প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

একুশে পদকের টাকায় ক্যান্সার চিকিৎসা সুজয় শ্যামের!

ডেস্ক রিপোর্ট:  একাত্তরে রণাঙ্গণের মুক্তিযোদ্ধাদের যে গানগুলো অনুপ্রেরণা জুগিয়েছিল, সেগুলোরই একজন সুরকার ও সংগীত পরিচালক স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের সুজেয় শ্যাম। সম্প্রতি ভারতের একটি হাসপাতালে পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর দেশে ফিরে তিনি জানতে পারেন, শরীরে বাসা বেঁধেছে দুরারোগ্য রোগ প্রোস্টেট ক্যানসার। কিন্তু এই রোগের চিকিৎসার জন্য নেই প্রয়োজনীয় অর্থ। তাই গত বছর পাওয়া রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মাননা একুশে পদকের টাকাতেই শুরু করেন চিকিৎসা।

২০ জুলাই, শুক্রবার রাতে প্রিয়.কমের সঙ্গে আলাপকালে এসব তথ্য জানান একাত্তরের অনেক আলোড়ন সৃষ্টিকারী গানের এই সুরকার।

মিরপুর ১২ নম্বর সেকশনের বাসা থেকে সুজেয় শ্যাম বলেন, ‘একুশে পদকের সঙ্গে আমি দুই লাখ টাকাও পেয়েছিলাম। আর আমার আগের কিছু জমানো টাকা ছিল। সেটা দিয়েই চিকিৎসা চলছে। এরপর কী হবে, জানি না। আমার কিচ্ছু হবে না। কারণ সাধারণ মানুষ আমাকে ভীষণ ভালোবাসে। স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর আমি মুক্তিযুদ্ধ যে করেছি, তার সনদ পেয়েছি।

কিন্তু আমি গভর্নমেন্ট থেকে কোনো ভাতা পাইনি। আমার চোখের অবস্থাও খুব খারাপ। তিন মাস পরপর কলকাতায় গিয়ে একটি করে ইনজেকশন দিয়ে আসতে হয়। প্রতিটা ইনজেকশনের দাম ২৬ হাজার টাকা। আমার যা সঞ্চয় ছিল, সেখান থেকেই খরচ করছি। বেশ কয়েক লক্ষ টাকা খরচ হয়েছে। ৪ আগস্ট আবার বেঙ্গালুরে যাচ্ছি।’

৭৩ বছর বয়সী একুশে পদকপ্রাপ্ত বরেণ্য এ সংগীত পরিচালক জানান, শারীরিক পরীক্ষার জন্য সপ্তাহতিনেক আগে ভারতের বেঙ্গালুরু যান তিনি। প্রয়োজনীয় কিছু পরীক্ষা শেষে সেখানে চিকিৎসকরা তার দেহে ক্যান্সারের আশঙ্কা করেন। এ ব্যাপারে আরও নিশ্চিত হওয়ার জন্য তাকে এমআরআই করার পরামর্শ দেওয়া হয়। কিন্তু তখন তার হাতে প্রয়োজনীয় অর্থ অবশিষ্ট না থাকায় চিকিৎসা অসম্পূর্ণ রেখেই দেশে ফিরে আসেন। দেশে ফেরার কিছুদিন পর তিনি অসুস্থ হয়ে যান। এরপর ঢাকার একটি ডায়াগনস্টিক সেন্টার থেকে এমআরআই পরীক্ষা করালে প্রোস্টেট ক্যান্সার ধরা পড়ে।

সুজয় শ্যাম আরও জানান, রবিবার মেডিকেল ভিসার জন্য আবেদন করবেন তিনি।

‘পেয়ে গেলেই আবার (ভারত) চলে যাব। ডক্টর তখনই বলছিলেন টেস্টা করে যাও। কিন্তু আমার কাছে টাকা ছিল না’, বলেন সুজেয় শ্যাম।

এই শিল্পী জানান, ভারতে যাওয়ার পর বায়োপসি (কোষের বিশেষ পরীক্ষা) করার মাধ্যমে নিশ্চিত হওয়া যাবে ক্যান্সারের কোন ধাপে আছেন তিনি।

গুণী এ মানুষটির রয়েছে অনেকটা আক্ষেপ। সে কথাও জানালেন আলাপকালে। তিনি বলেন, ‘আমি জানি না আমাদের প্রিয় প্রধানমন্ত্রী আমার এ খরব শুনেছেন কি না। কারণ এখনো প্রধানমন্ত্রীর কিংবা সরকারের তরফ থেকে কেউ আমার কোনো খোঁজ নেয়নি।’

২০১৪ সালে স্বাধীনতা দিবসে শুদ্ধ সুরে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সম্মুখে। এর সংগীতায়োজনও করেছিলেন সুজেয় শ্যাম।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শিল্পী হিসেবে স্বাধীনতার ৪৫ বছর পর মুক্তিযোদ্ধার সনদ পেয়েছেন সুজেয়। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে কোনো ভাতা পান না এই শিল্পী। স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের শেষ গান এবং পাকিস্তানের হানাদার বাহিনীর আত্মসমর্পণের পর প্রথম গানের সুর করেছেন তিনি।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রে থাকাকালে মোট নয়টি গানে সুর করেছিলেন সুজেয় শ্যাম, যেগুলো একাত্তরের জুন থেকে ডিসেম্বর পর্যন্ত গাওয়া হয়েছিল। এর মধ্যে রয়েছে ‘মুক্তির একই পথ সংগ্রাম’, ‘ওরে শোনরে তোরা শোন’, ‘রক্ত চাই রক্ত চাই’, ‘আজ রণ সাজে বাজিয়ে বিষাণ’। এ ছাড়া ছিল ‘বিশ্বপ্রিয়’র লেখা ‘আহা ধন্য আমার’, কবি দিলওয়ারের লেখা ‘আয়রে চাষি মজুর কুলি’। এর মধ্যে ‘রক্ত দিয়ে নাম লিখেছি’ এবং ‘বিজয় নিশান উড়ছে ওই’ গান দুটি যেকোনো জাতীয় দিবসের অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে আছে।

সুজেয় শ্যাম ১৯৪৬ সালের ১৪ মার্চ সিলেটে জন্মগ্রহণ করেন। দশ ভাইবোনের মধ্যে তিনি ষষ্ঠ। মা-বাবাও ছিলেন নজরুলসংগীত শিল্পী। ছোট বোন, ভাইও বেতারে গাইতেন।

সুজেয় শ্যাম গিটার বাদক ও শিশুতোষ গানের পরিচালক হিসেবে ১৯৬৪ সালে তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের চট্টগ্রাম বেতারে যোগ দেন। পরে বড়দের অনুষ্ঠান পরিচালনা শুরু করলেও ১৯৬৮ সালে ঢাকা বেতারে চলে আসেন। কাজ করেছেন বাংলাদেশ বেতারে। ২০০১ সালে বাংলাদেশ বেতার থেকে প্রধান সংগীত প্রযোজক হিসেবে অবসরে যান।

সুজয় কাজ করেছেন চলচ্চিত্রে সংগীত পরিচালক হিসেবেও। ‘হাছন রাজা’ চলচ্চিত্রে সংগীত পরচালনা তাকে এনে দেয় প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার।

এই চলচ্চিত্রের একটি গানেও কণ্ঠ দিয়েছেন সুজেয়। পরবর্তী সময়ে ‘জয়যাত্রা’ ও ‘অবুঝ বউ’ চলচ্চিত্রের সংগীত পরিচালনা করে ২০০৪ ও ২০১০ সালে জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার পান তিনি।

স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের এই শিল্পী সংগীতে শিল্পকলা পদক পান ২০১৫ সালে। একই বছর পান স্বাধীনতা সম্মাননা ও ভারত গৌরব সম্মাননা। ২০১৮ সালে তিনি একুশে পদক পেয়েছেন। প্রিয় ডট কম।

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ