প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

আ. লীগে হেভিওয়েট, বিএনপিতে ‘গুবলেট’

ডেস্ক রিপোর্ট : চট্টগ্রামের প্রবেশদ্বার পাহাড় আর সাগরঘেরা জনপদ মিরসরাই। ১৬টি ইউনিয়ন ও দুটি পৌরসভা নিয়ে গঠিত চট্টগ্রাম-১ (মিরসরাই) আসন। জনসমর্থনের দিক দিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি এখানে সেয়ানে-সেয়ান। তবে প্রতিটি নির্বাচনে এ আসনে অল্প ভোটের ব্যবধানে জয়-পরাজয় নির্ধারণ হয়। যে দল নির্বাচনী মাঠে শক্তি-সামর্থ্য আর কৌশলের রসায়ন ঘটাতে পারবে জয় তাদের সুনিশ্চিত।

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে রেখে এ আসনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির একাধিক প্রার্থী মাঠে নিজের পক্ষে প্রচারণা চালাচ্ছেন। আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট প্রার্থী সরকারের গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন দল থেকে এবারও মনোনয়ন পাবেন, সংগঠনটির স্থানীয় নেতাদের এমনটাই বিশ্বাস। বিএনপিকে আগামী নির্বাচনে নিজেদের হারানো আসন পুনরুদ্ধার করতে হলে সাংগঠনিক ও জনপ্রিয় প্রার্থীকেই মনোনয়ন দিতে হবে—এমনটাই মনে করছে দলটির তৃণমূল পর্যায়ের নেতাকর্মীরা। তবে এ আসনে আওয়ামী লীগের হেভিওয়েট প্রার্থী থাকায় তাঁর মনোনয়ন পাওয়াটা সহজ হলেও বিএনপির সবাই সমমানের নেতা হওয়ায় তাঁদের মনোনয়নের ব্যাপারটি অনেকটাই তালগোল পাকানো (গুবলেট)।

প্রসঙ্গত, ২০০৮ সালে অনুষ্ঠিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এ আসনে আওয়ামী লীগের ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এক লাখ পাঁচ হাজার ৩৩৯ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হন। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন বিএনপির অধ্যাপক এম ডি এম কামাল উদ্দিন চৌধুরী। তিনি পেয়েছিলেন ৯৪ হাজার ৬৬৫ ভোট। ২০১৪ সালের দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। আগামী নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিলে এ আসনে ফের লড়াই হবে দুই দলের মধ্যেই। তবে এ আসনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির ভোটের ব্যবধান খুব অল্প। ১৯৯০ সালে এ আসনে বিএনপির ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে জয়ী হন এম এ জিন্নাহ্। ১৯৯৬ সালে চট্টগ্রামের এ আসন থেকে জয়ী হন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। পরবর্তী সময়ে তিনি আসনটি ছেড়ে দিলে উপনির্বাচনে জয়ী হন আওয়ামী লীগ প্রার্থী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন। ২০০১ সালের নির্বাচনে জয়লাভ করেন বিএনপি প্রার্থী এম এ জিন্নাহ্। এসব নির্বাচনে জয়-পরাজয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি প্রার্থীর মধ্যে ভোটের ব্যবধান ছিল পাঁচ হাজার থেকে ১০ হাজারের মধ্যে।

আওয়ামী লীগ : এ আসনে জয়ের ধারা অব্যাহত রাখতে আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে বাস্তবায়ন হওয়া ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরার লক্ষ্যে বিভিন্ন সাংগঠনিক কর্মসূচি বাস্তবায়ন করছে। ধারণা করা হচ্ছে আগামী নির্বাচনে প্রাচীন এ দলটির মূল প্রচারণার রশদ হবে ‘উন্নয়ন’। তবে এ আসনে আওয়ামী লীগের প্রধান ও অন্যতম প্রতিদ্বন্দ্বী দল বিএনপি এখনো দলীয় কোন্দল নিরসন করতে না পারায় আগামী নির্বাচনে ভোটের মাঠে আওয়ামী লীগ বাড়তি সুবিধা পাবে।

চট্টগ্রামের গুরুত্বপূর্ণ এ আসনে আওয়ামী লীগের উপজেলা কমিটি নিজেদের একমাত্র প্রার্থী হিসেবে বর্তমান সংসদ সদস্য গৃহায়ণ ও গণপূর্তমন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেনের নাম প্রচার করছে। পাশাপাশি যেকোনো উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বিকল্প হিসেবে তাঁর মেজ ছেলে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ, চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক সম্পাদক মাহবুব রহমান রুহেলকে প্রস্তুত রাখা হয়েছে। তবে দলের উপজেলা পর্যায়ে মূল স্রোতের বাইরে থেকে আবারও এ আসনে দল থেকে মনোনয়ন চাইবেন মিরসরাই উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান ও চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মো. গিয়াস উদ্দিন। এ ছাড়া ইদানীং চট্টগ্রাম জুনিয়র চেম্বারের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি নিয়াজ মোর্শেদ এলিটের নাম দেশের বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশ পাওয়ায় আলোচিত হচ্ছে।

গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার মোশাররফ হোসেন এমপি আগামী নির্বাচনে নিজের প্রার্থিতা নিয়ে বলেন, ‘এটি দলের সভাপতি জননেত্রী শেখ হাসিনা ঠিক করবেন। দল আমাকে মনোনয়ন দিলে আমি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করব, অন্য কাউকে দিলে তাঁর পক্ষে কাজ করব।’

বর্তমান সরকারের সময়ে মিরসরাইয়ের অভূতপূর্ব উন্নয়ন কর্মকাণ্ড তুলে ধরে মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘আমরা গত ১০ বছর টানা ক্ষমতায় থেকে মিরসরাইয়ে ব্যাপক উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন করেছি। এখানে প্রতিষ্ঠা পেতে যাচ্ছে দেশের সর্ববৃহৎ অর্থনৈতিক অঞ্চল। যাতে কর্মসংস্থান হবে কমপক্ষে ৩০ লাখ লোকের। এ ছাড়া এলাকার রাস্তা-ঘাট, পুল-কালভার্ট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ফায়ার সার্ভিস স্টেশনসহ শত শত কোটি টাকার উন্নয়ন কর্মকাণ্ড বাস্তবায়ন হয়েছে, যা স্বাধীনতার পরবর্তী ৩৫ বছরেও হয়নি। আগামী নির্বাচনে বিএনপি আওয়ামী লীগের উন্নয়নের জোয়ারে ভেসে যাবে। এ আসনে আওয়ামী লীগ প্রার্থীর জয় নিশ্চিত।’

নির্বাচন নিয়ে দলের প্রস্তুতি সম্পর্কে মোশাররফ হোসেন বলেন, ‘আমরা দুই বছর আগে থেকে সাংগঠনিক প্রস্তুতি শুরু করেছি। প্রতিটি ইউনিয়ন ও পৌর এলাকায় জনসভা, দলের প্রতিনিধিসভা এবং ইউনিয়ন পরিষদে সরকারের উপকারভোগীদের নিয়ে সমাবেশ করেছি। বর্তমানে পাড়া বৈঠক কর্মসূচি চালু করেছি।’

এদিকে আওয়ামী লীগের আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী মিরসরাই উপজেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান, চট্টগ্রাম উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি মো. গিয়াস উদ্দিন এলাকায় নিজের সমর্থিত নেতাকর্মীদের নিয়ে বিভিন্ন সামাজিক আচার-অনুষ্ঠানে যোগ দিচ্ছেন। তিনি আশাবাদী আগামী নির্বাচনে দল তাঁকেই মনোনয়ন দেবে।

গিয়াস উদ্দিন বলেন, ‘আমি দল থেকে মনোনয়ন চাইব। জননেত্রী শেখ হাসিনা আমার রাজনৈতিক অবস্থান ও জনসম্পৃক্ততা বিবেচনা করে নিশ্চয়ই আমাকে মনোনয়ন দেবেন। অন্য যে কাউকে দিলে আমি অবশ্যই দলের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করব।’

আওয়ামী লীগ থেকে আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী চট্টগ্রাম জুনিয়র চেম্বারের প্রতিষ্ঠাতা নিয়াজ মোর্শেদ এলিট। বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে তাঁর নাম উঠে আসার পর বিষয়টি আলোচিত হয়। এলাকায় তিনি বেশ কয়েকটি সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে যুক্ত। যদিও মিরসরাই উপজেলা আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে তাঁর কোনো যোগাযোগ নেই। তবে এলিট আশাবাদী বর্তমান সময়ে তরুণদের যে জোয়ার, সময়ের পরিপ্রেক্ষিতে দল তাঁকেই মনোনয়ন দেবে।

মনোনয়ন চাওয়ার ব্যাপারে এলিট বলেন, ‘আমি দীর্ঘদিন ধরে এলাকার বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত। মানুষের জন্য কাজ করাই আমার লক্ষ্য। বড় পরিসরে কাজ করতে আমি আমার দলের কাছে মনোনয়ন চাইব।’

বিএনপি : বিএনপি থেকে মনোনয়ন চাইবেন দলটির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য, ক্লিপ্টন গ্রুপের চেয়ারম্যান শিল্পপতি অধ্যাপক কামাল উদ্দিন চৌধুরী। তবে উপজেলা বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ নেতাদের সঙ্গে তাঁর দ্বন্দ্ব থাকায় দলের অভ্যন্তরে তাঁকে নিয়ে আলোচনা কম। তবে দলের মনোনয়ন পেতে জোর লবিং এবং নেতাকর্মীদের মন পেতে এলাকায় ব্যাপক সক্রিয় রয়েছেন উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক নুরুল আমিন। এ ছাড়া মনোনয়ন চাইবেন বড়তাকিয়া গ্রুপের চেয়ারম্যান ও বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী মুক্তিযোদ্ধা দলের সহসভাপতি মনিরুল ইসলাম ইউসুপ এবং উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক শাহীদুল ইসলাম চৌধুরী। এ ছাড়া মিরসরাই উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান (সাময়িক বহিষ্কৃত) নুরুল আমিনও মনোনয়ন চাইবেন বলে প্রচার রয়েছে।

এদিকে বিএনপির কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য অধ্যাপক কামাল উদ্দিন চৌধুরী ২০০৮ সালে নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে মিরসরাই আসন থেকে দলের মনোনয়ন নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করলেও এবারের নির্বাচন নিয়ে মাঠে তাঁর উপস্থিতি নেই বললেই চলে। গতকাল শনিবার বক্তব্য পেতে এ বিএনপি নেতার মোবাইল ফোনে একাধিকবার চেষ্টা করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী চট্টগ্রাম উত্তর জেলা বিএনপির সাবেক সিনিয়র যুগ্ম সম্পাদক ও মিরসরাই উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক নুরুল আমিন বলেন, ‘কলেজ থেকে শুরু করে উপজেলা ছাত্রদল, জেলা ছাত্রদল, উপজেলা বিএনপি ও জেলা বিএনপির গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন থেকে দীর্ঘকাল জাতীয়তাবাদী দলের রাজনীতি করেছি। এতকাল অনেককে এমপি-উপজেলা চেয়ারম্যান নির্বাচিত করতে সহায়তা করেছি। সবাই দলের সঙ্গে বেইমানি করে সংকটকালীন মুহূর্তে দূরে সরে গেছে। এবার দলের স্বার্থে দলের নেতাকর্মীদের স্বার্থে নিজেই মনোনয়ন চাইব। দল যদি অন্য কাউকে মনোনয়ন দেয় সে ক্ষেত্রে আমি দল মনোনীত প্রার্থীর পক্ষে কাজ করব।’

আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী মনিরুল ইসলাম ইউসুপ বলেন, ‘দল করি দলের কাছে মনোনয়ন চাইব। দলের কর্মীরা আমাকে ভালোবাসে, ইনশাআল্লাহ আমি মনোনয়ন পাব। দল যদি আমাকে মনোনয়ন না দেয় সে ক্ষেত্রে দলের সিদ্ধান্ত মেনে নেব।’

মনোনয়নপ্রত্যাশীদের আরেকজন উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক শাহীদুল ইসলাম চৌধুরী দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় রাজনৈতিক কর্মসূচির পাশাপাশি সামাজিক বিভিন্ন কর্মকাণ্ডের সঙ্গে যুক্ত আছেন। তিনি বলেন, ‘উপজেলা ছাত্রদল, যুবদল, জাসাস ও বিএনপি সর্বোপরি জাতীয়তাবাদী দলের রাজনীতির সঙ্গে দীর্ঘদিন নিবীড়ভাবে যুক্ত রয়েছি। দলের দুঃসময়ে মাঠের কর্মীদের বুকে আগলে ধরে রেখেছি। আমার বিশ্বাস দল আমাকেই মনোনয়ন দেবে।’-কালের কণ্ঠ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত