প্রচ্ছদ

সর্বশেষ খবর :

কাঙ্ক্ষিত ফল না পেলেও খুশি তারা

ডেস্ক রিপোর্ট : ঘড়ির কাঁটায় তখন ২টা। কলেজের প্রধান গেটে প্রচণ্ড ভিড়। শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের ভিড়ে বাধ্য হয়ে প্রধান গেট খুলে দেওয়া হলো। আর গেটের মুখ খোলা পেয়েই হুড়মুড় করে ভেতরে প্রবেশ করতে লাগলেন সবাই। কিছু সময় পরই কলেজের ভেতরে বাগানের লোহার বেড়ার সঙ্গে থাকা বোর্ডে কাগজে সাঁটিয়ে দেওয়া হলো পুরো রেজাল্ট শিট। রেজাল্ট দেখে কেউ খুশিতে আত্মহারা হয়ে বাবা-মা ও আত্মীয়স্বজনকে ফোনে জানাতে শুরু করলেন। এদের মধ্যে আবার কয়েকজন কাঙ্ক্ষিত ফল না পেয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন।

১৯ জুলাই, বৃহস্পতিবার দুপুরে এইচএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর রাজধানীর ভিকারুননিসা নূন স্কুল ও কলেজের ভেতরে এমন চিত্র ছিল।

ভিকারুননিসা নূন স্কুল ও কলেজে এবার পাসের হার ৯৯.৭৮ শতাংশ আর জিপিএ-৫ পেয়েছে মোট ৯৯৭ জন। প্রতিষ্ঠানটি থেকে এবার এক হাজার ৮৫৩ জন শিক্ষার্থী তিন বিভাগ থেকে পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছেন এক হাজার ৮৪৯ জন।

কলেজটির বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এক হাজার ৪০০ শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছেন এক হাজার ৩৯৮ জন। এর মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৯২৩ জন। মানবিকে ২৩৩ জন অংশ নিয়ে ২৩১ পাস করেছেন। মানবিকে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ২২ জন।

এ ছাড়া ব্যবসায় শিক্ষা শাখায় ২২০ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে পাস করেছেন ২২০ জন। আর জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৫২ জন। তবে দুঃখের বিষয় হলো এবার ভিকারুননিসা থেকে বিজ্ঞান ও মানবিক শাখায় দুজন করে চারজন অকৃতকার্য হয়েছেন।

ভালো ফলাফলে আনন্দে উদ্বেলিত শিক্ষার্থীরা। 

তারপরও বেশ খুশি শিক্ষা প্রতিষ্ঠানটির প্রধান। এ বিষয়ে ভিকারুননিসা নূন স্কুল ও কলেজের প্রিন্সিপাল (ভারপ্রাপ্ত) নাজনীন ফেরদৌস প্রিয়.কমকে বলেন, ‘সারা দেশে যখন জিপিএ পাওয়ার খরা বইছে, সেই সময়ে আমার প্রতিষ্ঠানে এতগুলো জিপিএ নিঃসন্দেহে ভালো ফলাফল। তবে আমরা গতবারের চেয়ে ভালো করেছি। সামনে আমাদের এ ধারা কীভাবে অব্যাহত রাখা যায় তা চেষ্টা করে যাব। গতবারের তুলনায় এ বছর জিপিএ ৫-এর সংখ্যা ৪৫টি বেশি। এ ছাড়া পাসের হার অন্যান্য স্কুলের তুলনায় বেশি।’

ফল প্রকাশের পরই আনন্দের বন্যা বইতে শুরু করে। ছাত্রীরা আনন্দে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে আনন্দ প্রকাশ করতে থাকেন। সাতজন ছাত্রী তো টানা আধা ঘণ্টা লাঠির বাড়িতে ড্রাম ফাটানো অবস্থা করেন। তারা যতবারই ড্রামে লাঠি দিয়ে আঘাত করছিলেন, ততবারই চিৎকারে ফেটে পড়ছিলেন শিক্ষার্থীরা। ড্রামের শব্দের তালে তালে থেকে থেকেই আনন্দে চিৎকার করে উঠছেন তরুণীরা। তবে যারা ঘরে বসে ইন্টারনেটে ফলাফল দেখেছেন তারাও পরে ক্যাম্পাসে ছুটে আসেন। যোগ দেন বান্ধবীদের আনন্দের আড্ডায়। এ আনন্দে শামিল হন অভিভাবকরাও।

যারা জিপিএ-৫ পাননি, তারা অঝোরে কেঁদেছেন। আর যারা কাঙ্ক্ষিত ফল পাননিও, তারাও কলেজের বারান্দার সিঁড়ির এক কোণে বসে কাঁদছিলেন।

এবার পরীক্ষাগুলোতে কোনো ধরনের গ্যাপ ছিল না বলে অভিযোগ ছিল শিক্ষার্থীদের। সিঁড়ির কোনায় বসে কাঁদছিলেন বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী। তাদের মধ্যে একজন জিমি আক্তার বলেন, ‘পরীক্ষার রুটিনে কোনো গ্যাপ ছিল না, আমাদের টানা পরীক্ষা নেওয়া হয়েছে। সেইসঙ্গে প্রশ্নপত্রও তুলনামূলক কঠিন ছিল। এ কারণে আমার ৪ দশমিক ২৫ এসেছে। খুব খারাপ লাগছে।’

আফিকা মাকসুরাহ প্রিয়.কমকে বলেন, ‘পরীক্ষার সময় কোনো ধরনের গ্যাপ ছিল না। তারপরও এই ধরনের রেজাল্টে আমরা খুশি। তবে থেকে থেকে কয়েক দিন গ্যাপ দিলে আমি ও সকলেই কমবেশি গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেতাম।’

তার সুরেই কণ্ঠ মিলিয়ে ত্রিবেণী এরিনা বলেন, ‘প্রশ্নপত্র অনেক কঠিন ছিল। তার ওপর কোনো ধরনের গ্যাপ ছিল না। এরপরও এমন ফলাফলে সত্যি খুশি।’

ত্রিবেণীর অভিযোগ, বিগত বছরগুলোতে একটি পরীক্ষা হওয়ার পর কয়েক দিন গ্যাপ দেওয়া হতো। কিন্তু এবার পদার্থ ও আইসিটি পরীক্ষায় কোনো গ্যাপ ছিল না। এ কারণে তাদের প্রস্তুতিটাও তেমন জোরালো ছিল না।

ভিকারুননিসা নূন স্কুল ও কলেজের প্রিন্সিপাল নাজনীন ফেরদৌস। ছবি: সংগৃহীত

আফিফা ও ত্রিবেণী একই সুরে কথা বললেও ভিন্ন সুরে কথা বলেছেন তাদেরই তিন বান্ধবী। ইংরেজি ভার্সন থেকে অংশ নিয়ে পাস করা সৌরিনা হক প্রত্যাশা, সানজিদা রহমান শুভ্রা ও সাদিয়া সাবরিনা জানান, গ্যাপ বেশি না থাকলেও পদার্থ, রসায়ন ও আইসিটি পরীক্ষার প্রশ্নপত্র একটু কঠিন ছিল। এ কারণেই তাদের কাঙ্ক্ষিত ফলাফল আসেনি। তারপরও খুশি তারা।

শিক্ষার্থী ত্রিবেণীর মা মাহফুজা খানম প্রিয়.কমকে বলেন, ‘এবার পরীক্ষায় কোনো ধরনের গ্যাপ দেওয়া হয়নি। তারপরও তারা যে রেজাল্ট করেছে, তার জন্য তারা ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য।’

প্রিমা আফরোজা বলেন, ‘কাঙ্ক্ষিত ফল পেয়েছি। এ ফলে শুধু নিজের পরিশ্রম নয়, বাবা, মা ও শিক্ষকদের কষ্ট-পরিশ্রম আছে। তাদের প্রেরণাই আমাকে এমন ফলাফল করতে আগ্রহী করে তুলেছে।’

নটরডেম কলেজ

একই চিত্র ছিল মতিঝিলের নটরডেম কলেজে। কলেজটিতে প্রবেশ করতেই দেখা গেল, বেশ কিছু শিক্ষার্থী আনন্দে হৈ-হুল্লোড় করছেন। সাংবাদিক পরিচয় শুনেই তারা কথা বলতে শুরু করলেন।

নুরন্নবী সরকার নামে এক শিক্ষার্থী জানালেন, তিনি বিজ্ঞান বিভাগ থেকে অংশ নিয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছেন। তবে কাঙ্ক্ষিত ফল তার আসেনি। তার প্রত্যাশা ছিল তিনি গোল্ডেন জিপিএ পাবেন। কিন্তু তারপরও খুশি তিনি।

এসএসসির মতো এইচএসসিতেও গোল্ডেন জিপিএ-৫ পেয়েছেন নটরডেমের তানভীর খন্দকার। তানভীর বলেন, ‘ভালো ফলাফলের পেছনে শিক্ষদের অবদান বেশি। বাবা-মা তো অবশ্যই রয়েছেন।’

প্রতিষ্ঠান সূত্রে জানা গেল, প্রতিষ্ঠানটিতে এবার পাসের হার কমলেও গতবারের তুলনায় জিপিএ-৫ বেড়েছে। তবে এবারের ফলাফলে সন্তুষ্ট কলেজটির সংশ্লিষ্টরা।

ফলাফলে দেখা গেছে, দেশের খ্যাতনামা এই কলেজটি থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন তিন হাজার ৯৫ জন। এর মধ্যে পাস করেছেন ৩০৫৫ জন। আর জিপিএ-৫ পেয়েছেন দুই হাজার ৬৯ জন। প্রতিষ্ঠানটির পাসের হার ৯৯ শতাংশ।

নটরডেম থেকে এবার বিজ্ঞান বিভাগ থেকে এক হাজার ৯৯৯ জনের মধ্যে এক হাজার ৮৩৭ জন জিপিএ-৫ পেয়েছেন। অন্যদিকে বাণিজ্য বিভাগে ৬৯৪ জন অংশ নিয়ে ২০৩ জন জিপিএ-৫ পেয়েছেন। মানবিক বিভাগের ৪০২ জনের মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ২৯ জন । প্রতিষ্ঠানটি থেকে এবার ২৫ জন ফেল করেছেন।

নটরডেম কলেজের শিক্ষার্থীদের উচ্ছ্বাস। 

অনুপস্থিত শিক্ষার্থীরাই পরীক্ষায় অকৃতকার্য হয়েছেন। আর এ কারণে সার্বিক ফলাফলেও বেশ প্রভাব পড়েছে বলে জানালেন কলেজের অধ্যক্ষ ফাদার ড. হেমন্ত পিউস রোজারিও।

ড. হেমন্ত প্রিয়.কমকে বলেন, ‘ফলাফলে আমরা অনেক সন্তুষ্ট। সব মিলিয়েই ভালো ফলাফল হয়েছে। কেননা এবার দেশের সার্বিক ফলাফল খারাপ। সে তুলনায় আমাদেরটা অনেক ভালো।’

গত বছর কলেজটি থেকে তিন হাজার ৭৭ জন পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ৯৯.২৫ শতাংশ শিক্ষার্থী পাস করেছিলেন। তবে ২০১৭ সালে দুই হাজার ৫৭ জন জিপিএ-৫ পেলেও এবার এই সংখ্যা দুই হাজার ৬৯ জন।

মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল ও কলেজ

ভিকারুননিসা নূন স্কুল ও কলেজ এবং নটরডেমের মতো ভালো ফলাফল করতে না পারলেও তারপরও খুশি রাজধানীর মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যক্ষ শাহান আরা বেগম। তিনি বলেন, ‘ফলাফল খুব ভালো করার জন্য আমরা চেষ্টা করেছি। তারপরও ফলাফল কিছুটা খারাপ হওয়ার পেছনে পরিবার কিছু অংশে দায়ী। তারা ছেলে-মেয়েদের পড়ালেখা কোচিং আর সিটকেন্দ্রিক করে ফেলেছে।’

এবার মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে ৪৬২ জন শিক্ষার্থী জিপিএ-৫ পেয়েছেন আর পাসের হার ছিল ৯৮ দশমিক ৯৬ শতাংশ। প্রতিষ্ঠানটি থেকে ২০১৭-১৮ শিক্ষাবর্ষে বিজ্ঞান, মানবিক ও বাণিজ্য বিভাগ থেকে সর্বমোট এক হাজার ১৫৮ জন শিক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন। তবে পাস করেছেন এক হাজার ১৪৪ জন। এর মধ্যে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে ৭৯৪ জন অংশ নিয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৪২৭ জন। মানবিক থেকে ৭১ জন অংশ নিয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছেন মাত্র তিনজন। অন্যদিকে বাণিজ্য বিভাগ থেকে ২৯৩ জন অংশ নিয়ে জিপিএ-৫ পেয়েছেন ৩২ জন। প্রতিষ্ঠানটিতে ১৪ জন শিক্ষার্থী অকৃতকার্য হয়েছেন।

গত বছর মতিঝিল আইডিয়াল স্কুল অ্যান্ড কলেজের ফলাফল এবারের চেয়ে বেশি সন্তোষজনক ছিল। বিজ্ঞান, মানবিক ও বাণিজ্য বিভাগ থেকে ১১৮১ জন শিক্ষার্থী অংশ নিয়ে পাস করেছিলেন এক হাজার ১৭২ জন। এদের মধ্যে জিপিএ-৫ পেয়েছিলেন ৪৮৪ জন। আর পাসের হার ছিল ৯৯ দশমিক ২৪ শতাংশ।

জিপিএ কমলেও ফলাফল নিয়ে খুশি শিক্ষক, অভিভাবক এবং শিক্ষার্থীরা। তারা বলছেন, ‘এ বছর প্রশ্নপত্র ফাঁস না হওয়ায় প্রকৃত মেধার মূল্যায়ন হয়েছে।’ – প্রিয়.কম