প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

তিন সিটিতে তিন রূপে জামায়াত

ডেস্ক রিপোর্ট : সিলেট নগরের ইলেকট্রিক সাপ্লাই এলাকায় নূরে আলা কমিউনিটি সেন্টারেই জামায়াতের মেয়র পদপ্রার্থীর বিশাল নির্বাচনী কার্যালয়। নিবন্ধন না থাকায় নাগরিক ফোরামের ব্যানারে প্রচার চালাচ্ছেন মেয়র পদপ্রার্থী নগর জামায়াতের আমির এহসানুল মাহবুব জুবায়ের। তাঁর প্রধান নির্বাচনী কার্যালয়টিতে নেতাকর্মীর ভিড়। বিভিন্ন তথ্য সরবরাহের জন্য রয়েছে অনেক সুশৃঙ্খল ডেস্ক।

সিলেট নগরের বিভিন্ন ওয়ার্ড ও উপজেলা থেকে নেতাকর্মীরা আসছে। লিফলেট, পোস্টারসহ বিভিন্ন উপকরণ নিয়ে যাচ্ছে বিভিন্ন ওয়ার্ডে। সব মিলিয়ে উৎসবমুখর পরিবেশে চলছে তাদের নির্বাচনী কার্যক্রম।

গতকাল শুক্রবার দুপুরে জুবায়েরের প্রধান নির্বাচনী কার্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, নেতাকর্মীদের মধ্যে কোনো উদ্বেগ। নির্বিঘ্নেই তারা আসছে, যাচ্ছে। বিভিন্ন এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, নির্বাচনী প্রচারকাজে ওয়ার্ডগুলো চষে বেড়াচ্ছে তারা দল বেঁধে। সকাল থেকে রাত পর্যন্ত সিলেটের পাড়া-মহল্লার অলিগলিতে চলছে তাদের বিরামহীন প্রচার। পোস্টার-ফেস্টুনে ছেয়ে ফেলা হয়েছে প্রতিটি অলিগলি। দলের স্থানীয় নেতাকর্মীদের পাশাপাশি বিভিন্ন জেলা-উপজেলার নেতাকর্মীরা এসে প্রচারে অংশ নিচ্ছে। অথচ কিছুদিন আগেও এমন চিত্র সিলেট নগরে কল্পনা করা যেত না। সারা দেশের মতো সিলেটেও মামলায় জর্জরিত জামায়াত-শিবিরের নেতাকর্মীরা গ্রেপ্তারের ভয়ে ছিল গাঢাকা দিয়ে। সভা-সমাবেশ দূরের কথা, রাস্তায় মিছিল করার অবস্থা ছিল না তাদের। ওই নেতাকর্মীরাই এখন প্রকাশ্যে প্রচারের মাঠে নেমেছে সিলেট সিটি করপোরেশন নির্বাচন ঘিরে। মামলায় জর্জরিত নেতাকর্মীরা বীরদর্পে ঘুরে বেড়াচ্ছে পাড়া-মহল্লায়। সব দেখে বিএনপির এক নেতা বলেন, ‘হঠাৎ কোন পরশ পাথরের ছোঁয়ায় যেন বদলে গেছে দৃশ্যপট।’ এ বিষয়ে জানতে চাইলে জামায়াতের কয়েকজন নেতা বলেন, নির্বাচনী পরিবেশ দেখে তাঁরা সন্তুষ্ট। নির্বিঘ্নে তাঁরা নগরীতে তাঁদের প্রার্থীর পক্ষে কাজ করতে পারছেন। এখন পর্যন্ত তাঁদের কাউকে হয়রানি করেনি পুলিশ।

নূরে আলা কমিউনিটি সেন্টারে তথ্যপ্রধানের দায়িত্বে থাকা জামায়াত নেতা নিজাম উদ্দিন সিদ্দিকী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নির্বাচনের পরিবেশ নিয়ে এখন পর্যন্ত আমরা খুবই সন্তুষ্ট। এখন পর্যন্ত যে পরিবেশ তা যেন বজায় রাখা হয় সে জন্য নির্বাচন কমিশনকে আমরা অনুরোধ করেছি।’ নির্বাচন থেকে তাঁদের সরে যাওয়ার কোনো আশঙ্কা নেই জানিয়ে তিনি বলেন, ‘এর আগে সিটি করপোরেশনে আমরা সরাসরি প্রতিদ্বন্দ্বিতা করিনি। সে কারণে ভোট কতটা আছে বলতে পারব না। তবে আমাদের বিশ্বাস, আমরা ৩০ হাজারের বেশি ভোট পাব।’

জামায়াত নেতাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, মেয়র পদপ্রার্থী ছাড়াও সিটির ২৭টি ওয়ার্ডের মধ্যে ১৩টিতে তাঁদের প্রার্থী রয়েছে। ৯টি সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর পদের মধ্যে তাঁদের প্রার্থী আছে দুটিতে। প্রার্থীদের প্রচারের জন্য ওয়ার্ড ও পাড়া-মহল্লাভিত্তিক আলাদা কমিটি দেওয়া হয়েছে। তারা বাসায় বাসায় গিয়ে প্রার্থী সম্পর্কে তুলে ধরে ভোট চাইছে। জামায়াতের কেন্দ্রীয় নেতা এবং দলের বিভিন্ন এলাকার জনপ্রতিনিধিরাও স্থানীয় প্রার্থীর সঙ্গে থেকে গণসংযোগে অংশ নিচ্ছেন। সিলেট-৫ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য ফরিদ উদ্দিন চৌধুুরীর নেতৃত্বে জৈন্তাপুর উপজেলা চেয়ারম্যান সাইফুল্লাহ আল হোসাইনসহ জামায়াতের অন্তত ১৫ জন সাবেক ও বর্তমান জনপ্রতিনিধি নগরের জিন্দাবাজার ও আশপাশের এলাকায় জনসংযোগ করেছেন।

মেয়র পদে জামায়াতের প্রার্থী এহসানুল মাহবুব জুবায়েরের হলফনামায় দেওয়া তথ্য অনুযায়ী তাঁর বিরুদ্ধে ৩৪টি মামলা রয়েছে। আরো ৯টি মামলায় তিনি খালাস পেয়েছেন। জামায়াত নেতারা জানান, শুধু জুবায়েরই নন, সিলেটের পাঁচ শতাধিক নেতাকর্মীর বিরুদ্ধে মামলা আছে। ওই সব মামলায় অনেকেই জামিনে আছে। সব কটি মামলার বাদী পুলিশ। পুলিশের গ্রেপ্তারের ভয়ে পালিয়ে ছিল তারা। সেই নেতাকর্মীরাই এখন নির্বিঘ্নে প্রশাসনের সামনে নির্বাচনী প্রচারে অংশ নিচ্ছে। জামায়াত নেতা নিজাম উদ্দিন বলেন, ‘কতজনের বিরুদ্ধে মামলা—এই প্রশ্ন না করে বলেন কতজনের বিরুদ্ধে মামলা হয়নি? আমরা প্রায় সবাই কমবেশি মামলায় জর্জরিত। আমার নিজের বিরুদ্ধে ১৯টি মামলা রয়েছে, সাতটি মামলায় খালাস পেয়েছি। আমাদের বিরুদ্ধে করা বেশির ভাগই পুলিশ এসল্ট মামলা হয়েছে।’ তবে মামলা থাকলেও আপাতত তাদের কোনো ধরনের হয়রানি করছে না প্রশাসন। এ বিষয়ে তিনি বলেন, ‘প্রশাসন এখন পর্যন্ত দৃশ্যত কোনো সমস্যা করেনি। ভয়-ভীতি দেখানোর সুযোগ নেই নির্বাচনে।’ তিনি বলেন, ‘নেতাকর্মীদের বাসা-বাড়িতে গিয়ে হয়রানি করেছে পুলিশ, এ রকম কোনো অভিযোগ এখনো আমরা পাইনি।’

অথচ এ রকম হয়রানির অভিযোগ বিএনপির পক্ষ থেকে বারবার করা হচ্ছে। জামায়াতের ক্ষেত্রে প্রশাসনের নির্লিপ্ত ভূমিকায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন সিলেটের প্রগতিশীল রাজনৈতিক দলসহ সুধীসমাজের প্রতিনিধিরা।

এ প্রসঙ্গে বাসদ-সিপিবি মনোনীত মেয়র পদপ্রার্থী আবু জাফর ক্ষুব্ধ কণ্ঠে বলেন, ‘যারা মুক্তিযুদ্ধের কথা বলে, মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষের দাবিদার তারা ভোটের বৈতরণী পার হওয়ার জন্য একাত্তরের চিহ্নিত পরাজিত শক্তিকে ভোটের ময়দানে এনে তাদের সংগঠিত করার সুযোগ করে দিয়েছে। এটা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী মানুষ ভালো চোখে দেখছে না।’ তিনি বলেন, ‘জনগণের কাছে তাদের গ্রহণযোগ্যতা না থাকলেও তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর সেই সুযোগটা করে দিল ক্ষমতাসীনরা। জামায়াত দুর্দশা অবস্থায় চলে গিয়েছিল, কিন্তু এই নির্বাচনের মাধ্যমে তারা আবার সাংগঠনিকভাবে মাথাচাড়া দেওয়ার সুযোগ পেয়ে গেল।’

জাসদ কেন্দ্রীয় কমিটির যুগ্ম সম্পাদক ও সিলেট জেলা জাসদের সভাপতি লোকমান আহমদ বলেন, ‘এটা অনাকাঙ্ক্ষিত এবং একটা অশুভ ইঙ্গিত।’ কেন এমন পরিস্থিতি তৈরি হলো জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘ভোটের কৌশল হতেও পারে, তবে এখানে যে একটা আপস তা স্পষ্ট।’

সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) সিলেটের আহ্বায়ক ফারুক মাহমুদ চৌধুরী বলেন, ‘আমি খুবই মর্মাহত। আমি একাত্তরের নির্যাতত পরিবারের সন্তান হিসেবে তাদের আস্ফাালন দেখে খুবই হতবাক। সরকারি দলের প্রার্থী যে রকম সুযোগ-সুবিধা ভোগ করে জামায়াতের প্রার্থীও সে রকম সুবিধা পাচ্ছেন এখানে।’

সিলেট জেলা বিএনপির সভাপতি আলী আহমদ বলেন, ‘সারা দেশে বিএনপিসহ বিরোধী দলের নেতাকর্মীরা নিজ বাড়িতে থাকতে পারে না। কিন্তু সিলেটে জামায়াত নেতারা নির্বিঘ্নে রয়েছেন। তাঁদের প্রচারকাজে কোনো বাধা না দিলেও আমাদের পদে পদে হয়রানি করা হচ্ছে।’

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আসাদ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘এটা খুবই দুঃখজনক। এরা তো ২০ দলীয় জোটেরই একটা দল। এরা আবার জিকির করে, সরকার তাদের মিটিং-মিছিল করতে দেয় না, এটা সরকারের বিরুদ্ধে বদনাম হয়ে যাচ্ছে। যেহেতু নির্বাচন একটি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া তাই নির্বাচনে অংশ নেওয়ার অধিকার সবারই আছে, বিষয়টি খুবই স্পর্শকাতর। কিন্তু নির্বাচনের সুযোগ নিয়ে তারা মাঠে নেমেছে।’ এ বিষয়ে প্রশাসনের নীরব ভূমিকা সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অবশ্যই ভূমিকা নেওয়া উচিত। যদি কেউ মামলার ওয়ারেন্টভুক্ত আসামি হয়ে থাকে তাহলে সে যে দলেরই হোক তাকে আইনের আওতায় ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।’
সূত্র : কালের কন্ঠ

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বাধিক পঠিত