমজি-টি দেয়া হয় ইশতিয়াককে, তারই একান্ত অনুরোধে। সে অবশ্য অনেক পরের কথা। খবর আদান প্রদানের প্রক্রিয়ায় বহু মুক্তিযোদ্ধা ও তাদের সহায়তাকারীদের সঙ্গে পরিচয় হয় তার। আমাদের ইশতিয়াক যেনো কবি সুকান্তের সেই রানার।

চন্নুর ভালো নামটি খুব কম লোকেই জানে, দরকারই বা কী। দোহার থানার বাগড়া বাজারে ছোট চা দোকান আছে তার। ইশতিয়াক এ পথে এলে অবশ্যই খানিক জিরিয়ে নেয় এখানে। চুন্নু তাকে যতœ করে খাওয়ায়। চুন্নু চা-বিস্কুট খাওয়ায় সব মুক্তিযোদ্ধাদের। কোনোদিন কারো কাছে পয়সা চায় না। কেউ পয়সা দিলে একটা বিরাট অপরাধীর মতো চেহারা বানায়। ২৫/২৬ বছর বয়স। চন্নু মুক্তিযোদ্ধা না। মুক্তিযোদ্ধরা যে তার ছোট্ট দোকানটায় আসে,তার সাথে আপন ভেবে কথা বলে-এতেই চুন্নু মহাখুশি। চুন্নু আস্থা অর্জন করে সবার। এদিক সেদিক কাউকে খবর দেয়া,জিনিসপত্র পৌঁছে দেয়া-সব চুন্নু করে একান্ত নিষ্ঠা আর পরম আনন্দের সাথে। চন্নুর গর্ব – এ দায়িত্ব তো মুক্তিবাহিনী এতো লোক থাকতে কাউকে দেয় না,শুধু তাকেই দেয়। ক-এর মাথায় বোন্দাও দিতে জানে না চুন্নু। অথচ বিদ্যার কতো জাহাজরা তখন ছাত্র-ছাত্রীবিহীন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। মুক্তিযোদ্ধাদের থাকা-খাওয়া,চিকিৎসা ব্যবস্থা করা,খবরাখবর আদান প্রদান করায় হাজারো চুন্নু তখন দেশজুড়ে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের মূল ভিত।

একদিন অবসরে চা খাওয়ার ফাঁকে চুন্নু ইশতিয়াকের কাছে তার বহুদিনের লালিত সাধ অনুরোধ আকারে উপস্থাপন করে। দেশ স্বাধীন হলে যেনো তাকে সরকরী অফিসের একটা পিয়নের চাকরী দেয়া হয়। ইশতিয়াক নিজেই কিছু না,কোনোদিন কিছু হবে কী না তাও জানে না,জানে না এ দেশ কবে স্বাধীন হবে- সে চুন্নুকে প্রতিশ্রুতি দেবে কী। ইশতিয়াক বুঝলো চুন্নুও স্বপ্ন দেখে।
ছিয়াত্তরের মার্চ। ইশতিয়াক ঝিনাইদহ ক্যাডেট কলেজ ইন্টারমেডিয়েট পরীক্ষা দিয়ে এসেছে। ভিক্টোরিয়া স্পোর্টিং ক্লাবে হকি খেলে। ম্যাচের পর ৫০ টাকা সম্মানী পায়। এ টাকায় ভালো খাওয়া-দাওয়া খেয়ে বাড়ি ফেরা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে ফুলার রোডে চাচার বাসায় থাকে ইশতিয়াক। সেদিন ম্যাচ শেষে খেয়ে-দেয়ে দেড় টাকা ভাড়ায় এক রিকসা ঠিক

করলো সে বাসায় ফেরার জন্য। ফিরতে ফিরতে রাত গেলো। রিকসা নেমে রিকসাওয়ালাকে দেড় টাকা বাড়িয়ে দিলো। অবাক কান্ড। রিকসাওয়ালা বলে তার ভাড়া লাগবে না। অথচ ইশতিয়াক ভাড়া ঠিক করেই উঠেছে। জিজ্ঞাসা করলো,’ভাড়া নিবেন না কেন’?
‘আপনে আমারে চিনছেন’?
‘না তো’

গাড়ি বারান্দায় লাইটের নিচে দাঁড়িয়ে এবার সে গালে হাসি টেনে বললো,’আমি চুন্নু’।
দু’জনে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে আছে। দু’জনেরই চোখ দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ছে অথচ তারা পরষ্পরের চোখের পানি দেখতে পারছে না।
ইশতিয়াক এখন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে ব্রিগেডিয়ার জেনারেল,কমান্ড করছে সাভার সেনানিবাসে ইনফ্যান্ট্রি ব্রিগেড। তার অফিসে কথায় কথায় সব কাহিনী বলে ইশতিয়াক। বলা শেষ হতেই দেখি তার চোখে টলমল পানি। বললো,স্যার,একটু ওয়াশ রুম আসি’? ইউনিফর্ম পরা ব্রিগেড কমান্ডারের চোখে জল বড় বেমানান। এ অশ্রু লুকাতে হবে। বললাম,’যাও’।
আলাউদ্দিন,ওসমান,চুন্নু,ইব্রাহিমের আজ খোঁজ নেই। ওদের আর থাকা না থাকা। হযরত আলী,বীর প্রতীক গজারিয়া আমার অফিসে এসেছিল মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট নিতে। ও জানে না মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেট দেবার আমি কেউই নই। তার নাকি কোথায় নাম ওঠেনি জানাতে।
ব্রিজের পিয়ারগুলো এভাবে ভেঙে পড়তে থাকলে ব্রিজের ভর বইবে কে?
পরিচিতি: চেয়ারম্যান, সেন্টার ফর বাংলাদেশ লিবারেশন ওয়ার স্টাডিজ/সম্পাদনা: মোহাম্মদ আবদুল অদুদ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ