প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

ফ্রান্সের বিশ্বকাপ সাফল্যের পথ ধরে হাঁটবে কী বাফুফে?

শেখ মিরাজুল ইসলাম: বিশ্বকাপ ফুটবল বিজয়ী ফ্রান্স দলের সাফল্যকে অনেকেই প্রকারান্তে আফ্রিকা মহাদেশের সাফল্য হিসেবে বর্ণনা করছেন। যেহেতু ফ্রান্স টিমের ১২ জন তারকা ফুটবলারই আফ্রিকান বংশোদ্ভুত। শুধু ফ্রান্স নয়, ইংল্যান্ড বা বেলজিয়ামের মতো দেশেও আফ্রিকান ফুটবলারদের ভূমিকা অনস্বীকার্য। চ্যাম্পিয়ন ফ্রান্সের সেরা তরুণ ফুটবলার কিলিয়ান এমবাপ্পে ক্যামেরুন ও আলজেরিয়ার মিশ্রণ, রক্ষণভাগের গুরুত্বপূর্ণ খেলোয়াড় উমতিতি ক্যামেরুন বংশোদ্ভূত, এনগোলো কন্টের পরিবার এসেছেন মালি থেকে এবং পগবার বাবা ছিলেন গিনির বাসিন্দা। ফ্রান্সের এই বহুজাতিক দল হিসেবে গড়ে ওঠা শুরু হয় আশির দশকের পর থেকে। এর আগে ফ্রান্সের কিংবদন্তি অভিবাসী ফুটবলার প্লাতিনি ইতালি, টিগানা সুদান ও জিদান এসেছিলেন আলজেরিয়ার উৎস থেকে। বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে অভিবাসী হওয়া এখন স্বাভাবিক বাস্তবতা। এর আগে ব্রাজিলের ডি কস্টা তার স্বদেশ ছেড়ে স্পেনের জাতীয়তা গ্রহণ করেছেন। ক্রীড়াঙ্গনে এ রকম বহু উদহারণ আছে। আর্জেন্টিনার কিংবদন্তি ডি স্টেফানো আর্জেন্টিনা ও স্পেন দুই দেশের পক্ষেই খেলেছেন। এমনকী লিওনেল মেসির পক্ষেও সুযোগ ছিল স্পেনের জাতীয়তা গ্রহণ করে ওদের পক্ষে খেলার। অনেকের ধারণা তা সম্ভব হলে মেসি একটি নয়, দুটি বিশ্বকাপ জিততে পারতেন।

কিন্তু এবারের বিশ্বকাপ দলে ফ্রান্স টিমে অভিবাসীদের ভিড় ছিল চোখে পড়ার মতো। ভিনদেশিদের নিয়ে গড়া ফ্রান্সের এই সাফল্য আদায়ের বাস্তবতায় কিছুদিন আগে ডিয়াগো ম্যারাডোনা স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে খোঁচা মেরে ফ্রান্সকে ভাড়াটে টিম বলেছিলেন। শুধু তাই নয়, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের জনপ্রিয় টিভি উপস্থাপক ট্রেভর নোহা ফ্রান্সের বিজয়কে ‘আফ্রিকার বিজয়’ উল্লেখ করাতে ফ্রান্সের সরকারের পক্ষ থেকে সমালোচনার সম্মুখীন হয়েছিলেন। কিন্তু ট্রেভর পাল্টা যুক্তি দেন উগ্র জাতীয়তাবাদের খোলসে ফ্রান্সের কৃষ্ণাঙ্গ ফুটবলারদের আদি উৎস অস্বীকার করে তাদের এককভাবে ‘ফ্রেঞ্চ’ বানানোর অর্থ হচ্ছে ফ্রান্স এখনো ঔপনিবেশিক মানসিকতায় আক্রান্ত। এই যুক্তি ফ্রান্সের বর্তমান সামাজিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় কিছুটা হলেও সত্য। এখনো ফ্রান্সে কৃষ্ণাঙ্গ ও মুসলিম অভিবাসীদের ক্ষেত্রে মানবাধিকার আইনের যথার্থ প্রয়োগ হয় না বলে অভিযোগ আছে। ফ্রান্সের বিশ্বকাপ দলে বাদ পড়া অন্যতম তারকা ফুটবলার রিয়াল মাদ্রিদের করিম বেনজেমা বলেছিলেন, যখন আমি গোল করি তখন আমি ফ্রেঞ্চ, কিন্তু খারাপ খেললে আমি হয়ে যাই একজন আরব। কিন্তু বিতর্ক যাই হোক, দিন শেষে বিশ্বকাপ গেছে ফ্রান্সের ঘরে। ইতিহাসের পাতায় সেটাই লেখা থাকবে।

ভিনদেশি অভিবাসীদের সমন্বয়ে গড়া ফ্রান্স টিমের এই সাফল্যের ধারায় আমরা বাংলাদেশের ফুটবলে সাফল্যের সুযোগটাও কিন্তু দেখতে পাচ্ছি। প্রচুর আফ্রিকান নাগরিক আমাদের দেশে ওয়ার্ক পারমিট নিয়ে কাজ করছেন। কাজের সূত্রে কেউ কেউ দীর্ঘ দিন এদেশে আছেন। ঢাকা নগরীর খিলক্ষেত, বসুন্ধরা, বারিধারা, উত্তরা, ধানমন্ডি, বাড্ডা, বনানী, গুলশান ইত্যাদি এলাকায় অনেক নাইজেরিয়া, কেনিয়া, ঘানা, সুদানের নাগরিক বসবাস করেন। এদের অনেকে সকালে দল বেঁধে নিয়মিত ফুটবল খেলেন আর সারাদিন বিভিন্ন ব্যবসার সঙ্গে জড়িত থাকেন। বলা বাহুল্য তাদের শারীরিক সক্ষমতা আমাদের চেয়ে গড়পরতা অনেক বেশি। ঢাকার ঘরোয়া লীগেও ঘানা, নাইজেরিয়া, মরক্কো, গিনি, ক্যামেরুনের ফুটবলারদের প্রাধান্য দেখেছি আমরা।

যদিও বর্তমান ফুটবল লীগের দৈন্যদশার কারণে ভালো মানের ফুটবলারের আনাগোনা কমে গেছে। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদী পরিকল্পনা করে এমেকা, বুকোলা, সামাদ ইউসুফদের মতো প্লেয়ারদের মধ্যে থেকে বেছে বেছে আমাদের ভবিষ্যৎ জাতীয় ফুটবল টিম কি বের করে আনা যায় না? আমাদের জাতীয় দলেও অন্তত সাত/আটজন আফ্রিকান অভিবাসী ফুটবলার থাকলে ক্ষতি কী? বিশ্বকাপের আসরে আমরাও হয়তো ফ্রান্সের পথ ধরে সাফল্যের সুযোগ পেতে পারি। জাতীয়তাবোধের ইস্যুতে এই ‘উচ্চভিলাষী’ বিষয়টি অনেক বোদ্ধার দৃষ্টিতে অবান্তর ঠেকতে পারে। কিন্তু ফুটবল প্রেমে সাফল্য পেতে উদগ্রীব জাতি হিসেবে বাফুফে কি ধারণাটা ভেবে দেখবে?

লেখক : চিকিৎসক ও লেখক

এক্সক্লুসিভ রিলেটেড নিউজ

সর্বশেষ