প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

জিপিএ ৫ পাওয়া সন্তানের অভিভাবকের কাছে অভাজনের খোলা চিঠি

মেজর ডা. খোশরোজ সামাদ  

প্রিয় অভিভাবক, সালাম।

১। সদ্য প্রকাশিত এইচ এস সি পরীক্ষায় আপনার সন্তান জিপিএ ৫ পেয়েছে । দীর্ঘ দুই বছর নিরলস শ্রমসাধনা , মেধার সন্মিলনে এই সাফল্য নিঃসন্দেহে অনেক বড় অর্জন । আমি গভীর আনন্দে আমাদের সন্তানদের অভিনন্দন জানাই । প্রিয় অভিভাবক ,আপনারা যারা সন্তানকে এই পর্যায়ে আনতে সঠিক পথ দেখিয়েছেন, অনুপ্রাণিত করেছেন তাঁদেরকেও জানাই মোবারকবাদ । জানি, কত বিনিদ্র রজনী কেটেছে । সমুদ্র সমান শারীরিক -মানসিক কষ্ট করেছেন, নিজে খেয়ে না খেয়ে সন্তানকে ভালমন্দ খাইয়েছেন, নিজেদেরকে অনেক সুখসুবিধা থেকে বঞ্চিত করে শিক্ষার বিপুল ব্যয়ভার সাধ্য অনুযায়ী বহন করেছেন । সৃষ্টিকর্তার কাছে হাত তুলে গোপনে অশ্রুপাত করেছেন।

২। সামনের অল্প কদিন পরেই শুরু হবে ভর্তি পরীক্ষা । তীব্র প্রতিযোগিতামূলক এই পরীক্ষার মাধ্যমে কোমলমতি আমাদের সন্তানেরা ঠাই করে নিবে মেডিকেল /ইঞ্জিনিয়ারিং /বিশ্ববিদ্যালয়সহ অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে । সেই নির্বাচনী পরীক্ষার অন্যতম সহায়ক হাতিয়ার হিসেবে এই ভাল রেজাল্টটি অবশ্যই কাজে দিবে। পাশাপাশি তাদের আরো বেশী আত্মপ্রত্যয়ী করবে ।

৩। সবাস্থ্যই সকল সুখের মূল । তাই ভর্তি পরীক্ষার  আগ পর্যন্ত তাদের স্বাস্থ্য ঠিক রাখা বিশেষ দরকার । যেটুকু ভার তারা বহন করতে পারে তার চেয়ে বেশী দিলে শারীরিক বা মানসিক স্বাস্থ্যহানির বিরাট আশঙ্কা থাকে । আমাদের সন্তান কতটুকু ভার বহন করতে পারে অভিভাবক হিসেবে আমরাই সবচেয়ে ভাল জানি । তাই অন্য কারো সাথে অসম প্রতিযোগিতায় সন্তান কে না নামিয়ে ‘সুষম ‘ ভার দেয়াটাই দূরদর্শিতার পরিচয় হবে ।

৪। মেধা সবার সমান থাকে না । তাই ‘অমুকের সন্তান পেরেছে ,তুই পারবি না কেন ‘ এই চাপাচাপি হতে বিপরীত দিতে  হতে পারে । মনে রাখতে হবে ,উচ্চ শিক্ষায় সিট সংখ্যা সামান্য । তাই ,ব্যপক সংখ্যক জিপিএ ৫ পাওয়া ছাত্র -ছাত্রীর মাঝে অল্প সংখ্যকই প্রত্যাশিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তি হতে পারবে । অর্থাৎ অধিকাংশরাই পারবে না । তাই ভর্তি পরীক্ষায় প্রত্যাশিত সাফল্য না আসলে ‘জীবনের সকল সপ্নের মৃত্যু ‘ এই ভয়াল উপলব্ধি যেন তাদের মনে কখনই না ঢুকে যায় । প্রত্যাশিত সাফল্য না পেয়ে অভিভাবকের তিরস্কারে সন্তানের আত্মহননের হৃদয় বিদারক গল্প আমাদের অনেকেরই জানা ।

৫। মেধা ও পছন্দের বিষয় ভিন্নমুখী । কেউ সাহিত্য পছন্দ করে , কেউ ছবি আঁকতে , কেউ বা অন্য কোন বিষয় । অপছন্দনীয় বিষয় জোর করে পড়ালে ভবিষ্যতে আরো দুর্ঘটনা ঘটবার আশংকা থেকেই যায় । অনিচ্ছুক হয়ে অভিভাবকের চাপে মেডিকেল বা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়তে যেয়ে মাঝ পথে ড্রপ আউটের সংখ্যা অনেক আগেই আশংকাজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।

৬। সম্প্রতি ‘ প্রাইভেট ‘ শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পড়ানোর প্রবণতা বেড়েছে । সরকারী প্রতিষ্ঠানে সীমিত সংখ্যক সিট এর জন্য দায়ী । এই প্রাইভেট শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে রয়েছে অনেক প্রশ্ন । তাই প্রয়োজনীয় তথ্য -উপাত্ত সংগ্রহ করেই সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত ।

৭। বিদেশে পড়াশুনার কথাও বিবেচনা আনা হয় । সেখানেই ভুঁই ফোঁড় অনেক প্রতিষ্ঠান আছে , মোটা টাকা খরচের ধাক্কা । সেটি সামাল দেয়ার ক্ষমতা বিবেচনায় নিয়েই সিদ্ধান্ত নেয়া উচিত । আ-ার গ্রাজুয়েট স্তরে সদ্য কৈশোর পেরুনো বয়সে ভিনদেশী সভ্যতার খোলামেলা পরিবেশে কেউ যেন পথভ্রষ্ট না হয় সেটিও প্রজ্ঞার সাথে যাচাই -বাছাই করা প্রয়োজন ।

৮।সর্বোপরি ,চিত্তের সাথে ঐশ্বর্যের সমন্বয় ঘটুক । পাঠ গ্রহণ কুইনিন গেলার মত তেতো না হয়ে হোক ভালোবাসার বিষয় । যুক্তি ও নীতিবোধে সিক্ত হোক হৃদয় কুসুম । সুশিক্ষিত মাত্রই স্বশিক্ষিত । তাই আমরা পথ দেখিয়ে দিতে পারি মাত্র । গন্তব্যে তাদেরই পৌঁছুতে হবে । মনন হোক আলোকিত ,অনুপ্রাণিত হোক উন্নত নৈতিক চরিত্রের দীপশিখায় । শুধু টেনে নেয়া জীবনই নয় ,সৃষ্টিশীল ,আনন্দিত ,সমাজ -দেশের প্রতি দায়বদ্ধ হোক তাদের জীবন । ‘আমাদের সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে ।

‘ ইতি, মেজর ডা. খোশরোজ সামাদ

লেখক: উপ অধিনায়ক,আর্মড ফোর্সেস ফুড এন্ড ড্রাগস ল্যাবরেটরী ও সন্তানের এক অভিভাবক /সম্পাদনা: মোহাম্মদ আবদুল অদুদ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ